Friday, December 24, 2021

অবান্তর ৮৭ , ২৫শে ডিসেম্বর

     ২৫ শে ডিসেম্বর



বিস্তির্ণ মাঠের এক কোনে একটা ছোট্ট আস্তানা ছিল আমাদের,

কুয়াশাভরা মাঠে কেমন যেন আবছা মতো ঠেকতো,

মফস্বলীয় জীবনীতে তখনো যেশাশের আবির্ভাব ঘটেনি,

শুধু জানতাম , ২৫ শে ডিসেম্বর , একটুকরো কেকের গল্প,

যেমন করে জানতাম, পৌষপরব মানেই পিঠে খাওয়া।


এমনি এক ২৫ শে , আমাদের ছোটো আস্তানায় সাজো সাজো রব,

মা সেদিন প্রথমবার তার কয়লার চুলোয় কেক বানাবেন,

আর একটুকরো নয়, খাবো গোটা গোটা।

চারিদিকে ভ্যানিলার গন্ধ বাইছে,

আমরা অপেক্ষারত কোনো এক ভীষন নতুন উত্তেজনার।

মা ভীষন ব্যস্ত আগুনের আঁচ বাড়ানো কমানোয়।

অবশেষে ,অপেক্ষার অবসান,

কেক এসেছে,

শুধু আগুন বাড়ানো কমানোর খেলায় অপারদর্শী মায়ের মুখ কাঁচুমাচু,

কেকে পোড়া গন্ধ।


এখন অনেক সুসজ্জিত কেক খাই সারাবছর,

একটুকরো নয় গোটা গোটা, পেট ভর্তি করে।

তবে সেই পোড়া গন্ধ খুঁজে পাই না আর,

বিচ্ছিন্ন হয়েছি আমি

সেই ২৫ শে ডিসেম্বরও।


অবান্তর ৮৬ সারসত্য

        সারসত্য

   অর্পিতা চৌধুরী


নিঃশব্দ প্রেম  এত প্রানঘাতী হয়?

কখন যে চুপিচুপি জুড়ে বসলে জীবন ছড়িয়ে,

আর কখন যে উঠে গেলে শীতলপাটি হয়ে যদি বুঝতাম।


ধরতে গেলেই দুরত্ব বেড়ে বেড়ে যায়,

অথচ নিংশব্দে অপলকে চেয়ে থাকো,

এর থেকে প্রানঘাতী আছে কিছু?


অস্বীকার করি কি করে?

অস্তিস্তকে অস্বীকার করি কি করে?

সারাদিন ব্যস্ততা সময় খায়,

রাত বাড়ে,

নিংশব্দে উঁকি দেয় রাতচরা বুকের ভেতর।


জানি এতদিনে,

রুপোলী কিনারেও প্রেম আসে,

ভালোবাসা হয়, 

অলৌকিক ক্ষন তৈরী হয় নিঃশব্দে।

ঘুমঘোরে শিয়রে জাগো সারারাত প্রথম দিনের মত,

ভরসা, বিশ্বাস, নিঃশব্দতা একাকার হয়ে যায়।



আজ জানি,

ভালোবাসায় প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বলে আসলেই কিছু হয় না

মুগ্ধতা সরে গেলে, 

যতবার আসে সেই প্রথম।


Saturday, December 18, 2021

অবান্তর ৮৫ বিচ্ছেদ কাব্য

        বিচ্ছেদ কাব্য


আমি যে জলে জীবন মাপি,

তুমিও কি সে জলে মাপো?

তবু 

তবু এত বিচ্ছেদ কেন?

Tuesday, December 14, 2021

অবান্তর ৮৪, না ছোড় বান্দা

       না ছোড় বান্দা




প্রেমে পড়ি বারেবারে

দুঃখ পাবো বলে

অজুহাত খুঁজি

দুঃখে থাকার,

অথবা  জয় করার।


দুঃখ খুঁজি

নিজেকে ভালোবাসি বলে

বারে বারে ক্ষয় 

তারপর ,আবার দুর্জয়, 

অপ্রতিহত গতিতে ফিরে আসা।


যখনই ছাড়তে চেয়েছি

তখনই ভেজা বেড়ালের মত পায়ে পায়ে ,

অনুগত !

অবিস্মরনীয় শব্দ,

একে বুঝি প্রেম বলে?

না ছোড় বান্দা !


জীবন উদ্বৃত্ত হলে,

প্রেম পড়ে রয়।

ঝরা বকুলের মত চল, তুলে এনে মালা গাঁথি।

জীবন থেকে দুরে গেলে,

 উদ্বৃত্ততেই ফিরতে হয়।


যত বলি নিজেকে ভালোবাসি

আসলে ' নাছোড় 'তোকেও তা বাসি,

শুধু অজুহাত খুঁজতে হয় গোপনে গোপনে।



Friday, December 10, 2021

অবান্তর ৮৩ স্বীকার করতে ভয় পাই

   স্বীকার করতে ভয় পাই




ভয় পেয়ো না।

 ভয় পাই বলেই ,

জুজু দেখাতে ভালোবাসি।

এ এক দখলদারীর গল্প,

মানুষ করায়ত্বকরন।


তাতেও না কাজ হলে,

চোখের জলে দুঃখ ভিজিয়ে,

পাঁউরুটি  জ্যাবজেবে করে

মেলে ধরি,

পাঁপড় শুকানোর মত।


কে কত ভালোবাসে

কার কত দায়িত্ব

অথবা কে কার কাছে দামী

নিক্তি মাপে বেতনক্রমে।


ওজনদারীর খেলায়

তার কেটে গেলে,

কুমিরছানারা ঘুঁটি হয়ে যায়

তাদের সামনে রেখে চলে পাশা খেলা।


অথচ নিজের কাছে অনস্বীকার্য

শীত নামছে বটের ঝুরিতে

এবার আর এক্কা দোক্কা নয়,

শুধু ঘরে ফিরে চলা।



Thursday, December 9, 2021

অবান্তর ৮২, সহজ কাজ

   সহজ কাজ




ভোলা গেলে সহজ হোত

সহজ হোত কাজ

অন্তরে আজ দহন ঝরে

বাইরে কর্মসাজ।


ভুলতে চাও তুমিও পুরুষ

ভোলাও নিজেকে আজ

অথচ শুধুই ধরা পড়ে যাও

সাজাও নিজেকে একই সুতোয়

আলমারীর এক কোনেতে হাতড়ে মর সাজ।


পরার সময় যে জন ঘুমোয়,

সেই আসে হাতের কাছে,

রঙ জ্বলা সেই জামাটাকেই,

আঁকড়ে রাখে বুকের কাছে।


শীতে বন্দী শীতজামাটা

উষ্ণ পরশ স্পর্শ মাখা,

মানুষ ভোলার ছল করি যে,

নিজের কাছে রোজ।


কত ব্যাথা জমলে পরে

শীতের আবার বর্ষা ঝরে

ভুলতে চেয়ে ভুল হয়ে যায়

মনের উপর ক্ষোভ।


যখন দেখি একই নিদান

অপরপক্ষে এক পরিধান

বুঝি আমি বোঝ তুমি, ছল করেছি রোজ।

ভিতর বাহির ঝড় বহেছে

বর্ষাতে আজ বাঁধ ভেঙ্গেছে 

ভিতর তাহার পরশ না পায়

বাইরে কঠিন সাজ

নিজের থেকে পালিয়ে যাই

পথ হারিয়ে আগলে বেড়াই,

একই পথের পথিক হলেও

ভিন্ন পথের খোঁজ।


আজ বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না

পরস্পরের উভয় চেনা

দিনের শেষে ফিরতে হবে অন্ধকারে রোজ।





Wednesday, December 8, 2021

অবান্তর ৮১

  ভালোবাসা দুঃখবাসা




ভালো না বাসলে 

জানা হোত না দুঃখ কাকে বলে।


যাব বললেই ফেরা যায় কি?

আসলে তো সেই অন্ধকারেই ফিরতে হয়।


ফিরতে ফিরতে সেই বাড়িমুখো

তারপর নিভৃতে নিজের সাথে বাস।


ভালোবেসেছি বলেই কষ্ট পেতে পারি,

অভিমান,আমার একার সম্পত্তি,

তবু নতুন সূর্যের অপেক্ষায় থাকি।


যে হাতে হৃদয় ছুঁয়েছি

সে হাত এখনও মুঠো

মুঠোর প্রতীক্ষায়।


আপনি আর তুইয়ের মাঝে 

একসমুদ্র তুমি' থাকে

আপনির সীমাবদ্ধতায়

তুই ভেসে যায়।


আমার প্রতিটি পাতা যদি আঁচল পেতে থাকে

আঁচলে এসে রোদ ঝরে,

তাতে বসে কষ্ট পাবে।


নকশি কাঁথা বুননে দিন যাক

প্রতিটি বুনটেই হৃদয় আঁকা থাকে,

হৃদয় তো লালই  হয়, রক্তাক্ত দায়ভাগ।


যে মাটিতে আসন পেতেছি

আঁচড়ে আর শাকে ভাতে পুড়েছি বলেই

বারেবারে হৃদয় সেঁকতে ভালোবাসি

জ্বলন্ত আগুনে।


মাঠে মাঠে ধান পাকে, মেলা বসে,

কোন খোঁজে চাতক চাতকী।

দর্শক আসনে বসে হাততালি কুড়োই,

জীবন তোকেই ভালোবাসি।








Monday, December 6, 2021

অবান্তর ৮০ , কৈফিয়ত

           কৈফিয়ত



আজ বছর কয়েক পরে তুমি তোমার নিরুপায়তার হিসেব নিকেশ শোনাচ্ছো।

সংসার, আচার, ব্যবহার, দায়িত্ব।

তুমি খুউব , খুউব আন্তরিক ভাবেই বোঝাতে চাইছো,

তোমার নিরুপায়তা।

ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বার বার একই গল্প শোনাতে চাইছো,

যে -

তুমি আমার সম্বন্ধে ভীষন উদগ্ৰীব, 

কিন্তু নিরুপায় বলেই -

বারবার আমাদের বন্ধন গুলো মনে করিয়ে দিচ্ছো।


হিসেবের খাতায় একের পর দুই , দুইয়ের পর তিন জমা করছো,

আর ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছো গন্তব্যের দিকে।

অথচ -

আমি কেন জানি শুনতে পাচ্ছি -

বহুকাল আগের এক বুকজ্বলা কান্না,

আর বুঝতে পারছি, 

তুমি নিরুপায় বলেই ...........


Saturday, December 4, 2021

অবান্তর ৭৯, অভিশম্পাত

 এখন আর  অতি প্রিয়জনকেও গালি দিতে ইচ্ছে হয় না,

কিংবা অভিশম্পাত।

শুধু মনে মনে বলি,

একটা প্রেম করো, প্রেম করো,

একটা সত্যিকারের ভালোবাসো জীবনে।

Wednesday, November 24, 2021

অবান্তর ৭৮, বৃত্ত

          বৃত্ত




ভনিতা ছাড়াই বলতে পারি কথা,

বহুদিনের পরেও কথা স্রোতে,

হাতের উপর হাত না রেখেও চলি ,

দূরত্বকে আঁকড়ে ধরে সুখে।


ভাব না রেখে আড়ির বোঝা বেশী,

কথার পিঠে কথার পাহাড় জমে।

ভালোবাসার কথায় সাবধানী,

বৃত্ত রক্ষা করে দুইজনে।


খাপ জীবনে খোপ জব্দ হল,

কথামালা সাজে ট্রেনে বাসে।

তারপরেতে অন্ধকার কোনে

চামচিকাতে ধিনতা ধিনা নাচে।


এক জীবনে দুঃখ পুরো হলে,

অন্য হাতে দুখ জমবে কবে?

একের কষ্টে অপূর্ণতা রবে,

দুইয়ের পিঠেই বইতে খানিক হবে।


বৃত্ত শুধু দুটো হাতের খেলা

জমলে খানিক ঝরবে আ্যড্রিনালিন।

একের ঝরন মরন বন্ধ হলে

অন্য পিঠে ঝরবে তখন খালি।


ঝরতে ঝরতে ঝরনা যখন হবে,

বৃত্ত তখন সরলরেখায় কাত।

আবেগ যদি বানায় দশরথ,

কৈকেয়ীকে ভাবতে তখন হবে।


এক জীবনে মরন কি বা বল?

ধরতে জীবন শর্তে বাঁচে যারা।

দ্বন্দ্ব মরন দুইই একই পিঠ,

জীবন জীবন খেলুক এবার তারা।




Friday, November 19, 2021

অবান্তর ৭৭ রুপকথা

          রুপকথা




এখন আমার একটা ঘুম দরকার,

একটা নিশ্চিন্ত নিরুপদ্রব ঘুম।


এখন আমার দুটো হাত দরকার,

যে হাত আমাকে বেড়াকলমির মত 

আস্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকবে।


আমার এখন একটা শীতল বুক দরকার,

যেখানে ফটিক জল ফটিক জল বলে 

ডুব দিতে পারবো।


আমার এখন একটা বিস্তির্ণ মরুভুমি কাঁধ দরকার,

যেখানে মাথা‌ রেখে বেহাগে বেহায়া হব খুব কষে।


আমার একটা মানুষ দরকার ,

সমস্ত রাজ্যজয়ের পর যেখানে ছেলেমানুষী আছড়ে পড়ে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হওয়া যায়।



আসলেই বোধহয় আমার একটা রূপকথা দরকার,

ছেলেবেলা থেকে যাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি।


অবান্তর ৭৭ অনুগত শব্দেরা

    অনুগত শব্দেরা 



উড়ে যাও

মুক্তির সময় এসেছে।

ডানা ঝাপটানো পাখির মত ঝাপটাতে ঝাপটাতে 

ডানা খোলো।

বোঝো এবং বোঝাও নিজেকে

আবেগের পরিপাটি ভালো, 

শৃঙ্খলতা আনো।



ছেলেমানুষী ছাড়ো, 

আবেগীয় তত্বে সমঝোতা না করে 

মার্কস, লেনিন নেহাতই হিটলার হয়ে যাও।

নাৎসী আন্দোলনের বীজ বপন করো জঠরে 

হৃদয়ে।


যা আর নেই,

আবেগীয় তত্ত্বের মগডালে তাকে বিরক্ত প্রশ্নচিহ্নের মত ঝুলিয়ে রেখো না।

পেড়ে ফেল একেবারে ধরাশায়ী করে,

ছেৎরে ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ুক প্রেমজ আবেগরা।


লৌকিকতা বড় বালাই

যা নেই তাই নিয়ে শুধু টানাটানি , দর কষা

তারপর তিতকুটে জিভে শুধু গালাগালি গলাগলি,

সমস্ত অনুগত শব্দদের জব্দ করে মুছে ফেল এক নিমেষে,

আসলেই তারা অনুগত নয়,

উপসংহার মাত্র।

এরপর আর কিছু নেই, স্বস্তি বা স্বস্ত্যয়ন ছাড়া।



দাঁড়ি, কমা, কোলনের মাঝে পড়ে

অনুগত প্রশ্নেরা বিস্ময় চিহ্ন হয়ে যায়।

আবার হেমন্তে হলুদ পাতারা খসে খসে যায়,

সমস্ত প্রশ্নচিহ্ন তুলে রেখে।



শুধু অনুগত শব্দেরা 

ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি খোঁজে

শীত ঘুমে জেগে রয় বুদ্ধ ও লেনিন ।



Thursday, November 18, 2021

অবান্তর ৭৬ উদযাপন

             উদযাপন


ভালোবাসা থেকে যোজন দুরে চলে গিয়ে

ভালোবাসাতেই ফিরতে হয়।

ততদিন না হয় যা যা চেয়েছি 

সব আবদার গুলো সাজিয়ে রেখো

বহু যত্নে, আর আদরে।

প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে 

কৃষ্ণচূড়া, অমলতাসের ডালগুলো বাড়িয়ে যেও।

আর পলাশকে বোলো কানে কানে 

এ স্মৃতি যাপন শুধু সমে ফেরার  উদযাপন।


ভালোবাসা থেকে সরে যেতে যেতে

স্মৃতিতে ফেরা,

এ তো তোমার কাছেই নিজের ফেরা,

শিউলিরা ঝরে পড়ে শুধু স্মৃতি হবে বলে,

ভালোবাসার কাছে কাছাকাছি হতে

দুঃখের কাছাকাছি,  সেও তো নামান্তর।



আমি তো প্রেমিক মাত্র,

শুধু জানি একমাত্র

ভালোবাসা থেকে দুরে সরে গেলে,

ভালোবাসাতেই ফিরতে হয়।


Monday, November 15, 2021

অবান্তর ৭৪ ওপরকক্ষ নীচকক্ষ

    ওপরকক্ষ  নীচকক্ষ



আমার নীচকক্ষে  একজন স্মৃতিতে থাকে আর একজন স্মৃতিচারণায়,

কালের নদীতে শুশুক ডুব দিয়ে দিয়ে তুলে আনে ক্ষয়াটে মনিমুক্তোর হাড়পাঁজর।

দিনশেষে পড়ন্ত বেলায় সারাক্ষন ঝগড়া করে

গা আউলায়

অথবা গুনে গেঁথে ওষুধ বাঁচায়।

স্মৃতিপথে যত  তাগিদ আসে, আঁশশেওড়ার ডালের  ওপর পা ঝুলিয়ে  ক্ষেন্তি বুড়ির দিদি শাশুড়ির গল্প করে।

পুরোনো জিনিস ঝালিয়ে ঝুলিয়ে নেয়,

পুরনো কাপড় চোপড় পোঁটলা করে স্মৃতিতে সাজিয়ে রাখে।


অদেখা মানুষ আর অচেনা সমস্ত বিষয়ে মনোযোগ দিয়ে নিজেকে প্রয়োজনীয় করে তোলে সংসারে।

অস্তিত্ব রক্ষার বড় দায়।



অথচ একদিন ছিল,

দুহাতে দুপায়ে হামাগুড়ি দেওয়ারও  অবসর ছিল না ।

টগবগে ভাতে গরম ফ্যান ফেলে খাওয়ার ফুরসত নেই,

চুলের জট চুলেতে গিঁটিয়ে, ব্যাগ তুলে দৌড়,

ফিরে এসে পুনরাবৃত্তি, কোনো কোনো দিন রাতজাগরন, কোলের শিশুকে কোলে করে।


আর আজ

খনি খুঁড়ে চলে

ধারাবাহিক মনুষ্য জীবন,

বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে, তা দেয় , 

ডানা শক্ত হলে উড়াল দেখে।


তারপর 

একটা চেয়ার, কিছু পোঁটলা,মাথার কাছে কিছু ওষুধের আনাগোনা, একলা নীল বাতি আর

একটা কাজের মেয়ে।

জীবনের সবচেয়ে আপনজন, ওপারের আলো।

তেল মাখে, গল্প করে জীবনের অন্ধি সন্ধি ক্ষন।

সঞ্চিত পুঁটুলিরা নিশ্চিন্তে ঘুমোয়।

এদিকে শুকনো রুটি ফুলতে ফুলতে আকাশ রচনা করে।

মানুষটি তখনো স্বপ্নে বিভোর ।




Sunday, November 14, 2021

গুড়মহল

 গুড় মহল


অর্পিতা চৌধুরী

কলেজ শিক্ষিকা

গৌরব গুঁইন মেমোরিয়াল কলেজ

চন্দ্রকোনা রোড, পশ্চিম মেদিনীপুর



শীতের সূচনা হচ্ছে, সকালে পাতলা সরের মত কুয়াশা ধীরে ধীরে ঘন হচ্ছে , গা শিরশিরানি ঠান্ডা বাতাস এবারে কালিপুজোর আগে থেকেই জানান দিচ্ছে শীত আসছে।  রাতভোরে কার্তিক মাসের হরিনাম সংকীর্তন কানে আসার আগে আগেই রহমত অস্থায়ী খেজুর পাতার ছাউনী ছেড়ে উঠে পড়ে,  শ্বশুর আর ফুফাতো ভাইকে ডেকে দেয়, তারপর উজু করে, ফজরের নামাজ পড়ে। আজ বাঁধের  পশ্চিম পাড়ের গাছ গুলো থেকে রস নামাতে হবে।


ঠিক এই চিত্রটাই এখন বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার প্রান্তরে প্রান্তরে। ভোর থেকে সাইকেলে প্রায় গোটা তিরিশ হাঁড়ি চাপিয়ে রস সংগ্ৰহের পরিচিত চিত্র শুরু হয়ে গেছে পশ্চিম বাঁকুড়ার খাতড়া, মুকুটমনিপুর, রানীবাঁধ, ঝিলিমিলি, সিমলাপাল, সারেঙ্গা, ঝাড়গ্ৰাম, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর অর্থাৎ পুরো জঙ্গলমহল জুড়ে। ভাদ্র মাসে চারদিকে মাঠে ঘাটে, নদীপাড়ে, ছড়িয়ে থাকা খেজুর গাছেদের চেঁছে  রাখা হয়। শীতের শুরুতেই খেজুর পাতার ছাউনী আর মাটির গাঁথনী দিয়ে অস্থায়ী ছাউনী বানিয়ে ফেলেন মহলদারেরা। তৈরী করে ফেলেন এক জাবদা মাটির উনুন আর সঙ্গে থাকে লোহার শিটের চারকোনা বড়সড় কড়াই। ভোর থেকে সকাল ৭টার মধ্যেই চলে সমস্ত রস সংগ্ৰহের কাজ, তারপর বড়সড় কড়াইতে সেই রস কাঠের আগুনে ফুটতে থাকে ঘন্টা তিনেক, পুরো সময় ধরে নাড়তে হয় সেই রস নাহলে পুড়ে বা ধরে যাওয়ার ভয় থাকে। পাটালীর গুড় তৈরি করতে তো আরো বেশীক্ষন ফোটাতে হয় তবেই সেই মোটা গুড় থেকে হয় পাটালী। তারপর সারাদিন সেই ফাঁকা প্রান্তর থেকে চলে প্রয়োজনীয় জ্বালানী সংগ্ৰহ। ভোর থেকে ঝোপেঝাড়ের মধ্যে থাকা গাছে উঠে রস সংগ্ৰহ খুব সহজ কথা নয়, তবু এই ভূমিপুত্ররা বংশ পরম্পরায় এই তিনমাস গুড় মহল তৈরি করেন। যা সারা  পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে স্বাদ আর গন্ধ নিয়ে। বেড়াতে আসা মানুষজন নিয়ে যান তাদের শহুরে আলয়ে, খেয়ে যান খেজুর রস। তবু  সময় প্রেক্ষিতে আর বর্তমান প্রজন্ম এই পরিশ্রমের কাজে আসতে চাইছেন না। হাড় হিম ঠান্ডা, পরিশ্রম, খোলা প্রান্তরে কখনো হাতির উপদ্রব ঐ অস্থায়ী খেজুর পাতার ছাউনী রোধ করতে অপারগ। মূলত পরিশ্রম সাধ্য কাজ বলেই হয়তো মুসলীম শ্রেনীভুক্ত মানুষজন গুড় বানানোর কাজে নিযুক্ত থাকেন।তবে মাটির হাঁড়ি ব্যবহৃত হলে রসের গুনমান ঠিক থাকে, কিন্তু মুখ বড় হওয়ার কারনে বাদুড়ে মুখ দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে যা থেকে নিপা ভাইরাস সংক্রমণের ভয় থেকে যায়। আর ভারী এবং বারে বারে ভেঙ্গে যাওয়ার ভয় থাকে বলেই বেশীরভাগ মহল দার সরু মুখ, হালকা, টেকসই  প্লাষ্টিকের হাঁড়ি বর্তমানে ব্যবহার করেন। গাছ প্রতি  দেড় কিলো করে গুড় গাছ বা জমির মালিক কে দিতে হয়, কেউ কেউ মূল্য নিয়ে নেন।


খেজুর গাছ রাঢ়বঙ্গে যত্রতত্র জন্মালেও কোনো কিছুই ফেলা যায় না। সে খেজুর পাতায় বোনা চাটাই হোক কিংবা ছোটো ছোটো গাছ কেটে কান্ডর মাঝখানের আঁতি বার করে খাওয়া, অথবা বর্ষার জল পেলেই থোকা থোকা ফুলের মত পাকা হলদে বর্নের খেজুরের বাহার আর শীতে সরষের তেলের মত টলটলে গুড়  পিঠে পায়েসের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়। 


প্রকৃতি আসলে শীত উপহার সাজিয়ে দেয় শীত প্রতিরোধের জন্য। খেজুর রস এনার্জি ড্রিঙ্ক হিসেবে কাজ করে , এর মধ্যেকার সোডিয়াম - পটাসিয়াম পেশীকে শক্তিশালী করে তোলে, কর্মক্ষমতা বাড়ায়, মেটাবলিজম রেট বৃদ্ধি করে, গুড়ে অবস্থিত আয়রন আ্যনিমিয়া বা রক্তাল্পতা কমায়, কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে, মেদ ঝরাতে সহায়ক এবং ঠান্ডা প্রতিরোধক । শ্রমজীবি গ্ৰামীন দরিদ্র ভূমিপুত্রদের প্রকৃতি দেবী তার উপহার সাজিয়ে দেন । সমস্ত গাছ গুলোকে দুই ভাগে ভাগ করে নিয়ে তিনদিন পর পর এক একটি ভাগ থেকে রস সংগ্ৰহ করা হয়। তিনদিন পর্যায়ক্রমে একভাগ থেকে রস সংগ্ৰহের পর, পরের তিনদিন অপর ভাগ থেকে রস সংগৃহিত হয়।  তিনদিন জিরান বা বিশ্রামের পর যে রস পাওয়া যায় তাকে বলা হয় ' জিরান কাঠের রস। তবে এই সুস্বাদু রস গ্লাস দুয়েকের বেশী না খাওয়ায় ভালো বা বেলা হয়ে গেলে তা গেঁজে গিয়ে নেশাজাত পানীয় হয়ে ওঠে। গাছের এক পিঠ এ বছর কামানো হলে পরের বছর অপর পিঠ কামানো হয়, এভাবেই গাছ লম্বা হয় আর এপিঠ ওপিঠ করে পরম যত্নে গাছ বাঁচিয়ে রেখে রস সংগ্ৰহ প্রক্রিয়া চলে প্রতি বছর। পৌষ সংক্রান্তির দিন থেকেই  প্রায় সমস্ত মহল ভেঙ্গে ফেলা হয়। আবার অপেক্ষা পরের শীতের, আবার অপেক্ষা মহলের পাশের রাস্তায় ধোঁয়া ওঠা সদ্য গুড়ের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার, রাঢ় বঙ্গের অন্যতম জীবিকা ও জীবনের । 







Sunday, November 7, 2021

প্রতিবেদন - গরুখুঁটা

 বাঁদনা পরব আসলে রাঢ় ভূমির কৃষিজীবনের অষ্ট্রিক প্রতিভাস



কার্তিক অমাবস্যাতে যখন সারা ভারতবর্ষ দীপান্বিতার আরাধনায় ব্যস্ত, দক্ষিনবঙ্গের রাঢ়ভূমিতে শুরু হয়ে যায় সেই রাত থেকেই অন্য এক কৃষিকেন্দ্রিক উৎসব বাঁদনা বা বাঁধনা পরব।

চলে তিনদিন ধরে, কোথাও চারদিন ধরে চলে, আবার কোথাও কোথাও রাসপূর্ণিমায় গিয়ে শেষ হয়। মূলত আদিবাসী মানুষজন প্রকৃতি থেকেই তাদের ধর্মের ধারনা গ্ৰহন করেছেন এবং জীবন লব্ধ অভিজ্ঞতাগুলিকে মান্যতা দিয়ে প্রকৃতি পূজাকেই মান্যতা দিয়েছেন। এই অঞ্চলে কোল, ভীল, মুন্ডা, সাঁওতাল, মাহালি, ছাড়াও আরো অন্যান্য জনজাতি  কূর্মি, ভূমিজরাও  পাশাপাশি বসবাস করেন । প্রত্যেকেই দৈনন্দিন জীবন অভিজ্ঞতা নিজস্ব সাংস্কৃতিক আচার - আচরনের মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করলেও  এদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড কৃষিকেন্দ্রিক হওয়ায় সহজাত ভাবেই সংস্কৃতির আদান-প্রদান ঘটে গেছে অজান্তেই কিছুটা প্রয়োজনে।



 এরকমই একটি কৃষিকেন্দ্রিক উৎসব হল 'বাঁদনা' বা 'বাঁধনা' পরব। বাঁধনা শব্দটির অর্থ হল বন্ধন। মূলত পাকা ধান ঘরে তোলার প্রাক্কালে কৃষিজমির অন্যতম কান্ডারী গো - সম্পদের অর্চনা এই অনুষ্ঠানের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। কালিপুজোর রাত থেকে শুরু হয় অহিরা গান বা গো- জাগান । ধামসা, মাদল, বাঁশি সহযোগে গ্ৰামের কৃষিজীবি সমাজ অহিরা গানে মেতে ওঠেন। পরের দিন সকাল থেকে উঠোন গোবর দ্বারা পরিমার্জন করে একধরনের বনলতা ও চালের গোলায় পিটুলি গুলে সারা উঠোন আল্পনা দেওয়া হয়। এদিন বিকেল বেলা গোয়ালে বা উঠোনে গরুগুলিকে মাঠ থেকে তুলে আনা ধানশীষ মুকুটের মত পরিয়ে দেওয়া হয়, মাঠ থেকে কেটে আনা ঘাস খেতে দেওয়া হয়, পায়ে ঢালা হয় হলুদ জল, গায়ে গিরিমাটির ছাপ। যেন পুনর্বার  লক্ষ্মী আগমনের সূচনা করা হয় এই গো- বন্ধন বা গোরুর বিয়ের মধ্য দিয়ে। একদিকে বিবাহের মধ্য দিয়ে গো- সম্পদ বৃদ্ধির কামনা অপরদিকে বাঁধনা বা বন্ধনের মধ্যে চঞ্চলা লক্ষ্মীকে বেঁধে রাখার প্রয়াস দেখা যায় এই রীতিনীতির মাধ্যমে।এদিন থেকে  রাঢ়বাংলার পিঠে তৈরীর (বিশেষত সেদ্ধ পিঠে যা গড়গড়া নামে পরিচিত) সূচনা হয়, চলে সরস্বতী পুজো পর্যন্ত। এসময় তিনদিন গরুকে বিশ্রামে রাখা হয় এবং মাঠ থেকে ঘাস কেটে এনে বাড়িতে খাওয়ানো হয়। পরের দিন ভাতৃদ্বিতীয়া, এদিন অথবা গ্ৰাম বিশেষে এর পরের দিন বাঁদনার শেষ অনুষ্ঠান গরুখুঁটা পালিত হয়। এদিন বিকেল থেকে বলিষ্ঠ পশুগুলিকে শাল খুঁটি অভাবে বেশ শক্তপোক্ত খুঁটির সঙ্গে বাঁধা হয়। সমানে বাজতে থাকে ধামসা - মাদল, হতে থাকে লম্ফঝম্প দিয়ে নাচ আর চিৎকার, সেইসঙ্গে দোহার ধরে গান, আর গরু বা খুঁটিতে বাঁধা কাড়া বা মোষগুলির সামনে  নাড়া হয় পশুর চামড়া, তাকে ক্রমাগত উত্যক্ত করে তোলা হয় যাতে সে গুঁতো মারতে তেড়ে আসে। কোনো কোনো সময়  গুঁতোর চোটে সামনের মানুষজনও আছাড় খায়, কখনো খুঁটি ছিঁড়তেও দেখা যায়।


মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এটিকে অমানবিক বলে মনে হলেও অনুসন্ধান করলে উঠে আসে অন্য এক চিত্র। জঙ্গল অধ্যুষিত রাঢ় বাংলায় বাড়ি আর জঙ্গল পাশাপাশি অবস্থিত। মানভূম অংশের এই অঞ্চলে এখনো বুনো হাতি, ময়াল, পাইথন, হায়না, বুনো শুয়োর, নেকড়ের দেখা হামেশাই মেলে। অতএব , সহজেই অনুমেয় আরো প্রাচীনকালে এখানে বাঘ- ভাল্লুকের উৎপাত হামেশাই ঘটতো, শীতের সূচনায় গ্ৰামীন মানুষ সন্ধ্যে হতেই আশ্রয় নিতো কুঁড়ের ভিতরে, অথচ গবাদি পশু গুলি পড়ে থাকতো ফাঁকায়। পাশেই জঙ্গল, তাই ফাঁকা জায়গায় বাঁধা গো সম্পদ যাতে নিজেদের রক্ষা করতে পারে, অথবা পাড়া জাগাতে বা মানুষজনকে সচেতন করতে ব্যবহৃত ধামসা- মাদলের শব্দে যাতে বিভ্রান্ত হয়ে না পড়ে সেই চিন্তা থেকেই এই 'গরু খুঁটা বা কাড়া খুঁটা'উৎসবের সূচনা। এ অনুষ্ঠান থেকে তাদের গবাদি পশুদের রক্ষার চিন্তা ও ভালোবাসা প্রকাশ পায়। এ যেন সন্তানকে আত্মরক্ষার কৌশল শেখানোর এক অভিনব প্রয়াস যা উৎসবের রূপকে ধরা দেয় রাঢ়বঙ্গে।


  

Saturday, November 6, 2021

বাঁধনা পরব

       গো বাঁধনা / জামাই বাঁধনা





রাঢ়বঙ্গে হিমেল শিশিরে শুরু হয়ে গেল শীতের আগমনি গান, বাঁধনা পরব তার মুখ বন্ধন  করে দিল। মাঠে মাঠে সোনালি মধুমালতি সুবাস ছড়াচ্ছে এবার শুধু ঘরে আনার পালা। কৃষিজমির চাষবিন্দুতে যারা দাঁড়িয়ে আছে সেই গো সেবার মধ্যে দিয়েই ধন্যবাদ জানায় কৃষককুল। গতকাল গিয়েছে শক্তি রুপিনীর  আরাধনা, গ্ৰামে গ্ৰামে বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয় কুটুম্বে মুখরিত, কাল ভাতৃদ্বিতীয়া, এই মাঝের দিনটি বাঁকুড়া, পুরুলিয়া অঞ্চল বাঁধনা পরবে মেতে ওঠে, শস্যভূমিকে প্রনাম জানায়, বাড়ির নিকোনো মাটির উঠোন চালগোলা আর বনজ পাতার মিশ্রনে গোলা পিটুলি দ্বারা চিত্রায়িত করে, বিকেল হলে গোরুগুলিকে স্নান করিয়ে , বনলতা আর তেল সিঁদুর মাখিয়ে, পিঠ গিরিমাটি বা আলতার ছাপ দিয়ে রাঙিয়ে তোলা হয় , তারপর তাদের বিয়ে দেওয়া হয় , যাতে গো সম্পদ বৃদ্ধি পায় তারই কামনা করা হয়। যেহেতু গ্ৰামজীবনের অর্থনীতিতে কৃষিই মেরুদন্ড তাই টুসুর প্রাক্কালে বাঁধনা পরব কৃষি উৎসবের সূচনা ঘটায়। সকাল থেকেই এদিন গ্ৰামে গ্ৰামে উৎসবের আবহে পাড়ায় ঘুরে ঘুরে নাচ গান  শুরু হয়ে যায় । ফসল কাটার সময় এসেছে, এতদিনের পরিশ্রমের পর যেন একটু বিশ্রাম, তাই গো - বাঁধনা।


এদিকে পশ্চিম মেদিনীপুর অঞ্চলে আজ পালিত হয় 'জামাই ফোঁটা'। অনেকেই মজা করে গান করেন - গরু বাঁধো খুঁটাতে

             জামাই বাঁধো খুঁটাতে

এভাবেই মোটামুটি আজ থেকেই শুরু হয়ে গেল রাঢ় বাংলার পরব, সেইসঙ্গে পিঠা পরব। আজকে রাত্রি বেলা পুরভরা সেদ্ধ পিঠে বাড়ি বাড়ি তৈরী হবে, চলতি ভাষায় 'গড়গড়া পিঠা', চলবে সরস্বতী পূজো পর্যন্ত। তারপর আর কোনোভাবেই এই পিঠে আর তৈরি হবে না। আসলে গ্ৰামীন মানুষ জানে যে এরপর গরম পড়ে গেলে পিঠে হজমে সহায়ক হয় না, আর সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এই নিয়ম। তাই হিমেল স্পর্শে আজ থেকেই শুরু হয়ে গেল বাড়ি বাড়ি পিঠে পরবের সূচনা।


গ্ৰামবাংলার এই আন্তরিক উৎসব বেঁচে থাক, বেঁচে থাক গ্ৰামীন সমাজ, এই উৎসব গুলির মধ্যে দিয়েই আমরা মাটি খুঁজে পাই, শিকড় খুঁজে পাই, লক্ষ্মীর পদধ্বনীর শব্দ পাই মধুমালতির শিরশিরানি গন্ধে। নাক ভরে নিঃশ্বাস নিই, দুর থেকে আসছে শাঁখের আওয়াজ, গরুর বিয়ে হচ্ছে, ক্ষেতের উপর উড়ে যাচ্ছে একটা পেঁচা, চাষা জীবন উঠোনে মাথা ঠেকাচ্ছে, কাঠের উনুন থেকে উবে আসছে গড়গড়ে পিঠের সুবাস। টুসু আসছে, ধান্যলক্ষ্মী উঠোন ভরাবে তারই প্রস্তুতি চলছে, আটচালায় হাত পা ছড়িয়ে মশগুল চাষা জীবন। উৎসবের শেষ নয়, উৎসবের শুরু।

           

                      ‌অর্পিতা


বাড়া বা বাড়ানো

 বাড়া বা বাড়ানো


নৃতত্ত্বের বিচারে রাঢ় বাংলার প্রাচীনতম অধিবাসীদের মুলত আদি অস্ট্রেলিয় বা প্রোটো  অস্ট্রেলিয় নরগোষ্ঠীরই সর্বাধিক সংমিশ্রণ  ঘটেছে‌। হিন্দু সমাজের তথাকথিত অন্ত্যজ বা তপশীলিভুক্ত জাতিসমূহের মধ্যে বাগদি, ডোম, মাল ,মুচি, বাউরী ইত্যাদি। এই নৃতাত্ত্বিক বনিয়াদটি গড়ে উঠেছে মূলত আদি অস্ট্রেলীয় উপাদান নিয়ে , আজও তাই এদের মধ্যে আদি অস্ট্রেলিয়া উপাদান যথেষ্ট বিদ্যমান। নৃ- তাত্বিক উপাদান আদি অস্ট্রেলীয় খুব স্বল্প পরিমাণে দ্রাবিড় ঐতিহ্য  এই দুই সমন্বয় এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। অতএব এরা বহিরাগত জাতি নয় , আমাদের দেশের আদিম অধিবাসী।



বর্তমানে বাঁকুড়া জেলায় বাউরী উপজাতির  আনুমানিক সংখ্যা প্রায় 4 লাখ এর কাছাকাছি। মূলত শালতোড়া মেজিয়া বড়জোড়া, গঙ্গাজলঘাটি, ছাতনা ,বাঁকুড়া খাতড়া, সিমলাপাল ,ওন্দা এই এগারটি থানাতে সারা জেলার দুই তৃতীয়াংশ মানুষ বাস করে। 'বাউরী' শব্দটির বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার হতেও দেখা যায় - বাতাস ও মন শব্দের সঙ্গে । বাউরী শব্দের প্রকৃত অর্থ আমরা পাই যাযাবর অর্থাৎ অনুমেয় যে সুদূর অতীতে এরা যাযাবর ছিলেন।



কার্তিক অমাবস্যায় যখন সমগ্ৰ ভারতবর্ষ দীপাবলীর আলোকমালায় সসজ্জিত হয়ে উঠেছে সেই সময় রাঢ় বাংলার বাউরী তপশীলিজাতি সম্প্রদায় পালন করল তাদের বাড়া বা বাড়ানো অনুষ্ঠান। কালীপুজোর দিন এই সম্প্রদায় তাদের প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তাদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এদিন সকালে স্নান করে উপোস থেকে , কাঁচা জামাকাপড়ে শুদ্ধ হয়ে,নতুন মাটির খোলায় রান্না চাপানো হয়।। বাজারে যত রকম নতুন সবজি, বিশেষত শীতের সবজি বাজারে আমদানি হয় সেই সব দিয়ে নয় রকম তরকারী মাংস ও বিউলির ডাল রান্না করা হয়। পুকুর থেকে তুলে আনা হয় শালুক পাতা ও উড়ু ধান( পুকুরের জলেই জন্মানো একজাতীয় ঘাস থেকে প্রাপ্ত দানা) ,  ঘরের ভিতর পরিস্কার করে আলপনা দেওয়া হয় এবং চালের গুঁড়ো সেদ্ধ করে নটি ঘিয়ের বা তেলের প্রদীপ ও ধুপ জ্বালানো হয়।তিনটি বা পাঁচটি শালুক পাতার চারদিক উড়ুধানের শিস দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়। এরপর নয়টি বা ষোলোটি পিন্ড যথাক্রমে তিনবার করে দিয়ে পিন্ড তৈরী করেন বর্তমান গৃহকর্তা, তারপর উপোসরত বাড়ির অন্যান্যরা পূর্বপুরুষদের আত্মার উদ্দেশ্যে ভোগ নিবেদন করেন, এদিন  মনে করা হয়ে  থাকে যে, পূর্বপুরুষেরা নেমে আসেন এই নয় তরকারী ভোগের পিন্ড গ্ৰহন করতে, এবং পরিবারের উপর কৃপা বজায় রাখেন। এজন্য বিধবা স্ত্রীলোক স্বামীর উদ্দেশ্যে, সন্তানেরা পিতার উদ্দেশ্যে এই পিন্ড বাড়িয়ে দেন। কাজ সম্পন্ন হলে সমস্ত জায়গা জল ঢেলে পরিস্কার করে নিকটবর্তী জলাশয়ে গিয়ে বিসর্জন দিয়ে আসা হয়,এরপর এদিন পরিবারের সবাই খাদ্যগ্ৰহন করেন। পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে এই স্মৃতিতর্পণ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্যই এর নাম বাড়া বা বাড়ানো। 


ঋন স্বীকার : 

ডঃ বিধান মুখোপাধ্যায়, বাউরী সম্প্রদায়ের উৎপত্তির ইতিহাস ও ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

সমীক্ষাস্থল:  খাতড়া



Friday, November 5, 2021

আলোচনা : কাঁদো নদী কাঁদো, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ

 প্রসঙ্গ : কাঁদো নদী কাঁদো

           সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ


            অর্পিতা চৌধুরী



সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বাংলাদেশের সাহিত্যে অন্যতম প্রথম সারির লেখক। বাংলা সাহিত্যে ‌অস্তিত্ববাদের পরিচায়ক এবং সাহিত্যের মাধ্যমে ধর্মীয় ও সামাজিক গোঁড়ামির দিকে আঙ্গুল তোলার অগ্ৰদূত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। বাইরে আপাদমস্তক সাহেবিআনা অথচ ভেতরে বাঙালীয়ানায় ভরপুর মানুষটির ইসলামী মূল্যবোধ ও মুসলিম শিষ্টাচারের সঙ্গে হিন্দু- মুসলমানের সমন্বয়ধর্মী খাঁটি বাঙালীয়ানার কোনো বিরোধ ছিল না। তাঁর সাহিত্যে মানবজীবনের আধ্যাত্মিক অযৌক্তিকতা বা Metaphysical Absurdity বা এর সাথে সামাজিক প্রতিচিত্রও উঠে এসেছে। এমনকি তার উপন্যাসে ব্যক্তি ও সমাজ একে অপরের পরিপূরক হয়ে চেতনাপ্রবাহমূলক রীতির ধারায় এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। তাঁর লেখাতে এসেছে ধর্মীয় গোঁড়ামির বেড়াজালে জড়ানো অধঃপতিত সামাজিক জীবন, এসেছে মানুষের জীবন জিজ্ঞাসা, এসেছে কঠিন সময়ের ঘূর্ণিপাকে হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক মানব জীবন ও মানবীয় আবেগের কথা।


সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহের রচনার প্রেরনা বা উৎস হিসেবে উত্তমর্ণ যে সব পূর্বসূরির উল্লেখ করা হয় তাদের মধ্যে আলজেরীয় জাত ফরাসী সাহিত্যিক আলবেয়ার কাম্যু অন্যতম। তাঁর ' কাঁদো নদী কাঁদো' উপন্যাসটিতে কাম্যুর 'The plague' গল্পটির প্রভাব আছে বলে মনে করা হয়। জীবনের কিমিতিবাদ স্বভাব ও আত্মহত্যার প্রসঙ্গ এই দুই লেখকের উপন্যাসেই লিপিবদ্ধ হয়েছে। ওয়ালীউল্লাহের 'কাঁদো নদী কাঁদো' উপন্যাসটিতে ধীরে ধীরে একটি জীবন্ত চলন্ত নদী মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আর নদীপাড় আশ্রিত মানুষগুলোও ধীরে ধীরে তাদের জীবনের চঞ্চলতা হারিয়ে শ্লথ ও গতিহীন হয়ে পড়ছে আর সমস্ত কিছু ছাপিয়ে নদী যেন নারী হয়ে উঠে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে। একটা মফস্বলীয় জীবন্ত গঞ্জ ধীরে ধীরে রিক্ত, শূন্য হতে শুরু করে। যে নদীকে নিয়েই ছিল চঞ্চলতা, ধারাবাহিকতা, বাইরের সঙ্গে মসৃন যোগাযোগ সেই বহির্বিশ্বের অস্তিত্ব ধীরে ধীরে লোপ পায় কুমুরডাঙ্গার কাছে।


এই  উপন্যাসটিতে সংলাপ অংশের পরিমাণ বেশ কম, কারন এই উপন্যাসের বাঁধুনি বা গঠন কৌশল নির্মান সম্বন্ধে লেখকের অন্যরকম অভিপ্রায় ছিল। একদিকে চাচাতো বোন খাদেজার আত্মহত্যার দায়ভাগ কল্পনার কারন হিসেবে এক অপরাধ মনস্ক মানসিকতায় দীর্ন ক্ষতবিক্ষত ব্যক্তির নিজস্ব কথোপকথন। অপরদিকে বহির্জগতের সঙ্গে সবচেয়ে সহজ মসৃন পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কাব্যাকুল মনস্তত্ব। সমগ্ৰ উপন্যাসটিতে দুজন কথকের সন্ধান পাওয়া যায় - 'আমি' বলে এক ব্যক্তি, যে মুহম্মদ মুস্তফার কথা বলে চলে,  সম্পর্কে মহম্মদ মুস্তফার চাচাতো ভাই। আর ঐ ষ্টীমারেরই যাত্রী তবারক ভুঁইয়া, যার মাধ্যমে কুমুরডাঙ্গা শহরের শারীরিক, মানসিক পরিবর্তনের গল্প শোনা যায়। এই 'আমি' নামক চরিত্রটি পর্যায়ক্রমে একবার তবারকের আচরন, কথাবার্তা, বিবরন বিশ্বস্ত ভাবে লিপিবদ্ধ করে অপরদিকে মহম্মদ মুস্তাফার স্মৃতি আখ্যান বিবৃত করতে থাকে।


উপন্যাসটির আখ্যানকাল মাত্র একদিনের ষ্টীমারযাত্রা, অথচ এই একদিন সময়কালকে লেখক ঘটনাক্রম পরম্পরায় ও দুজন কথকের অন্তরালে এমন ভাবে সাজিয়েছেন যে পাঠক যত গভীরে প্রবেশ করবে ততই যেন কুমুরডাঙ্গার জীবন, যাপন, চঞ্চলতা ধীরে ধীরে মৃত্যু পরিনতি নির্মম রূপ নেবে। একটি আস্ত জলজ্যান্ত নদীর ধীরে ধীরে মৃত্যুর মোহনায় দাঁড়িয়ে থাকা অথবা কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়ার মধ্যে অতিপ্রাকৃতের মর্মরধ্বনি যত না শুনতে পাই তার থেকেও এক ভয়ংকর নির্মম পরিনতির প্রহর যেন ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসছে তারই পদচারনা হতে থাকে সমগ্ৰ উপন্যাস জুড়ে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বাঁধুনির গুনে লেখক,পাঠক মনে একটা বিস্ময় জিজ্ঞাসা জাগিয়ে রাখতে সক্ষম হন।


ঘটনাক্রম শুরু হয় দ্বিপ্রহরে ষ্টিমারের ডেকের উপর থেকে। প্রথম পৃষ্ঠা থেকেই অনুমান ভিত্তিক তবারক ভুঁইয়ার নামহীন  পরিচয় লেখক দিতে থাকেন চেহারা বর্ণনায়। বয়স চল্লিশ বা কিছু বেশি, গায়ের ফর্সা রঙ পুড়ে মলিন, পরনে বহু পুরাতন, বহু ব্যবহৃত কিন্তু পরিস্কার পরিচ্ছন্ন জামাকাপড় , ক্ষয়াটে জুতো। এরপর ধীরে ধীরে  'আমি' নামক বক্তাটি এই তবরেজ মিঞার  হাতে গল্পের চাবিকাঠি তুলে দেন তবে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এই ব্যক্তির পরিচয় প্রসঙ্গে একটা সংশয় সূচক প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে রাখেন। ষ্টিমার ঘাটের টিকিট কেরানী তবরেজ ভুঁইয়ার  সাথে যে কুমুরডাঙ্গার হাকিম মুহম্মদ মুস্তফার ঘনিষ্টতা ছিল তা ধীরে ধীরে জানা যায়।


মানুষ যেমন তার পারিবারিক ভিত্তিভূমিকে অস্বীকার বা অতিক্রম করতে পারে না তেমনি মুহম্মদ মুস্তফাও তার পারিবারিক গন্ডী, পূর্ব জীবন, বাবা খেদমতুল্লার অতীত, মা আমেনা খাতুনের দুঃখ সমস্ত অতিক্রম করে এলেও তার শান্ত , গম্ভীর, নিরুত্তাপ, বহিরাঙ্গিক রূপটি যেন সেই ছেলেবেলাকার নির্মম ইতিহাসের সংগ্ৰামকে মনে পড়ায়। ছেলেবেলার অতীত জীবনকে অতিক্রম করার জন্যই যেন মুস্তফা তার চরিত্র কে খোলসের মধ্যে গুটিয়ে নিয়ে সম্পূর্ণ অন্য মানুষে রূপান্তরিত হয়।


কুমুরডাঙ্গার বাকাল নদীটি ধীরে ধীরে চড়া পড়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে, ষ্টীমার চলাচলের অনুপযোগী হয়ে ওঠে। ষ্টীমার চলাচল বন্ধ, ঘোষনার সাথে সাথে যেন এই প্রায় শহরটিরও মৃত্যুদন্ড ঘোষনা হয়ে যায়। হঠাৎ করেই যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে শহরটি। উকিল কাফিলউদ্দিনের ব্যর্থ চেষ্টা, ডাক্তার বোরহানউদ্দিনের মত অসংখ্য মানুষ প্রহর গোনে এক অজানা আশংকায়। আচমকাই এক মানসিক ব্যাধির উৎপত্তি হয়, যেদিন ঘাট থেকে পুরনো ষ্টিমারটি যেটি ভাসমান টিকিটঘর, বা বাসস্থান হিসেবে পরিচিত ছিল সেটি যখন  নিয়ে যাওয়া হয় তখন যেটুকু আশা ছিল ষ্টিমার চালু হওয়ার সেটুকুও অন্তর্হিত হয়।খতিব মিঞা তার ভাসমান ফ্ল্যাটের বাসস্থান ছেড়ে এই প্রথম ডাঙ্গায় ওঠার কথা চিন্তা করে, যেন জলজ ভাসমান জীবন ছেড়ে শিকড় গাড়ার চেষ্টা। এতদিন মাটির সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, কুমুরডাঙ্গায় থেকেও ননএনটিটি, তা ঘোচাতে উঠে পড়ে লাগতে হয়। আর এই ভাসমান ফ্ল্যাটটি অদৃশ্য হওয়ার সাথে একটা অদৃশ্য শিলমোহর বসিয়ে যায়, শুরু হয় এক অদৃশ্য রোগ। মোক্তার মোসলেহউদ্দিনের মেয়ে, মাষ্টারনি সাকিলা খাতুন হঠাৎ করেই এক বিচিত্র নারী কান্না শুনতে পায়, সেই শুরু, এরপর ধীরে ধীরে গন হিষ্টিরিয়ার মত প্রায় গোটা গ্ৰামের মানুষ এই কান্না শুনতে আরম্ভ করে, এক অজানা আশঙ্কায় নিজেদের মূল্যবান সম্পত্তি বাকাল নদীতে বিসর্জন দিতে শুরু করে আরো দরিদ্র হয়ে পড়ে। উকিল কাফিলউদ্দিনের গ্ৰাম ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে মৃত্যু, বিষয়টিকে আরো ঘনীভূত করে।


মুহম্মদ মুস্তফা, যে একদিন তার সমস্ত সৎচরিত্র দিয়ে পিতার দুশ্চরিত্র ঢাকতে গিয়েছিল, খোদেজার মৃত্যু তাকে ধীরে ধীরে প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে তার মধ্যে জন্মানো অপরাধবোধ মাথা চাড়া দিয়ে খোদেজার প্রতিমূর্তিতে সাকিনা বানু হয়ে সামনে দাঁড়ায়। অথচ সে জানতেও পারে না, খোদেজা তাকে নয় তার চাচাতো ভাইকে ভালোবেসেছিল, অথচ খোদেজার মৃত্যু মুস্তফার এতদিনের কষ্টার্জিত ভিত্তিপ্রস্তরকেই নড়বড়ে করে দেয়।নিঃসঙ্গ, ক্লান্ত আর ভীত করে তোলে মুহম্মদ মুস্তফাকে। তার মনের মধ্যে যে এক নিটোল সংসারের বুভুক্ষুতা ছিল তা তবরেজ ভুঁইয়ার সংসারে সে খুঁজে পায়। দরিদ্রের মত সে  আড়াল থেকে তাদের নিটোল সংসারের চলাফেরা আস্বাদন করতে থাকে এবং আরো নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।


বাকাল নদী ও মহম্মদ মুস্তফা দুজনেই যেন এক ক্লান্ত প্রান, ক্লান্ত শরীর, নিঃসঙ্গ হৃদয়। তারা একে অপরকে অপলকে দেখে আর ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। অবশেষে আত্মহত্যা করে জীবনের সব লেনদেন মিটিয়ে মুক্তির স্বাদ নেয় সে, তার পিতার দুস্কর্মের দেনা শোধ করে।


এদিকে ধীরে ধীরে স্থবির হয় কুমুরডাঙ্গার জীবন। নদী কাঁদে, যেন কুমুরডাঙ্গার দুঃখে কাঁদে, সেই কান্না অতি নির্মমভাবে লেখক গোটা কুমুরডাঙ্গার মধ্যে চারিত করে পরিনতির দিকে নিয়ে যান। চেতনা প্রবাহের বৈশিষ্ট্যের গত ভেঙ্গে শক্তিশালী লেখক ওয়ালীউল্লাহ প্রকৃতি ও জীবনকে অঙ্গাঙ্গী করে সমস্ত মিথকে বর্তমানে রূপান্তরিত করে এক আশ্চর্য ভাঙ্গাগড়া খেলার মনোসমীক্ষন দেখান খুব সাবলীল ভাবে। যেখানে বাকাল হয়ে ওঠে নারী আর কুমুরডাঙ্গা অবক্ষয়িত জনজীবন। যেখানে নদী কাঁদে মানুষের জন্য, মানুষ কাঁদে নদীর জন্য আর পাঠক অনুভব করেন শূন্যতা।



সহায়তা :

১.  সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ : জানা সাহিত্যিকের অজানা        জীবন জীবন , রুবায়েত আমীন, roar. media


২. ষ্টোরী অব সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ : শুভাশীষ 

     চক্রবর্তী, আনন্দবাজার, ১৫ই আগষ্ট ২০২১






Thursday, October 28, 2021

অবান্তর ৭৩, অনুগত শব্দ

    অনুগত শব্দেরা 



উড়ে যাও

মুক্তির সময় এসেছে।

ডানা ঝাপটানো পাখির মত ঝাপটাতে ঝাপটাতে 

ডানা খোলো।

বোঝো এবং বোঝাও নিজেকে

আবেগের পরিপাটি ভালো, 

শৃঙ্খলতা আনো।



ছেলেমানুষী ছাড়ো, 

আবেগীয় তত্বে সমঝোতা না করে 

মার্কস, লেনিন নেহাতই হিটলার হয়ে যাও।

নাৎসী আন্দোলনের বীজ বপন করো জঠরে 

 হৃদয়ে।


যা আর নেই,

আবেগীয় তত্ত্বের মগডালে তাকে বিরক্ত প্রশ্নচিহ্নের মত ঝুলিয়ে রেখো না।

পেড়ে ফেল একেবারে ধরাশায়ী করে,

ছেৎরে ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ুক প্রেমজ আবেগরা।


লৌকিকতা বড় বালাই

যা নেই তাই নিয়ে শুধু টানাটানি , দর কষা

তারপর তিতকুটে জিভে শুধু গালাগালি,

সমস্ত অনুগত শব্দদের জব্দ করে মুছে ফেল এক নিমেষে,

আসলেই তারা অনুগত নয়,

উপসংহার মাত্র।

এরপর আর কিছু নেই, স্বস্তি বা স্বস্ত্যয়ন ছাড়া।



দাঁড়ি, কমা, কোলনের মাঝে পড়ে

অনুগত প্রশ্নেরা বিস্ময় চিহ্ন হয়ে যায়।

আবার হেমন্তে হলুদ পাতারা খসে খসে যায়,

সমস্ত প্রশ্নচিহ্ন তুলে রেখে।



শুধু অনুগত শব্দেরা 

ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি খোঁজে

শীত ঘুমে শুয়ে রয় বুদ্ধ ও লেনিন ।



Friday, October 22, 2021

অবান্তর ৭১, ভয়েতে বাঁচি

         ভয়ে বাঁচি, ভয়ে থাকি





যার নেওয়ার অভ্যেস নেই ,

তাকে যদি দিতে চাও সে তো গুটিয়ে যাবেই।

তুমি তাকে উপহারে শাড়ি, গয়না, স্থাবর- অস্থাবর সব দিতে চাইছো,

অথচ এর বদলে যদি তুমি নিতে চাইতে দেখতে কত সহজে কলজেটা খুলে দিয়ে দিতাম।

দিতে চাইলেই কেমন হাত পা গুলো সেঁধিয়ে যেতে চায়,

এমনকি অসীম ভালোবাসা দিতে চাইলেও চোখ বন্ধ করি,

ভালোবাসাতেও এত ভয় পাই !

হাত বাড়ালেও হাত ফিরিয়ে নিই, 

আর তুমি ভাবো দাম্ভিকতা।


কি কি দিতে পারো আমায়?

স্থাবর কিছু আমার শরীরে আঁটবে না,

অথচ , 

কত অভিমানে অতি প্রিয় আংটিটা অনামিকা থেকে খুলে রেখেছিলাম,

আজ ,

 অভিমান গেছে

 অথচ আঙ্গুল রয়ে গেছে ফাঁকা।

হয়তো একদিন তেমনই দিতে দিতে দিতে ভালোবাসার দাম্পত্য ভয় পেতে শুরু করবে,

তারপর ,

ভয় চলে যাবে, ভালোবাসাও।



নিতে চাও ,বলো , কি কি নিতে চাও?

একটা গোটা পৃথিবী? না অধিশ্বরী নই,

তবে তোয়াক্কা না করা একটা পৃথিবী তোমার সামনে রাখতে পারি,

খড়কুটোর মত সমস্ত সমাজের মুখে লিউকোপ্লাস্ট চেপে ধরতে পারি,

হ্যাঁ, আরো কিছু পারি বইকি,

শুধু , দিতে চেও না।


যদি , দিতে চাও -

একটুকরো সময় দিও, একমেঘ ভালোবাসা আর একডাল ভরসার কাঁধ যেখানে জল ঝরে বারোমাস,

তবু ভয় পাই।

Tuesday, October 19, 2021

অবান্তর ৭১, অসময়ের অতিথি

 অসময়ে এসে অচেতন করে মন

কত করি যে যতন

কাজের পিঠে কাজ খুঁজে যাই

ভুলে থাকার ভাবনা বৃথাই

কাজের মাঝেও মুখ ঢেকে যায়

মন যে উচাটন,

এমন করে ডাকিস নে আর

ঘোর পিয়াসী ক্ষন,

বড় অসময়ে এলে যে আজ

মন যে উচাটন।


অসময়ে বাদল ঝরে

মনের মাঝে বাহির ঘরে

মন বসে না, মন থাকে না 

বাহিরে মগন,

এমন অসময়ে উদয় হলে,

বুকের ভিতর মন।


ভালোবাসার কান্না যত

রামধনুর ঐ রঙের মত

মেঘ দেয়ালার বৃষ্টি হলে

শিশির ভেজা কোন,

ও তা নরম ঠোটের আলতো আভাস

মন যে উচাটন,


বুকের পরে মনের ঘরে

মনের ভেতর যে বাস করে

বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না

অন্তরে মগন,


তবে যদি এলেই বন্ধু,

কিসের এত লাজ

অন্তরে আজ যে জন আছে

বাহিরেও সে আজ।


আজের সাথে ভীষন যখন

মনের টানাটানি,

কুটনো কোটা, বাটনা বাটা

চক্ষে  পড়ে পানি

মনের ভিতর মনের খবর

পাড়াটি নিঃঝুম।


উপর পাড়া , নামো পাড়া 

মধ্যেখানে চর,

চরের ভিতর চোরাবালি

মন কেমনের ঘর।


আসার যদি ছিলই বন্ধু

সাঁঝাল বেলায় কেনে ?

ঝিঙ্গাফুলের ভালোবাসা

কুড়মিলতা যেন।







অবান্তর ৭০

         কোজাগরী



তোমায় ছাড়া তোমায় নিয়ে  উঠছে ভরে মন

কোত্থাও নেই কিচ্ছুটি নেই

জড়িয়ে আছে ক্ষন,

ভালো থাকার  হিসেব ভারী

আলতো ঠোঁটে, মিষ্টি শাড়ি

মন পড়ে রয় একলা ঘরে

অভাব সঙ্গোপন,

লুকিয়ে রেখে ফুটিয়ে তুলি শিল্পী অনুক্ষন।


আমার আছো, নাই বা হলে

তাতেই কি অভাব

ভালোবাসার ভাবনারা আজ পরেছে মেঘ সাজ

ঠোঁট ফুলিয়ে বলে আড়ি

ভাব করেছে মেঘের বাড়ি

আকাশ আজ ভার নিয়েছে 

কাঁদছে সঙ্গোপন

শরতে আজ মন ভিজেছে বর্ষা উদযাপন।


কোজাগরী চাঁদ উঠেছে

উঠোন পানে রই

ঠোঁটের উপর ঠোঁটটি রেখে মনের কথা কই

নাই বা রবে ঠোঁটের যাপন, আলতো ছোঁয়া ভরসা জ্ঞাপন,

মনের ঘরে মন পড়ে রয়

ভরিয়ে অনুক্ষন।


চারদিকে তে আবেশ মেখে জড়িয়ে আছে সাজ

নিজের সাথে অনন্ত প্রেম কেন এত লাজ

জেদাজেদি আড়াআড়ি কথার পিঠে কথার আড়ি,

মন পেতে রই নীরব ঘরে

স্পর্শ সর্বক্ষন।


বন্ধ চোখে চোখ খুলে যায়

নীরব কথা মুখ খুঁজে পায়

মনের সাথে মনের কথা 

নিরন্তর যাপন।


আজ মন মজেছে, মন পুড়েছে

লক্ষ্মী আবাহন।


         কলমে - অর্পিতা


Wednesday, October 6, 2021

অবান্তর ৬৯

           স্মৃতিতে বাঁচি




অবেলার সবজির মত কিছু প্রেম বাকি রয়ে গেছে,

যখনই অনটন, দুর্যোগ,

 তখনই কুড়িয়ে বাড়িয়ে জম্পেশ করে রাঁধি।

অথবা ঘন দুর্যোগে বেশ করে খিচুড়ি পাকাই।


দেখা হলে ভালো,

না হলে কাঁথা পেতে শীত রোদে দেওয়া,

গরম, বসন্ত, হেমন্ত যাই হোক,

সব কাল রয় এরকম ।


এ যদি প্রেম হয়

বাকি থাকে কি?

কুশলতা বিনিময়

মনে মনে আধ বেঁচে থাকা।


বিনিময় প্রত্যাশা, কর্ম ধূসরতা

সব ছেড়ে দিয়ে নির্জনতা খুঁজি,

নির্জন কোন, একলা দুপুর, একলা মাদুর, পড়ন্ত রোদ , শেষ বিকেলের।

একলা স্মৃতি, চিলতে হাসি , ঠোঁটের কোনে আলতো থাক,

নজর লাগা বিকেল এখন,

স্মৃতিটুকু সামলে রাখ।


                   অর্পিতা



Friday, September 17, 2021

অবান্তর ৬৮

           আজও হয়



নতুন বৃষ্টির জলে‌ মাছের ঠান্ডা লাগে কি? জানিনা।

আনন্দ ! 

হয় কি?

তাও , 

জা নি না ।



তবে ভালোবাসা জাগলে আজও আমার নাকের পাটা ভিজে ওঠে,

মাথা নিচু করে আজও মাদুর বিছোই,

তারপর ধরে ধরে তার , 

মেরুদন্ড সোজা করতেই থাকি করতেই থাকি ।



কিছু মূহূর্ত কাটিয়ে দিতে পারলেই নোনতা জলেরা উবে যায়,

আবার ধু ধু চোখ তুলে সোজাসুজি এগিয়ে দিই জলের গেলাস ।       

                         অর্পিতা

                    


Monday, September 13, 2021

অবান্তর ৬৭

       স্থির হও



ভালোবাসার সময় এত অস্থির হতে নেই।

চুপ করে জড়িয়ে থাকো,

সমস্ত দ্বন্দ্ব মিটে যাক।

সমস্ত প্রেম শেষ হয়ে ঝরে ঝরে পড়ুক গাল থেকে গালে, নিঃশব্দে।

Saturday, August 28, 2021

গল্পঅল্প ৪ দরদালান

 দরদালান



নবমীর রাত, অনেকক্ষন খ্যান, আরতি শেষ হয়ে এখনো চারদিকে ধুনো আর ধূপের গন্ধ বইছে। জাগপ্রদীপের ধোঁয়া থেকেও ঘি পোড়ার বাস ছাড়ছে, কাল সকাল হলেই দশমী, আবার ঘরে ফেরা, গৃহস্থালীর কাজে ফেরা। পাতলা সরের মত নবীন কুয়াশা ধীরে ধীরে বিষন্নভাবে নামছে।একমাস ধরে সাজসজ্জা , এত আয়োজন, আলাপ, আলোচনার কাল সকালেই সমাপ্তি ঘটবে, কদিনের পুজোবাড়িতে ব্যস্ততার পর ক্লান্ত সবাই আজ ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু পুজোমন্ডপে ঘরের নেড়ি কুকুর কালু দলবল জুটিয়ে আড্ডা জমিয়েছে।


রাত নিশুতি হচ্ছে, একচালা দুর্গা মূর্তি থেকে বেরিয়ে এল এক সাধারন মেয়ে, পরনে কস্তাপেড়ে শাড়ি, প্রাচীন চৌধুরী বাড়ির দেওয়ালের কোটর থেকে লক্ষ্মী পেঁচাটা একবার চোখ তুলে তাকালো। এগিয়ে চলেছে সেই নারী, ঠাকুর দালান পার করে দরদালান, তারপর সদর, বৈঠকখানা, খাজাঞ্জিখানা, টানা বারান্দা,চুনসুরকীর মোটা মোটা দেওয়াল ওয়ালা সারি সারি ঘর, একে একে পার হয়ে গেল সে, কেন জানি এবার যেন তার একটু বেশীই মনখারাপ, অথচ প্রতিবারেই সে আসে আবার ফিরে যায়। ভোর হয়ে আসছে অবশেষে সে গিয়ে বসেছে যেখানে আজ একমাস ধরে মধু কুমোর তাকে সৃষ্টি করে তুলেছে একান্নবর্তী পরিবারের মত, একচালায়। ঠিক যেমন বাঙ্গালী সংসার বাঁধা থাকে তেমনি করেই গনেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতীর গর্ভধারিনী না হয়েও বাঙালী মায়ের মত আগলে রেখেছে সে তার সংসারকে।


সেই প্রথম দিন থেকে কাদামাটি আর খড় ছেনে যেদিন কাঠামে প্রথম মাটি পড়ে, তারপর যত শুকোতে থাকে তত মাটির কোনায় কোনায় ফাঁক ধরে, পিঁপড়েদের তার মধ্যে দিয়ে চলাচল প্রথম জীবনরসের সঞ্চার করে। তারপর ধীরে ধীরে নারীশরীর আকার পেতে পেতে চতুর্থীর সারারাত ধরে রঙ, গর্জনতেল, কাপড় আর সমস্ত সাজসজ্জা নিয়ে পূর্ণরূপিনী হয়ে ওঠেন চৌধুরী দের পূজামন্ডপে, আর সকালে বাড়ির বড়কর্তা দরদালানে দাঁড়িয়ে প্রনাম ঠুকে বলেন ত্বমসো মা জ্যোর্তিরগমঃ, ঠিক সেইমূহুর্ত থেকে দেবী সাধারনের ধরাছোঁয়ার বাইরে গিয়ে  পুরোহিতের হস্তে সমর্পিত হন। আবার তাঁকে ছুঁতে পারা যায় ঘট বিসর্জনে দেবীত্ব বিসর্জনের পর। দেবীত্বে শুধুমাত্র পুরুষতন্ত্রের অধিকার আর দেবীত্বহীন কাঠামোয় নারীর।দেবীর ঐশ্বর্য রূপ ভজন করবে পুরুষ আর উপচার সাজিয়ে দুর থেকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকবে ঘরোয়া রমনী, অবাক হয়ে দেখবে আরেক নারীর দেবী হয়ে ওঠার আয়োজন।


দশমীর সকাল, ঢাক বাজছে , সবাই ব্যস্ত শেষক্ষনে, বিজয়া আরতি চলছে, কাল থেকে যে যার কাজে ফিরবে সে সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আলোচনা চলছে আর পাল্লা দিয়ে চলছে ছবি তোলা। সারাবছরের জমানো সিধের মত মূহূর্ত গুলোকে যাতে জমিয়ে রাখা যায় তার জন্য বিভিন্ন কোন থেকে পোজ দেওয়া চলছে, অথচ দেবীর মনে আনন্দ নেই। কোথাও যেন ভাটার স্রোত ধাক্কা মারছে উজান পানে, নিংশব্দে চৌধুরী বাড়ির কার্ণিশ ভেঙ্গে পড়ছে, সবাই ছড়িয়ে পড়ছে, ফাটলের ডালপালাগুলো বড় হতে হতে শিকড় ছড়াচ্ছে, তাদের সন্তান সন্ততি জন্মাচ্ছে আর বাড়িটা আরো নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছে।

দেবী স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন অনাগত ভবিষ্যতে এ বাড়ির একটি নক্ষত্র খসে যাবে, অথচ আজ সেই একচালা একান্নবর্তী পরিবারকে এক ফ্রেমে বেঁধে রাখার কি নিদারুন প্রচেষ্টা।


বিসর্জনের ক্ষন এগিয়ে আসছে, মাঝি পাড়ার হারু, নাড়ু, নিমাই, কাদু সবাই মিলে বাঁশের মাচান করছে, এদিকে দরদালানে প্রতিমাকে আনা হয়েছে, বাড়ির বৌ, মেয়েরা বরন করছে তাদের ঘরের মেয়েকে। এতক্ষনে তার দেবীত্ব ঘুচেছে। ঘরের মেয়ে হয়ে সে ঘরের মেয়েদের সাথে মিশতে পারছে। তার গোটা মুখ সিঁদুরে, মিষ্টিতে মাখামাখি, পা দুটি রক্ত লাল, এ মুহুর্তটি দেবীর বড় প্রিয় মূহুর্ত তবু আজ তার মন বড় বিষন্ন।


দেবী চলেছেন ফিরে, বাঁশের মাচানের দোলায় আন্দোলিত হচ্ছেন তিনি, বাড়ির সমস্ত মহিলারা সিঁদুরে, আলতায় রঞ্জিত হয়ে বিদায় মূহুর্তে দাঁড়িয়ে আছেন দরদালানে, চৌধুরী পুকুরের ঘাটে বিসর্জনের আগে চলছে প্রদক্ষিন, এক- দুই- তিন----- সাত বলার সঙ্গে সঙ্গে বড়কর্তা মাথায় হাত ঠেকিয়ে বলে উঠলেন - মা গো আবার তোর সাথে দেখা হবে তো মা ?


ঠিক সেই সময় জলের মধ্যে ঝপাস করে আওয়াজ হল বিসর্জনের , আর ঠিক আধডোবা মূর্তির মুখমন্ডলী থেকে  জলে ডোবা মানুষের মত ডুবডুব ডুবডুব করে বুদবুদ উঠতে আরম্ভ করলো, ঠিক তিনি যেন কিছু বলতে চান, অথচ কান্নায় তার গলা বুজে আসছে, অস্ফুটে দেবী যেন বলে উঠলেন, না বাবা ।


হঠাৎ কাদু চেঁচিয়ে উঠে বললো দেখ হরা ঠাকুরটা জ্যান্ত ছিল নাকি বল দিকিনি !



Tuesday, August 24, 2021

অবান্তর ৬৬

   নির্জনতা বড় প্রিয়



সহজ সত্য 

সহজ কথা সহজে যায় না বলা।

লোক, লৌকিতা, প্রেম, যৌনতা

সবই ছেড়ে ছেড়ে যায় ।

ঋজুতা সহজ সত্য, কঠিন বিষয়।



ভাদ্রের কুকুরীর মত প্রেম আসে,

তারপর -

ধীরে ধীরে বুড়ো হয়,

যৌনতা- 

ঝিমোয় উঠোনের পরে মাঝরাতে।



তাই

দেখা না হওয়ায় ভালো,

দেখা হলে ব্যথা বাড়ে।

ব্যাথা থাক

তবু জানি এককোনে পড়ে আছে কিছু ভালোবাসা ।

দেখা হলে

সেটুকু মলিন হবে।



তার চেয়ে এসো

নিজেকে নিজেতে বাঁচি, ভালোবাসি ।

নির্জনতা বড় প্রিয় যে যার মতন।

দেখা হলে এর থেকে ভালো হোত বুঝি ?



এ জীবন অনন্ত সংগ্ৰাম,

নিজের সঙ্গে পরের সাথে।

ভালো আছির  পৃথিবী বিশ্বময় ,

তবু জল কেটে তীর জেগে রয়।



প্রলোভন - ভালো,

লোভ তো সবারই হয় ।

শুধু

হাত - পা ঠেকে যায় দেয়ালে দেয়ালে।


Sunday, August 22, 2021

অবান্তর ৬৫

          পাহাড়ি বাতাস হব   



পাহাড় বাঁকে একটা নিশ্চিন্ত ঋজু  পাইন, দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে,

আকাশের সাথে তার কি যেন সখ্যতা।

সমতলের মানুষ আমি,

অথচ ঋজুতা দেখলেই জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে,

ইচ্ছে করে ,

ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ফিসফিসিয়ে কথা বলতে

পাহাড়ি বাতাসের মত।

Sunday, August 15, 2021

অবান্তর - ৬৪

                     বিস্বাদ



মাঝবয়সী পথ জটিল ভীষন

সামনে  দায়িত্ব আর একাকিত্বের শাসন

রাস্তা কখনো নিয়ন আলো ,কখনো লোডশেডিং ;


ভাল্লাগেনা, মন খারাপের নেইকো সময় নেই,

পালিয়ে যাবে ভাববে ভীষণ ,চার দেয়ালেতেই  ।

ঘুমের মধ্যে একলাটে ভয়, জড়িয়ে কেউ নেই,

জড়াতে গেলে ছড়িয়ে পড়ে ,এক ফালি এক দেশ।


স্বাধীন মোরা ভীষণ এখন,স্বদেশ কি বিদেশ,

মধ্যপথ  বন্ধু খোঁজে একলা নিরুদ্দেশ।

কাল গিয়েছে আজ পাইনি ভেবে ভেবেই পার,

কেউ যদি হয় বন্ধু হঠাৎ গল্প পারাপার।

তারপরেতে ফুসমন্তর , ভ্যানিশ হল খেল,

বন্ধু সুজন ,বন্ধু কজন ?  

আজও উদ্বেল!


পিঠ পেতেছি চিৎ হয়েছি হাত পা করতাল

বুকের মধ্যে ঝঞ্ঝা বাজে মুখে বোলচাল,

নিরুদ্দেশের মতই এখন একার সাথে ঘর

মনের মধ্যে মনের বাসা নিত্য  চরাচর ।


উপেক্ষাকে সত্য ভাবি,

বাঁচার ওজর চাই ,

ছোটবেলায় মতন এখন  কোনো বায়না নাই।

মন খারাপের খরা এখন, ভাবার সময় নাই,

বুকের মধ্যে হু হু দুপুর ঘুমিয়ে হয় পার।

বিকেল বেলা ,তিতকুটে ভাব চিনিও তিতো লাগে

কষটে মন হিসেব কষে কে কত কার আগে ।


মধ্যরাতে চোখ বুজে যায় , মন রয়ে যায় ফাঁকা

স্বপ্ন মাঝে ফিরে আসে ছোটবেলার চাকা,

ভাগাভাগি, মারামারি , কে কার পানে ছোটে,

ডিমের কুসুম অতিমারী কে কার  ভাগে জোটে ।

এখন যখন পিজায় কামড় কাটি আনমনে

ভাগাভাগির সঙ্গী যে নেই বিস্বাদ সবখানে।


Friday, July 23, 2021

অবান্তর ৬৩

                      গজল



হঠাৎ করে উবে গেলে কেমন লাগে জানো?

যেখান থেকে শুরু করেছিলে, সেখানেই শেষ করা যায়!

ভালোবাসতে বাসতে ভালোবাসাটাই ক্ষয়ে যায়,

বাদবাকি সব থাকে ঠিকঠাক, বরং বেশী।



হাত ধরার পরের আর আগের পার্থক্যটা জানো বুঝি?

হাত রয়ে যায় অথচ অন্য হাত নেই।

অন্ধকারটা জমাট বাঁধতে বাঁধতে ধূসর হয়,

রাত বাড়তে বাড়তে ফিকে,

উঠোনের সন্ধ্যামনিরা বীজ ছড়িয়ে চলেছে,

ওদের ভালো বাসাবাসির যেন শেষ নেই।


আ্যয়সী তিরছি নজর সে না দেখো তুম


গজল শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ি,

মির্জা গালিব আজ ক্লান্ত।

অথচ এমন কথা ছিল না,

মদির পেয়ালা বাসি হয়ে যায়,

ভৈরবী আহীর হয়ে যায়,

তখনও ঘুমন্ত স্বপ্নেরা টাটকা লালার মত ঠোঁটের কোনে গড়িয়ে পড়ছে  -


আজ জানেকো জিদ না করো


উবে যাওয়া পৃথিবীতে রঙ লাগছে,

আবার নতুন দিন, নতুন সকাল

স্বপ্নেরা স্বপ্ন দেখছে।


Thursday, June 3, 2021

অবান্তর ৬২

       স্থির তবু ভেসে আছি




একই নক্ষত্রতলে  আছি 

তবু পৃথিবীর প্রেম ধীরে ধীরে নত হয়,

ধুলিধূসরিত,

সংসারের কার্যালয় সফল হলে ধীরে ধীরে পাট গোটানোর পালা,

হয়তো বা ঝড়ের দাপটে ঠেসমুল ছিন্নমুল হয়ে, জলে ভাসে পরিপাটি বাসন কোসন।


আবার জীবন তরে ডিঙ্গি  ভেসে রয়,

পৃথিবীর আনাগোনা সমস্ত তখন ঐ জলের উপরে,

মা দেয় কোল, একহাতে বাতাস দেয় উনুনের ভাঁজে,


তখনও নক্ষত্রেরা মিটমিট জ্বলে 

শুধু আমাদের কোলগুলো বুড়ো হতে হতে

আমরাও বড় হই।

তারপর ,

আবার ডিঙ্গি ভাসে ঘোলাজলে,

অথচ তুমি আর আমি আজও এক নক্ষত্র তলে ।


Wednesday, May 5, 2021

অবান্তর ৬১

 একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে




একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে

সত্যিই একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।

বাতাসে থাকবে পর্যাপ্ত অক্সিজেন

শিশুরা খেলবে মাঠে,

অবোধ আঙ্গুল গুলো অসীম ভরসায় আঁকড়ে থাকবে তার রক্ষাকবচ পিতাকে,

গাছ ভর্তি পাখিরা অমলতাসে ঠোঁট ভেজাবে।


তখনও প্রেমিক ধরে থাকবে প্রেমিকার হাত ময়দানের মাঠে,

ভেলপুরীর ঠোঙারা উড়ে উড়ে এক্কাদোক্কা খেলবে,

জ্যোৎস্নার সাথে নতুন করে প্রেমে পড়বে ভিক্টোরিয়ার পরী,

পাহাড়ী বাঁকের ফার্ণ গুলো নতুন পথিকের অপেক্ষা করবে,


সব ঠিক হয়ে যাবে জানো?

বাগান চত্বরে লাগানো গাছগুলো বেড়ে ওঠা বেয়াড়া নখের মত আঁচড় বসাবে,

যেতে আসতে তোমার লাগানো অমলতাসেরা বাঁদরলাঠি হবে,

একদিন সব একটু একটু করে ঠিক হয়ে যাবে,

এমনকি স্থির থেকে যাবে পাহাড়িয়া গাঁয়ের অচেনা মুহুর্ত গুলো।


শুধু 

একে অপরকে ঠিক করতে করতে আমরাই কখন  বেঠিক হয়ে পড়বো,

দুই বিন্দু সরতে সরতে যেমন বিলীন হয়ে যায়,


তবু একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।


Monday, May 3, 2021

কোভিড ডাইরি

             কোভিড ডাইরি



আজ দিন ছয়েক পরে হঠাৎ গোধূলি বেলায় ঝোড়ো পথিকের মত হঠাৎ করেই ঝড় উঠলো,সব জানালাগুলো একে একে ভেজিয়ে দিলাম আমার বন্দী জীবনের। শুধু, উত্তর- পশ্চিম কোনের জানালাটা ভেজাতে গিয়ে ঝাঁকড়া চুলের ফলন্ত আমগাছটার মাথা দোলানো দেখে কি জানি কেন মাতন ধরানো কালবৈশাখী কে জানলায় নাক ঠেকিয়ে দেখতে থাকলাম। যেন ওর সঙ্গে আমার বহুদিন পর দেখা, আমি আমার সমস্ত আকর্ষন দিয়ে ওর মনোযোগ ফেরাতে চেষ্টা করছি । অপার ঔৎসুক্য নিয়ে দেখছি সদ্য রাঙা আমগুলো কটা খসে পড়ে ও বাড়ির ছাদে, নাকে মুখে ঝিরঝিরে জল আর ঠান্ডা বাতাস ঝাপটা মারছে, আমার এই গন্ধহীন পৃথিবীতে জানি কোনো সোঁদা গন্ধ এসে ঝাপট দেবে না নাকে তবু অবিচল নাক ঠেকিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বিদ্যুতের কড়কানিও আজ বেশ ভালো লাগছে ; কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা, মনে মনে।


আজ বহু বহুদিন পর মোমবাতির স্নিগ্ধ আলো আমার ঘরের একান্ত কোনটা কে আরো একান্ত করে তুলেছে। নিরবিচ্ছিন্ন একার জগত, একার পৃথিবী যেখানে চাইলেও কেও আমাকে ছুঁতে পারবে না, জানালায় নাক ঘষলেও সব ঘ্রান শুন্য। এ এক সব আছে অথচ নেই শুন্যর দেশ। এই দেখো সবাই আছে, তাদের গলা পাচ্ছো, অস্তিত্ব পাচ্ছো অথচ একটা অভেদ্য  মসলিনের পর্দা ভেদ করে কেউ আসতে পারবে না, বেশ একটা অদৃশ্য অদৃশ্য মজার খেলা। হয় তুমি একটা সংখ্যা হয়ে যেতে পারো অথবা ঐ যে উঠোনে তোমারই রঙচটা জামা গায়ে তোমার অপত্য খেলে বেড়াচ্ছে তাকে জড়িয়ে ধরতে পারো । শুধু,  এগারো জন খেলোয়াড়ের মত ১১ দিনের অপেক্ষা।


এমন দিন তো তোমার জীবনে বহুদিন আসেনি, ইচ্ছেমত, খুশিমতো, দেদার যাপন। কথা বলতে ইচ্ছে হলে বল নাহলে পড়ে থাকো। মনে পড়ে , হোষ্টেল জীবনে কতদিন শুধু কথা বলতে ইচ্ছে করতো না বলে কথা বলতে না, অথবা ঘুম থেকে উঠে চুপ করে বসে থাকতে, অনেকেই ভুল বুঝতো, আর এখন, যাক সে কথা। পুরনো দিন তো পুরনো ট্রাঙ্কের মত তাকে যতই ঝাড়ো সে তো দেরাজ হবে না, তাই ধুলো না ওড়ানোই ভালো।


যাক এতক্ষনে গোটা দশেক আম ওদের বাড়ির টিনের চালের মাথায় পড়ে রাস্তায় গড়িয়েছে। যেন এই গুনতি করার  কাজটাই আমার বাকি ছিল, এদিকে প্রানায়ামের তাড়া, গার্গলের তাড়া, ভাপ নেওয়ার তাড়া। আবার সেই চুপ করে পড়ে থাকার ইচ্ছেটা মাথা চাড়া দিচ্ছে, ওসব অবান্তর জিনিসগুলো কে আপাতত ধামার ভিতর চাপা দিতে পারলেই বাঁচি, মোমবাতিটা চোখ টিপে ইশারা করছে, গন্ধহীন পৃথিবীর হাফ সন্ন্যেস  ঈশ্বর, যে নিজের সাথে নিজেই কথা বলে , নিজের অস্তিত্বের শিকড় খোঁজে, হতে পারে কাল সংখ্যা গনন ঘটবে, কিংবা ঘটতে পারে তবু হে ঈশ্বর নিরিশ্বর বাদী হও। 


Wednesday, April 28, 2021

অবান্তর ৬০

 আজ অনেক দিন পর ইচ্ছে করছে বলি

চলো পালিয়ে যায়,


ঐ যে দুরে পূর্ণিমা চাঁদ হাসছে

তার পিছনের পাহাড়টাতে চলো পালিয়ে যাই


অনেক অনেক দিন পর যদি আর দেখা না হয়,

তার থেকে চলো আজ পালিয়ে যায়।


সমস্ত বন্দী জীবন ছাড়িয়ে 

একছুটে ঐ যে চাঁদ মাখা মোলায়েম রাত

চলো না আজ পালিয়ে যায়।


তারপর

তারপর যদি দেখা নাও হয়

চলো - - - -

Wednesday, April 14, 2021

অবান্তর ৫৯

    সহজ কথা




বহুদিন দেখিনি,

বহুদিন কথা নেই,

ঐ যে ফাঁকা বেঞ্চটা ,

আজ ফাঁকা দেখে খুব বলতে ইচ্ছে করলো -

তোমাকে ভালোবাসি, আজ বলছি , সত্যিই খুব ভালোবাসি।

যতটা ভালোবাসলে গাছের পাতা থেকে শিশির ঝরার শব্দ শুনতে পাই, ঠিক - - -



অনেক দিন পর সমস্ত দ্বিধা কাটিয়ে ফোন করলাম তোমাকে,

আসলে বহুদিন দেখা না হলে আস্তরনে কেমন একটা সর পড়ে,

খুব ছোট্ট কথা, সহজে বলবো বলেই ফোন করলাম,

অথচ প্রশ্নের পর প্রশ্ন, কুশলচারিতা, ঘরসংসারের আবোলতাবোল গল্প সমস্ত বলে চললাম,

যেন ওটাই ভীষণ দরকারি কথা আমাদের, 

এমনকি আমার মত মূর্খ ও দেশের কথা বলে চললো,

এত এত জটিল কথা কত সহজে সহজ করে ফেললাম,

শুধু ,

 খুব সহজ কথাটাই বাকি রয়ে গেল -



 'ভালোবাসি' ,

 ইচ্ছে করছে খুব শান্তিতে তোমাকে জড়িয়ে থাকি আজ, হাতের উপর হাতটা রাখা থাক,

খুব ইচ্ছে করছে আজ - - -

থাক,

শুধু বললাম যত্ন নিও, ভালো থেকো। 

Monday, April 12, 2021

অবান্তর ৫৮

 ঐ যে পাহাড়ের বাঁক, তারপরেই একটা সুন্দর খাদ, 

তার কিনারে দাঁড়িয়ে ছিলাম অন্তিম গোধুলি উদযাপন করবো বলে,

ঝিঁঝিঁরা ছাড়া কোনো সহযাত্রী ছিল না সেখানে,

হঠাৎ উদয় হয়ে বললে,

আরেকটু কোনাকুনি তেরছা করে দাঁড়ান তো

গোধুলি আলোয় ভারী নমনীয় লাগছে আপনাকে,


দাঁড়ালাম ।

তেরছা হয়ে যেমনটা তোমার ছবি চাইছিল,

কোমল আলোর কমনীয় মুখ।

শুধু বুঝলাম , 

 মরনকেও কখনো কখনো লাইনে দাঁড়াতে হয়।


Wednesday, April 7, 2021

অবান্তর ৫৭

              অবসরের গান



আজ তোমার কাছে আমার কোনো আমন্ত্রন নেই, নিমন্ত্রনও নেই,

অথচ অপসর সময় বারে বারে এসে অবসর ভঙ্গ কর নির্লজ্জ প্রেমিকের মত।

বিশ্বাস কর

প্রচন্ড ব্যস্ততাতে  তোমায় কি সুন্দর করে ভুলে থাকতে পারি,

সাজিয়ে গুছিয়ে পরিপাটি করে কর্ম গুছোই,

ঠিক তখন, ঠিক তখনই

 কই , তোমার রোমশ বুক কিংবা আদুরে ঠোঁট আর জড়িয়ে রাখা কোন , মনে তো আসে না।

অথচ

 ক্লান্ত পায়ে যখন বিশ্রাম সাজাই,

ঠিক তখনই অভিমানেরা শিশুকালের মত হামাগুড়ি দেয়,

ছেলেমানুষি আদর কোল খোঁজে,

চোখের কোল শতদ্রু হয়,

আধঘুমে ঘুরতে থাকে একটাই শব্দ



হে জন্ম -

আজ কতদিন তোমাকে ছুঁতে পারিনি,

অকস্মাৎ আমাদের দেখা হয়নি বহুকাল

অথবা গত শতাব্দীর পর আমরা কেউ কারো চোখ পড়িনি।

আমাদের আয়ূধ অধরাই থেকে গেছে,

সারারাত সংকীর্তন শেষেও কোনো পদাবলীর জন্ম হয়নি।

আধোঘুমে স্বপ্নেরা ঘুরতে থাকে,

পুবালী বাতাস তখন চৈত্রী রীতিতে বইছে।


Wednesday, March 31, 2021

অবান্তর ৫৬

                  পর্ণমোচী




এসো না পর্ণমোচী  তোমাকে একটু একটু করে চিরহরিৎ  সাজাই,

একটা একটা করে পাপড়ি খুলে ফেলে ওষ্ঠকোরক রাঙিয়ে তুলি,

ঐ যে দুরে যেখানে শিশিরেরা বৃষ্টিফোঁটায় পড়ছে ঠিক অমনি করে ভিজিয়ে রাখি তোমায় শিশির সিক্ত গভীরতায়।

তোমার শিৎকার, লজ্জা, পর্ণমোচন সমস্ত, 

সমস্ত এমনকি তোমার থেকে ধোঁয়া ওঠা শিরিষ ফুলের বাস ,

সমস্ত কিছু কে চিরহরিতে সাজিয়ে দিই একটু একটু করে আমার তুলির আঁচড়ে, রঙে আর মনের ছটায়।



তারপর! 

দেখবো তুমি আর কতবার পর্ণমোচন করতে পারো, কতবার ঝরতে পারো ?

চিরহরিতের সবুজ দেখে কতবার তোমার অপ্রেম নিস্তব্ধ হতে পারে ,

আমি তো একা নই,

তোমার প্রেম, তোমার অপ্রেম, তোমার অবহেলা, তোমার বিসর্জন সব নিয়েই আমি পরিপূর্ণ চিরহরিৎ।

ঐ কাঁসায়ের তীরে হাত বাড়াও,

দেখো কুসুমের লাল পাতারা তোমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে, বিছানা করে থাকা শালফুল ,

অপ্রেম , চিরহরিৎ হও ---- 


Thursday, March 25, 2021

একা বাড়ি অনেক গলি

 এক আশ্চর্য ছাদের বামন হওয়ার গল্প




আমাদের ছোটো বেলায় গরমের ছুটি আর পুজোর ছুটিতে একটা গ্ৰামের বাড়ির গল্প ছিল, না, তখন ছুটি পড়লেই বাবা - মায়েরা অন্য কোথাও যাওয়ার প্ল্যান করতো না। ছুটি পড়লেই পরদিন ভোরে বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে ঘুম চোখে রওনা দিতাম এক মাসের জন্যগ্ৰামের বাড়ি অথবা খুব জোর তার মধ্যে তিন থেকে চার দিনের জন্য মামাবাড়ি। আমাদের ছিল  জমকালো ছবি বিশ্বাসের মত পেল্লায় মোটা মোটা বিশ পঁচিশ ইঞ্চি দেয়ালের  এক জাবদা চুন সুরকির খিলান দেওয়া গুরুগম্ভীর বাড়ি, গ্ৰামের শেষ প্রান্তে একটেরে‌ সাদা খিলান দেওয়া বাড়িটা ঘাড় উঁচু করে ছবি বিশ্বাসের মতই আভিজাত্য নিয়ে বেশ কিছু গিজগিজে লোক নিয়ে গমগম করে দাঁড়িয়ে থাকতো, লোকে বলতো ' বাবুর বাড়ী'।


এই বাড়ির অন্দরমহল কিসসা অন্যদিন শোনাবো, তবে এই পেল্লায় বাড়ির এক পেল্লায় ছাদ ছিল , আজ সেই ছাদেরই গল্প বলবো - 

ছাদটা প্রায় পনেরো ইঞ্চি মোটা দেওয়াল দিয়ে বেশ আঁটোসাঁটো করে প্রায় দেড় মানুষ উঁচু করে ঘেরা ছিল, আর এর গায়ে ছিল একটা করে ইটের মাপে কুলুঙ্গির মত ছোটো ছোটো খোপ। বেশ একটা পর্দানশিন ব্যাপার। মানে হল ঐ খোপ দিয়েই সামনের রাস্তাটা দেখা যেত অথচ ভালো করে খেয়াল না করলে বাইরের লোক দেখতে পেত না। বেশ একটা আদিকালের পূর্বরাগ পূর্বরাগ ব্যাপার।


তবে সবচেয়ে এর আকর্ষন ছিল, এর খোলামেলা বিস্তৃতি। যতটা না বড় তার থেকেও এর চারপাশ  শুধু না  বহু বহু দূর পর্যন্ত ধু ধু করে অনায়াসে দেখা যেত, যা নিমেষে ছোটো ছোটো মনগুলোকে অনায়াসে ভরিয়ে দিত। ছাদের দেড় মানুষ সমান উঁচু কার্ণিশ ধরে দাঁড়ালেই সামনের শান্ত শিলাবতী পার হয়ে কুমারীর সিঁথির মত আলপথ পার হয়ে ও পারের গ্ৰামগুলির বাড়ি, চাষাদের চাষ আর এ বাড়ির সেজ কর্তার গাঁয়ের পারের মাঠের মাঝের একলা সাদা স্কুলবাড়ীটি এক মনোহর চিত্রপটে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতো।পুবদিকে তাকালে নেড়া আমড়া গাছটার ডালে দুটো প্যাঁচা বসে বসে ঢুলতো,তাদের ছাড়িয়ে চন্দন গাছের মাথা ছুঁয়ে, আঁশ শ্যাওড়া আর নারকেল গাছের মাথা ছুঁয়ে খোপ কাটা এ বাড়ির সবজি বাগান আর ডোবা ছাড়িয়ে এ বাড়ির চাষের খেত অলস ভঙ্গিতে শুয়ে থাকতো। এ সব দেখতে দেখতে যদি দক্ষিনে যাও দেখতে পাবে বাজ পড়া তালগাছটার নীচে একটা মাছরাঙ্গা খিড়কি পুকুরের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বসে আছে, ও পাশের ছোটো পুকুর থেকে আজন্মকুমারী টুনি গা ধুয়ে আসছে এ বাড়ির বিষ্ণু মন্দিরে প্রদীপ সাঁজাবে বলে। একটু আগেই টুসির মা একরাশ শুকনো জামাকাপড় ঘাড়ে গর্দানে  করে  ছাদ শুন্য করে দিয়ে তুলে নিয়ে গেছে


এখন বড় শান্ত সময়, পৃথিবীতে গোধূলি নামছে, বিষ্ণু মন্দির থেকে ঝাঁঝ ঘন্টার আওয়াজ আসছে, শালগ্ৰাম শিলার শয়নের সময়  হল, একটা দুটো করে তারা ফুটছে আকাশে। বড় মন কেমনের সময়, হাতের চেটোয় ভর দিয়ে যদি চিৎ হয়ে শুয়ে থাকো ছাতের বুকে তাহলে আস্তে আস্তে সমস্ত আকাশ চুপ করে তোমার বুকের পরে নেমে আসবে, বয়ঃসন্ধির মন উদাসের কালে নিজের অজান্তেই দু ফোঁটা আবেগ জল বিনা কারনেই টুপটুপ করে ঝরে পড়বে কোন বেয়ে , আর ঠিক এই মনকেমনের উদাস কালেই  আসবে দূর্বাসার বানীর মত মাতৃদেবীদের সন্ধ্যাকালে পড়তে বসার আহ্বান। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অবজ্ঞা করার সাহস‌ নেই বলেই হয়তো ফিরতে হবে নিম্নপানে পরের দিনের আবেগ অবশিষ্ট রেখে।


আজ বাড়ির সেদিনের কচিকাঁচা গুলো বড় হয়ে গেছে, বাড়ির কর্তারা বৃদ্ধ হয়েছে, আর প্রায়  দেড়শত বছরের জীর্ণ বাড়িটার দেওয়ালে ছাদে  ঝিরঝিরে চিড় ধরেছে। মাঝেমাঝেই তার শুশ্রুষা চলছে তবে এখন ছাদ বাঁচানোর লড়াই। তাই হাল ফ্যাশনের জাবদা একটা ঢাকনা ওর মাথায় পরিয়ে দেওয়া হয়েছে, দেখতে হয়েছে ঠিক যেন প্যাগোডা বাড়ি কিংবা টোপর পরা বর এর মত।এর আগেও বাড়িটার গাত্রমর্জন হয়েছে,‌চুন সুরকির সাবেক কালের খিলান গিয়েছে খসে, বদলে এসেছে ছিমছাম আধুনিক পলেস্তারা। তবে এর আগে এমন লজ্জা আর দুঃখ কখনো পায়নি বাড়িটা। তার মাথা রক্ষা হয়েছে, তার আয়ু বৃদ্ধি হয়েছে ঠিকই কিন্তু ছবি বিশ্বাসের সেই গাম্ভীর্য, সেই একআকাশ বিস্তৃতি হঠাৎ করে যেন কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। এখন আর দুরের গ্ৰাম সামনে মনে হয় না, আকাশ টা ঢেকে গিয়ে ছাতটাকে যেন বড্ড ছোটো করে দিয়েছে একলহলায়। সব বড় আপন ছিল, এক লহমায় সব পর হয়ে গেছে। চোখের ছোঁয়ায় যে মন ছোঁয়াছুঁয়ির খেলা ছিল তা হারিয়ে গেছে টিনের চালের ফাঁকে। এখন আর চিৎ পাতলেই আকাশ দেখা যায় না, তারাদের ছোঁয়া যায় না, তারা এখন বড্ড অভিমানী , তাই সরে গিয়ে ভাব করেছে নদীর বালির সাথে। 


ও চাঁদ, ও নদী , ও প্রান্তর  সামলে রেখো জোছনাকে ।


Monday, March 22, 2021

অবান্তর ৫৫ বুঝতে চাইলে বুঝছে কে

 


   বুঝতে চাইলে বুঝছে কে



জানি 

ফিরতে হবে

সময় বয়ে যাচ্ছে

দীর্ঘ হচ্ছে ধূলিপথ

আস্তরন পড়ছে।



বুঝছি 

প্রস্তুত হও

ছায়ার সামনে দাঁড়াও

আয়না পেছনে রাখো

মুখের সামনে মুখ ধরো



শক্ত হও

বেলা বাড়ছে

কুয়াশারা কু- আশা ছেড়েছে আগেই

শুধু তুমি !



ছেড়ে

ফিরতে হবেই

কাঁকুরে বন্ধুর পথ

রক্তাক্ত হও অথবা হামাগুড়ি

ফেরার পথ খোঁজো ।




মনকে

বোঝাও, 

অবোধ , পোষ মানে না

বন্দী করে,

প্রয়োজনে, চাবুক

কেটে কেটে ঝরুক রক্তাক্ত হৃদয়।



যারা

বোঝে বেশি

তারাই বোকার দল

এবার মূর্খ হও

একটু বেশি।



দুঃখ 

হবে,  

বিদ্রোহের আর এক নাম 

দুঃখ 

পোষা বিড়ালের মত 

ওর পিঠে হাত বোলাও। 



এক হাত

শেষ হয়ে আসছে

তালি থামাও

ক্ষয় হাতে তালি 

হয় না

অজুহাত থামাও।



নিঃশ্বাস

নাও, শুধু জোরে

আরও জোরে

সব বায়ু

নিঃশ্বাসে ফুঁকে দাও।



শুধু

বোঝ, ফিরতে হবে

হবেই,

একেবারে নিঃস্ব হয়ে।








   বুঝতে চাইলে বুঝছে কে



জানি 

ফিরতে হবে

সময় বয়ে যাচ্ছে

দীর্ঘ হচ্ছে ধূলিপথ

আস্তরন পড়ছে।



বুঝছি 

প্রস্তুত হও

ছায়ার সামনে দাঁড়াও

আয়না পেছনে রাখো

মুখের সামনে মুখ ধরো



শক্ত হও

বেলা বাড়ছে

কুয়াশারা কু- আশা ছেড়েছে আগেই

শুধু তুমি !



ছেড়ে

ফিরতে হবেই

কাঁকুরে বন্ধুর পথ

রক্তাক্ত হও অথবা হামাগুড়ি

ফেরার পথ খোঁজো ।




মনকে

বোঝাও, 

অবোধ , পোষ মানে না

বন্দী করে,

প্রয়োজনে, চাবুক

কেটে কেটে ঝরুক রক্তাক্ত হৃদয়।



যারা

বোঝে বেশি

তারাই বোকার দল

এবার মূর্খ হও

একটু বেশি।



দুঃখ 

হবে, 

আন্দোলনের আর এক নাম 

দুঃখ 

পোষা বিড়ালের মত 

ওর পিঠে হাত বোলাও। 



এক হাত

শেষ হয়ে আসছে

তালি থামাও

ক্ষয় হাতে তালি 

হয় না

অজুহাত থামাও।



নিঃশ্বাস

নাও, শুধু জোরে

আরও জোরে

সব বায়ু

নিঃশ্বাসে ফুঁকে দাও।



শুধু

বোঝ, ফিরতে হবে

হবেই,

একেবারে নিঃস্ব হয়ে।
















Sunday, March 21, 2021

অবান্তর ৫৪

       বসন্ত গরল

 

তুমি কি দেখতে পাচ্ছো ?

আরও একবার পীতধড়া গলে তোমার শাল পলাশেরা মেতে উঠেছে,

বিছিয়ে দিয়েছে তাদের আঁচল ,

বুকের বসন খসিয়ে।



আবার ঘুম ভাঙ্গছে সেই নির্লজ্জ অজগরটার,

জানলা‌ পাশে এক পড়শী পলাশ রোজ ফুসমন্তর ডাকে,

বিছিয়ে দিয়েছে তার অনন্ত কামনা ঝরে পড়ার আগে।

অজগরটা আবার এগোচ্ছে--

তার অতীত ভুলে, তার গরল ভুলে,

এ যে নিশিডাক , কুহকিনী মায়া,

বন্ধ জানালার ফাঁকে কান ভরে যায় ,

ওরে আয়, ওরে আয় 

এ উচাটন, না বশীকরন?



জানে‌ সে বসন্তেই মরন,

প্রতি বসন্ত তাকে নতুন করে মারে ,

তারপর আবার একটু একটু করে সঞ্চিত করে জীবনের সঞ্চয়,

আগামী বসন্তে নিঃস্ব হওয়ার জন্য।


Wednesday, March 17, 2021

অবান্তর ৫৩

 

            সর্বদা প্রস্তুত থেকো

আমাদের কখনো অপ্রস্তুতে দেখা হয়নি।
যেমন, খুব শীতকালে লেপের তলায় কুকুর কুন্ডলী হয়ে,
অথবা গ্ৰীষ্মের দাবদাহে ঘামাচি ভর্তি গাল আর হলুদ ছোপা জ্যালজেলে শাড়িতে,
কিংবা ধর , আধখোলা গামছা জড়ানো গা আর হাতে মাজন।


আমাদের কখনো দেখা হয়নি হাঁড়ি কড়া সাজিয়ে পা ছড়িয়ে ক্লান্ত হাঁ খাওয়ার সময়।
সত্যিই কখনো দেখা হয়নি নাক ডাকার সময় অথবা নাক খোঁটার সময়।


তখন জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে গা,
আচ্ছন্ন লালারা নামছে কষ বেয়ে ,

তখনো তোমার পাশে থাকা হয়নি আমার।


এরকম বহু বহু প্রাগৈতিহাসিক সত্যের সঙ্গে ঘর করা হয়নি আমাদের।
গরমে ঘামাচিতে আঙ্গুল চালানো, কিংবা শীতে বিসদৃশ হাঁচি কোনোটাই পরিচয় করেনি আমাদের সাথে।


অথচ-
আমরা কেমন এক সুশীতল মনোহর শীতলপাটি বিছিয়ে চলেছি,
সুগন্ধে, পরিপাটিতে ,নির্দিষ্ট টেবিল চেয়ারে ,কাঁটা চামচের সজ্জায় ,দৈন্যতা গুলো একে একে  সাজিয়ে রেখেছি নিপুন হাতে।
আমরা আসলে কোনো আচম্বিতেই দেখা করিনি,
নির্দিষ্ট সময় ছাড়া কখনো দেখা হয়নি  আমাদের।
পরিপাটি সজ্জাতেই আমরা শোকের ঘরে শোক ভোলাতে গেছি।

অবান্তর ৫২

               প্রবঞ্চনা




চোখের কোনে  কালি সাজিয়ে কি যে সুখ পাও,

রাত কালি বলে যে অনেক কথা,

হৃদয়ে মরন নিয়ে ভালো থাকা যায় ?

জেগে থাকা? 

সেতো প্রবঞ্চনা।


স্বার্থপর,

 সুখ ভোলাতে, নিজেকে ভোলাও।

মুখে বল ভালো আছি,

সে তো বেঁচে থাকা,

কি যে সুখ পাও?

কেন দুঃখকে দুখীতে জড়াও,

কি যে সুখ পাও?


অবান্তর ৫১

           দর্শন ঊবাচ



আমি যখন তোমাকে ভাবি 

আসলে আমি তো নিজেকেই নিজে ভালোবাসি


আমি যখন তোমার বিরহে মরি

আসলে আমি তো নিজের সায়রে ডুবি।


আমি যখন মরি অভিমানে।

আমার আত্মা আমার জন্যই কাঁদে।


আমি যখন শোক উগরে দিই

আসলে তো নিজেকে নিজেই প্রলেপ লাগাই।


আমি যখন ঝগড়ুটে হই,

সে তো তোমার সঙ্গে ঝগড়া নয়,

নিজের সাথেই নিজের বাঁধন কাটি।


রাধা ভাব দ্যুতি সুবলিতম নৌমি কৃষ্ণ স্বরূপম।


Tuesday, March 16, 2021

অবান্তর ৫০

                   ইচ্ছে বাঁচা



কত যে কাজ বাকি অথচ দিন চলে যায়,

তোমাকে বাসবো ভালো  সময় কোথায় ?

ভাত চড়াতে ডাল ভুলে যায়, ডাল ভুলতে পড়া,

পড়া পড়ার খেলনাবাটি কেবল শিলনোড়া।

আজ পেয়েছি কাল পাইনি কালের ঘরে চাঁটি, 

চাঁটির ঘায়ে টলতে টলতে দিন হয়েছে মাটি।


আজ পেয়েছি কাল পাইনি জীবন হল ভোর,

হিসাবনিকাশ জলাঞ্জলী ,

 মাচায় সব  তোল।

জীবন ভোর হিসাব নিকাশ কালের ঘরে মাটি

চলো এবার নিজের মত ইচ্ছেতেই বাঁচি। 


Monday, March 15, 2021

অবান্তর ৪৯

       কি কথা যে বলি?



প্রতি রাতে এক একটা চাঁদ ক্ষয়ে যায় ,

প্রতিটা বসন্ত বলে সময় বড় কম,

তবু নিজের সাথে নিজের কথা ,

বলে চলি, বলেই চলি,

এ চলার  শেষ নেই

অজর, অমর, অক্ষয়, অন্তহীন।


সমস্ত কোলাহলে নির্বিবাক চেয়ে থাকি,

মুখে মিচকে হাসি

মনে মনে কথা বলতেই থাকি,

চলতেই থাকি দৈরথ সত্বায়।

কি জানি কখন ,মনে মনে কি ভাষা খুঁজি নিরলম্বতায়,

নিজের সাথে নিজে চলতে থাকি, চলতেই থাকি।


গল্পঅল্প ৩

 

       পরকীয়া ২


সকাল ১০টা,
স্থান - মানসিক বিভাগ, আর জি কর হাসপাতাল
ইতিমধ্যে উপচে পড়ছে ভিড়, বারে বারে তাদের ফাঁকা করা হচ্ছে কিন্তু রোগীর থেকে রোগীর বাড়ির লোকের উৎপাত বেশী। আমি সাইক্রিয়াটিক বিভাগের নুতন ট্রেনী, আমার কাজ ডাক্তারবাবু আসার আগে সমস্ত রোগীর বিস্তারিত বিবরন অর্থাৎ বায়োডাটা কালেক্ট করে রাখা।
একে একে কাজ সারছি, এমন সময় এক মাঝবয়সী মহিলা কে প্রায় জড়িয়ে নিয়ে এলেন আরেক মধ্যবয়সী উত্তীর্ন মহিলা,পিছনে  ৫৫ -৫৬র একটি লোক। মহিলাটিকে বসতে বলতেই সে নিমরাজি হল,এবং সন্ধিগ্ধ চিত্তে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল, তখন সঙ্গী লোকটি সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখি তার হাত ধরে শান্তশিষ্ট হয়ে বসে পড়ল। আমিও রুটিন মাফিক জিজ্ঞাসা করলাম,
নাম - অন্য মহিলাটি উত্তর দিল, প্রতিমা রূইদাস।
এবং একে একে রোগীর বিবরন নেওয়ার পর রোগীর সাথে আগত মহিলার রিলেশন জিজ্ঞাসা করলাম, মহিলাটি মাথা নামিয়ে বলল, তারা সম্পর্কে কেউ না।
একটু কেমন যেন কৌতুহল হল।ভদ্রলোকের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম তখনও প্রতিমা রুইদাস নিবিড় ভরসায় হাতটি জড়িয়ে রেখেছে আর লোকটি পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। লোকটিকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলাম , ওর স্বামী? উত্তর পেলাম - আমার স্বামী। ব্যাপারটা ঠিক মত না বুঝেই বলে ফেললাম, বুঝলাম না।
আগের মতই নিচু স্বরে মহিলাটি যা বললেন তার মর্মার্থ ‌করলে দাঁড়ায় -
শিবরাম বায়েন আর পুতুল বায়েনের দেওয়াল ঘেঁষা সোমথ্থ প্রতিমা রূইদাসের, একরাতের ঝড়ে দেওয়াল চাপা পড়ে যখন মা বাপ দুজনেই মারা গেল, বেঁচে যাওয়া নুড়ো খুঁটিটা ধরে দিন দুই প্রতিমা রুইদাস সেখানেই বসেছিল।তারপর কালের নিয়মে যদিবা সে উঠলো কিন্তু তার মাথা আর নির্দিষ্ট নিয়মে চললো না। যখন তখন উঠে এদিক ওদিক চলে যায়, একঘর নাতিনাতনি আর সারাদিনের পরিশ্রমের পর পুতুল বায়েনের আর এক কাজ বাড়ল , প্রতিমা কে  খুঁজে নিয়ে আসা।এদিক ওদিক তাবিজ, কবজ, তেলপড়ার পরও এক ঝোড়ো সন্ধ্যায় যখন সে নিখোঁজ হল তখন অগত্যা শিবরাম চললো প্রতিমাকে খুঁজে আনতে, আর যখন সে ফিরলো তখন একমাথা সিঁদুর সমেত ,গ্ৰামের শিবমন্দিরে ঐ অবস্থায় বসে ছিল সে। শিবরামকে পেয়ে পরম আনন্দে হাত ধরে আমার বর, আমার বর বলে হেলেদুলে বাড়ি ফিরেছিল।

সেইদিনই  সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর পুতুল বায়েন শিবরামকে এমন কিছু কথা বলেছিল যে শিবরাম , দুর হ হারামজাদী , বলে দুদিন ঘরে জলস্পর্শ করেনি। কিন্তু তারও নাম পুতুল বায়েন। ঠিক দিন গুনে গুনে ঠিক দিনে সন্ধেবেলা শিবরামকে প্রতিমার ঘরে ঢুকিয়ে শিকল তুলে দিয়ে এল। আর তারপরেই ঘটল ম্যাজিক, আস্তে আস্তে ওষুধ আর শিবরামের গুনে প্রতিমা সুস্থ হয়ে উঠতে লাগল। পুতুল বায়েন দেখে আর মিটিমিটি হাসে আর নাতিনাতনি দের গায়ে হাত বুলিয়ে ঘুমপাড়ানি গান গায়।

আমি অবাক হয়ে বললাম, তুমি নিজে হাতে এমন করতে পারলে! সে লাজুক হেসে উত্তর দিল মাসে তো চারটে দিন দিদিমনি, তাতে যদি কেউ প্রান পায় তাহলে আমি কে?
তখনও নির্বিকার প্রতিমা নিবিড় ভাবে শিবরামকে জড়িয়ে ধরে আছে , আর মিটিমিটি হাসছে।

Friday, March 12, 2021

অবান্তর ৪৮

        ভালোবেসে ফুরিয়ে যাও



অমন করে তাকিয়ো না চোখ নামাও,

ও চোখের দৃষ্টি আমার সহ্য হয় না,

আমি আবার ঝরে পড়তে পারি,

ও চোখে আগুন বয়।


দুটো ঝর্না না ঝরলে প্রপাত হয় না,

তাই বরফ হও,

বরফ শীতল।


দুটো বিন্দু না জুড়লে সেতু হয় না,

তাই ডাল জোড়ো পালা জোড়ো,

শাখাপ্রশাখার মত সেতুবন্ধনে এগিয়ে এসো,


অনেকদিন দেখা না হলে খুব ঝগড়া কোরো ,

জমে থাকা ভালোবাসারা ঝরে‌ পড়ুক, গলে পড়ুক পলাশতলির মত।


হাতের উপর হাত রাখা সহজ কথা নয়-


শুধু ,

যে স্বপ্ন নিয়ে ঘুম আসে,

সকালবেলা সেগুলোও তো সত্যি করতে পারো ?

অনেকদিন পর অনেকটা সময় তো দিতে পারো?



শুধু আমার জন্যই।






Saturday, March 6, 2021

অবান্তর ৪৭

 

অনেকদিন দেখা হয়নি আমাদের
ঠিক যদি নতুন করে আবার দেখা হত সমুদ্র নীড়ে,
অথবা আবার নতুন করে এক ঝরনা কান্নার ভিতরে।
সমর্পণের আশ্বাসে চোখ বন্ধ করে নিশ্চিন্তে দিতাম ডুব এক পাহাড় কোলে।
নচেৎ,
ধর  পাহাড় বাঁকে একপশলা মেঘের পরে আলো ফোটার মত এক পেয়ালায় বার্তা পেতাম।

এখন আলো যোজন তিনেক বাকি,
জঙ্গলেরাও উড়ছে মনের ডোরে
তাইতো এসো গাছ হয়েই থাকি
জানবো বুঝবো এক মাটিতে গেঁথে।

বসন্তেতে হলুদ পাতা হব,
শীতবিকেলে ঝরবো এ ওর গায়,
বর্ষাতে প্রেম বাঁধবো মনে মনে
জল ছিটোবো কর্দমাক্ত‌ পায়।

দেখবো তখন শিকড় কতদুর-
এ ওকে আঁকড়ে ধরতে চায়
মাটির নীচে বড্ড পরিপাটি
উপরতলায় মাথা টলে যায়।

যুগের পর যুগ পেরিয়ে যাবে,
পেরিয়ে যাবে বসত বসত ঘর
দাঁড়িয়ে থাকবো এক অপরে চেয়ে
মাটির উপর মেঠো যাযাবর ।


Friday, March 5, 2021

অবান্তর ৪৬

অ কবিতা


আমি তো নিজেকে কবি বলেই জানি,

তাই-
মাছ কাটি, ঝুল ঝাড়ি, আর খুন্তিতে তুলি কড়াইয়ের সুর,
বাসন মাজার ফাঁকে শুনি পাঁচফোড়নের বোল,
আর মনে মনে শব্দ নিয়ে শব্দ সাজাই এক্বা দোক্বা খেলার মত।
সময় খুঁজে শব্দ নিয়ে বাসর সাজাই,
ধাঁই ধপাধপ শব্দ গোছাই,
কারন-
তাদের তখন ভীষন তাড়া,
তবু ,তখন একটা সুস্বাদু কবিতা রান্না চায়,
মনে মনে তাই সদগুরু আওড়াই।
অথচ গৃহদেবতাও পিঁড়ি পেতে বসে আছেন উঠোনমুখো হয়ে বাইরের দাওয়ায়।

আসলে আমি তো নিজেকে কবি বলেই মানি,

তাই শব্দ সাজাই




Monday, March 1, 2021

অবান্তর ৪৫

 


            অন্য বসন্ত





যৌবনের জোয়ার লেগেছে সজনে আর আমমুকুলে,

আবার এক পলাশ ফাগুন আগুন লাগাতে আসছে,

মধু লোভী মৌটুসিরা নবীন ফুলের বুকে মধুতে ব্যস্ত।



আবার এক রঙমেলান্তি সময় এল,

জাপানী চেরী আর লাল মাটির পলাশ 

যৌবন সাজিয়েছে কিনারে কিনারে।



রঙ মাখতে আর চেয়ো না প্রিয়ে,

যতবারই ছুটে যাও ততবারই ফাগুনে আগুন পোড়ে,

রঙ মাখিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয় রাস্তার ধারে।

রঙ যে তোমায় জ্বালায়, পোড়ায়, সং সাজায়।



তাই,

পলাশে আগুন খোঁজো তুমি, ঝুমুরে বিষাদ বও,

প্রতীক্ষা কর আগত ফাগুনী অপমানের।



তারপর 

সমস্ত প্রগলভতাকে সুগন্ধি সাবানের মত জড়িয়ে ফেলো আষ্টেপৃষ্ঠে,

ঠিক যতক্ষন না রক্তক্ষরন বইতে থাকে, কইতেই থাকে।

এ তো রক্ত নয়, রক্তঝরা ফাগুন।


অবান্তর ৪৪

 

          ছাড় মোরী বৈয়া
         

অসংখ্য শিকড়ের মাঝে একলা শিকড়ের খোঁজ,
যেখানে রোমকূপেরা মাটি খোঁজে মাটি আগলাবার,
কেঁচোরা মাটি খুঁড়ে উর্বরা  জীবনজমিন ।
অথচ কীটদ্রষ্ট শিকড় হাতড়াতে থাকে হাতড়াতেই থাকে তার ঢালু জমি শিকড় চারাবার।

ফুল ফোটে, ফল হয়, গাছ পায় মাটি , জমিন ফসল পায় অতি পরিপাটি।
তারপর ?
শিকড় নরম পায় রোমকূপ পেলে,
মুলতানি রাগ ছেড়ে দরবারী ধরে ।

মুঝে যানে দো ছাড় মোরী বৈয়া ।
হা হা করত তোরী পইয়া পড়ত হুঁ

শিকড় আলগা হয়  শাখাপ্রশাখায়,
অনন্তের পথে তবু চক্ষু মেলে রয়।

দূরযানী সাবধানী আরোহে অবরোহে,
হাতে তার শ্বেতপত্র সন্ধি করবারে,
খোঁজা খোঁজ রোজরোজ দমবন্ধ হয়,
শিকড়ের পত্রপাখা মূলেতে শুকায়।

অবান্তর ৪৩

       নীরবতার প্রতিধ্বনি





চোখের উপর নীরব রেখে বহু মুহূর্ত এঁকে দিয়েছি।

চোখের থেকে চোখ নামিয়ে মুহুর্ত ধ্বনি শুনে নিয়েছি।


অনেক কথার শ্রুতির মাঝেও,

একটি কথাই শুনে ফেলেছি,


কোনো কথা হয়নি বলা,

অথচ,  কথা আর বাকি নেই।

হৃদয় থেকে মস্তিষ্ক দূরে নয়,

তবু কান টানলেই মাথা আসে না।


এত দু্রে যেও না প্রিয়, 

যেখানে শুধু ঝরন বাঁচে, মরন বাঁচে

শুধু হৃদয়ে বাঁচো, হৃদয়ে বাঁচো।


Tuesday, February 23, 2021

অবান্তর ৪২

         অস্থিরতায় স্থির আছি



যে ওষ্ঠে অধর মেলেছি

তা  অন্যে অদংশনীয়।


যে হস্তে অন্তিম ছুঁয়েছি,

তা অনতিক্রম্য কালপুরুষের কাছে।


যে কোমরে পাক দিয়েছিল কলমিলতা ,

তা এখন স্রোতস্রাবী নদী,


যে শরীর চাঁচর বেড়ার ডাল ছুঁয়েছে,

তার শতছিদ্র আলো আর টপকাতে না মরালশমরাল 


জলবিন্দু থেকে স্বেদ চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে,

গোপন তিল নিঃশ্বাস ফেলে আজও আদুরে প্রতীক্ষায়।


হৃদয় থেকে মস্তিষ্ক ,আযোজন পথ।

যে পথ নিস্তরঙ্গে রচিত হয়েছে,

ফেরার সময়  সমস্তই সে ভুলে ভুলে যায়।


রাত এখনও গভীর নয়, অথচ সান্ধ্য সঙ্গীত নীরব, নীরবতাই এখন গান।


ছোঁব বললেই ছোঁয়া যায় না কি?

যখন ছুঁয়েছে হাত অন্তিম হৃদয়।

ধরব বললেই ধরা যায় না কি?

যখন দিয়েছি কথা বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস।

আঙ্গুল ছোঁয়ানো ঠোঁটে কান্না বারোমাস।


ফাগুনে আগুন নয়, আগুনে ফাগুন।



Wednesday, February 17, 2021

অবান্তর ৪১

 

        কোলাজ

ভালোবাসি বলেই দূরত্ব মাপি,
যোজন যোজন জল তারপর দ্বীপ,
কি করে ভালোবাসি ?

বাইরে দাঁড়ানো পক্ষীরাজ,
পা ঠুকছে এক দশক ধরে,
অথচ আগের আগের দশকেও তুমি এত নীরব ছিলে না,
যেখানে তোমার হৃদয় পড়তে পারতাম না।

ভাবছো তুমি ভাবছি আমি,
হৃদয় খুঁড়তে খুঁড়তে চোরা হ্রদ,
চোরাশিকারীরা পিচ্ছিল করছে রক্তাক্ত পথ,
তবু বাইরে নির্বিকারের হাসি,
বোঝা যাচ্ছে না কিছুই।

এমনি ভাবেই আরো তিনদশক কেটে যাবে,
দেখা হলেই স্তিমিত রক্ত দ্রুতগামী ,অথচ মুখ স্থির,
যথারীতি গন্তব্যে এগিয়ে দিয়ে , তুমি কর্তব্যপথ ধরবে,
মাঝে পড়ে থাকবে দু ফোঁটা অশ্রু।

রক্তাক্ত জেনেও যে রাত্রিপথ খনন হয়েছে,
তাকে উদযাপনের জন্য আরো এক রাত্রি কান্না লম্বমান।
আকাশের তারারা শুধু হাসিমুখের দিকে চেয়ে আছে।
কখন বৃষ্টি নামবে ?

এক রাত্রি কান্নায় কোথাও প্রেম ছিল না।
কোথাও ভালোবাসা ছিল না।
কোথাও দূরত্ব ছিল না।
কোথাও লজ্জা ছিল না।
শুধু নিঃশর্ত সমর্পণের মুক্তি ছিল।

আয়না দেখলেই যদি কান্না পায়,
প্রতিবিম্বের মত শুধু হাসো, হাসো এবং হেসেই যাও।
দিনের শেষে জোকারেরাও হাততালি কুড়োয়।

বুকে তোলার আগে ধুলো ঝেড়ে নাও,
বসন্তের আগে তো শীতই আসে,
ঝরাপাতাদের গায়েও তো আগুন থাকে,
তাকে জড়িয়ে রাখো, ভরিয়ে রাখো।

যত ভালোবাসছো ততই নীরবতা বাড়ছে,
বিভ্রম ঐ চাউনিতে,
দূরত্ব এত বাড়িয়ো না,
যেথা স্বপ্নরা নাগাল পায় না,
মাঝে মাঝে প্রেমিক হতেও তো ইচ্ছে করে।



Saturday, February 13, 2021

অবান্তর -৪০

                   অকাল কামিনী



অকাল শীতে ঐ যে বস্তিপারের রোগা জিরজিরে কামিনী ছিল দাঁড়িয়ে ,

দেখো -

সেও আজ কাঞ্চনে সজ্জিত হয়ে কাঞ্চনা হয়েছে।

বসন্ত নামের যে অনাগত পুরুষটি জীবনে আসবো আসবো করছে ,

তার জন্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেক স্বপ্ন গাঁথছে আর এক স্বপ্ন থেকে পালিয়ে গিয়ে আরেক স্বপ্ন অক্লান্ত হয়ে সাজিয়ে তুলছে তার গালে, মাথায়, কপালে , আর রাঙ্গা অধরে।


একটু একটু করে সাজ সম্পূর্ণ করছে সে, একেবারে রমনী সাজ, চৌদ্দ কলায় পরিপূর্ণ।

পথের মানুষেরা তাকায় আর বলে - ঢ---ং ।

কাঞ্চনা আজ মুচকি হেসে মন ঠাওরায়, জলবিম্বে তাকিয়ে বলে - বয়েই গেছে।

তারপরই বেপাড়ার বেয়াড়া হাওয়ারা ঢলতে এলেই আঁচল সামলে নীরব কটাক্ষে বলে , রাস্তা দেখো।



ভয় সে ঝোড়ো হাওয়াকে করেনি কখনো গভীর রাতেও।

সর্বৈব ভয়, লজ্জা,  তুলে দিয়েছে সে মৃদুমন্দ বসন্তের হাতে ।


Tuesday, February 9, 2021

অবান্তর - ৩৯

 

     ভালোবাসার ২১ শে



হাত বাড়ালে যেই তোমাকে পাই,
ঘুম ভাঙলে খুব জড়িয়ে থাকি,
স্বপ্নে যদি ওকাকুরা হই,
জড়িয়ে থাকি বসন্ত উৎসবে।

হাত বাড়িয়ে হাতটা ছুঁতে চাই,
শার্টের বোতাম আলগা দলছুট
মুঠোয় ধরে সামনে নিয়ে মাথা
চুল করে দিই আলতো এলোমেলো

তখনো যদি মুখ গোমড়া কর
আলতো করে ঠোঁট বাড়াবো তবে,
ইষ্টিকুটুম দেখবে বসে বসে
কেমন তুমি রাগ করতে পারো।

ঠোঁট ফোলাবো জড়িয়ে ধরবো মাথা
বুকের মাঝে বড্ড আলুথালু,
হাতের উপর হাত রাখতে গিয়ে
কাঁধ দুখানি চিবুক ছুঁয়ে যেথা।

তখন আমি বড্ড প্রেমিক হব
প্রেম মাখবো যতন ক্রিমের মতো
নাক ভর্তি গন্ধ বুকে মেখে
ভালোবাসবো দূরের দূরত্বটাকেই।

Wednesday, February 3, 2021

অবান্তর ৩৮

        কি জানি কি লিখি




শরীর থেকে  হয়েছে বিচ্ছিন্ন  মন

এখন শুধুই ঘুরে বেড়ানো উমনো ঝুমনো,

ইরানী বেদের  যাযাবর বৃত্তি শরীরকানাচে

ভিক্ষার থালা নিয়ে দুয়ারে চিৎকার,

আমরা তিন লোক মা,

উত্তরে পেটের টাকে দেখিয়ে, বাড়িয়ে দিই থালা,

একমুঠো বেশীর আশে।


তারপর  সদগুরু নিদ্রাগত হলে

খুঁটে খাই ধান, জাবর কাটি, চর্বিত চর্বন।

ডিম পাড়ি ,তা দিই

আরো দু মুঠো অন্নের তরে,

ইটের বালিশ শয্যা, চোখে ঢুল স্বপ্ন,

ছেঁড়া পুটুলিতে আগলায় কোলের নেড়িকে,

তারপর আবার রো -মন্থনের স্বপ্ন দেখি, অথবা গো- মন্থনের।

পৃথিবী তখনো মন্থন করছে দুগ্ধভান্ড,

ঘোল মুয়াবার তরে।


Friday, January 29, 2021

অবান্তর ৩৭

   সব প্রশ্নের এক উত্তর




সব উত্তর জানার পরেও প্রশ্ন ?

সব 'না' হওয়ার পরেও উত্তর ?


এতদিন চাল ছোলা দিয়ে যে হৃদয় পুষেছি,

রক্তাক্ত মলিন করেছি তাকে।


পোষা পাখি পোষ মেনে ছিল নির্জীব,

এখন সবই 'না' শুনে হয়েছে সজীব।


হাত ঝেড়ে পা ঝেড়ে ডানা ঝাপটায়,

এখন দোর খোলার হয়েছে সময়।


চাল দাও ছোলা দাও হরি জপ তারে

আর সে থাকবে না শূন্য এ দ্বারে।


এতদিন ফাঁকা বুলি আউড়িয়ে যায়

এখন যাবার সময় ক্ষুদ খুঁটে খায়।


হৃদয়ে হৃদয় ছিল,

মনে ছিল মন,

এখন পগারপার হৃদয়রতন।


এতদিন পুষে তারে বড় ভালোবাসি,

সবই মায়া , মায়া বলে উড়ে গেল পাখি। 


Thursday, January 28, 2021

গল্পঅল্প ২

                   

                           স্বজন

শীতের কনকনে রাত, কুয়াশারা সাদা মার্কিনের ওয়াড় গায়ে ঘুমিয়ে পড়েছে সন্ধ্যাকালে, নদীর উপরের জোলো কুয়াশারা জমাট বেঁধে আছে কি এক অভিমানে। বিষন্ন ক্ষয়াটে চাঁদ কুয়াশা মাখা গায় আচ্ছন্ন। পাড়ের কাছের শ্যাওড়া গাছটায় একটা পেঁচা সবে সান্ধ্যগীত শুরু করেছে। ইতিমধ্যে দুয়েকটা শেয়ালের ছোঁকছোকানি শুরু হয়েছে এধারে ওধারে। দারকেশ্বরের কনকনে বাতাস চামড়া ভেদ করে হাড়ে সিঁধোচ্ছে। 


মড়ির চারপেয়ের উপর আয়েশ করে বসে আছে মধু ডোম, চোখ তার গেঁজে  উঠেছে ,গাঁজায়  রক্তলাল।   ঠান্ডা লাগছে কিনা তার পাথর কঠিন মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই। ফি মাসে একবার বেওয়ারিস লাশ পোড়াবার ডিউটি তার, তাই মড়া একাই এসেছে তার সাথে। সবে আগুন ছুঁয়েছে যুবতী শরীর, গনগনে আঁচ মধুর মুখে জলন্ত অঙ্গারের মত খেলা করছে, গা সেঁকছে সে এই তাপে।


এক যুবতী ডেডবডি, বয়স ২৬, চিতায় ওঠাবার সময় লক্ষ্য করেছে মধু তার একঢাল চুল আর  সর্পিল গড়ন। অজান্তেই অভিজ্ঞ মধু কোমর আর বুকের মাপ মেপে নেয়। ঠোঁটের কোনে ফুটে ওঠে চোরা হাসি। 


একে একে স্পর্শ করছে আগুন , প্রথমেই চুল আর বস্ত্র শেষ, মধু ডোম চেয়ে আছে নিস্পলক, মনে পড়ে যাচ্ছে সোমরার বউয়ের সোমথ্থ শরীর টার কথা। তার আদরে  গলে যাওয়া বিবস্ত্র শরীর টার কথা। গেঁজেল দৃষ্টিতে দেখে সে আগুন স্পর্শ করছে যুবতী  শরীরের এক একটি আহ্লাদী অঙ্গ। স্তন, নাভীমূল, গ্ৰীবা, যোনী এমনকী বিভঙ্গ ভাঁজেদের একে একে স্পর্শ করছে আগুন ঠিক যেন মধু ডোমের ডোমনীকে আদরের চূড়ান্ত ক্ষন উপস্থিত। আগুন উস্কে দিতে দিতে নেশাতুর চোখে মন্থন করে সে।


ঠান্ডা বাতাসে ঢুল ধরে, জানে সে এখনো অনেক সময় বাকি। আগুনের তাপে, নির্জনপ্রান্তে বসে ঢুলতে থাকে সে, মাঝে মাঝে স্বপ্নও দেখে কি? কে জানে।


হঠাৎ ফটাস করে ফাটার আওয়াজে মধু ডোম সচকিত হয়, গেঁজেল চোখে তাকিয়ে দেখে আগুন তাপে বিস্ফারিত হয়েছে স্তনবৃন্ত,সমস্ত হিমেল ধারা যেন স্রোতের মত গড়িয়ে আহুতি দিচ্ছে অগ্নিকে, যেন এক পবিত্র যজ্ঞে আহুত হচ্ছে মাতৃস্তন্য। অস্থি, মজ্জা, দুগ্ধধারা একত্রিত হয়ে আগুনে ঘৃতাহুতি দিচ্ছে, ওঁ নমঃ স্বাহা।

অস্পষ্ট আলোকে এই প্রথম অভিজ্ঞ মধু ডোম অজ্ঞাতে করজোড়ে  দাঁড়িয়ে আছে, চোখ দিয়ে দরদরিয়ে বইছে অশ্রুধারা।


বেওয়ারিশের পাশে আজ একমাত্র স্বজন, মাতৃগর্ভ থেকে উঠে আসা এক আদিম পুরুষ ।


Wednesday, January 27, 2021

অবান্তর ৩৬

 

অসংখ্য শিকড়ের মাঝে একলা শিকড়ের খোঁজ,
যেখানে রোমকূপেরা মাটি খোঁজে মাটি আগলাবার,
কেঁচোরা মাটি খুঁড়ে উর্বরা  জীবনজমিন ।
অথচ কীটদ্রষ্ট শিকড় হাতড়াতে থাকে হাতড়াতেই থাকে তার ঢালু জমি শিকড় চারাবার।


ফুল ফোটে, ফল হয়, গাছ পায় মাটি , জমিন ফসল পায় অতি পরিপাটি।
তারপর ?
শিকড় নরম পায় রোমকূপ পেলে,
মুলতানি রাগ ছেড়ে দরবারী ধরে ।


মুঝে যানে দে ছাড় মোরী বৈয়া ।


শিকড় আলগা হয়  শাখাপ্রশাখায়,
অনন্তের পথে তবু চক্ষু মেলে রয়।


দূরযানী সাবধানী আরোহে অবরোহে,
হাতে তার শ্বেতপত্র সন্ধি করবারে,
খোঁজা খোঁজ রোজরোজ দমবন্ধ হয়,
শিকড়ের পত্রপাখা মূলেতে শুকায়।

Monday, January 25, 2021

অবান্তর ৩৫

 

        যৌনতা যেখানে ঘুমিয়ে থাকে



যুবতী ধানের বুকে শিরশিরে কিশোর বাতাসের আদুরে কাঁপন জাগছে নিভৃতে।
ঠিক তেমনই যুগলাষ্ঠ যখন চরম রমনীকোন ছুঁয়ে যায় পরম আদরে,
না , তখনও -
তখনও কোথাও যৌনতারা  পরম আদরে আঁচল  পাতেনি আমার  সর্বাঙ্গ শরীরে ,
শুধু মুক্তিরা এসে একে একে ছুঁইয়ে দিচ্ছিল তাদের রোমশ সিঁধকাঠি সঞ্জীবনী মত,
বরফ বাতাস ধুইয়ে দিচ্ছিল গা ।


ধীরে ধীরে বওনা সময় আরো ধীর পথ ।

Friday, January 22, 2021

অবান্তর ৩৪

     খেলনা ভেঙ্গে যায়




জুড়তে জুড়তে জুড়নখেলা, 

তবু খেলনা ভেঙ্গে যায়,



মেয়েবেলার  রাজপুত্র আনাচ কানাচ সংসার সাজায় ,

অথচ খেলনা ভেঙ্গে যায়।



নতুন নতুন খেলনা  চালচিত্র সাজায়,

মাটির পুতুল, শাঁখের নুড়ি , চু কিতকিত, ভাঙ্গা নুড়ি বাসর সাজায়,

তবু খেলনা ভেঙ্গে যায়।



এক দু আনি ভাঙ্গা খানি মূল্য অতি সাধারনী

কাঠের পুতুল, কাঁচের চুড়ি, রঙ্গিন রঙ্গিন বেলোয়ারী, 

রুপকথার ঐ ভূতপতরী স্বপ্ন বুনে যায়,

তবু খেলনা ভেঙ্গে যায়।


ইচ্ছে যখন ষোলআনা,

খেলাচ্ছলে হিসেব জানা,

ঘুগনিবাটি, আলুর কাঠি, শনপাপড়ি, কুলচাপাটি,

ছুটির পরে ফুসমন্তর,

আলুকাবলি একটু পাঁপড়,

উড়ছে ধুলো সাইকেলের ঐ কাদা মাখা গায়,

দেখো খেলনা ভেঙ্গে যায়।



প্রথম চিঠি প্রেমপত্র,

দুরদুরে বুক একটু দুপুর,

নিয়মভাঙ্গা ঠোঁট দুখানি

কমলালেবূ রোদ বাখানি,

মুখ টেপা রাগ লাজুক লতা,

আঙ্গুলে আঙ্গুল জড়িয়ে লতা

মুচকি হাসি ফিচেল কোনে

আবার দেখায় মন যে টানে।

থাক সে কথা, এখন বলো

বাঁচো মর কেবল চল।



চলতো যখন, ভাবছো তখন,

ভাবছো যখন হাঁটছো তখন,

খাচ্ছো যখন দেদার খাবি,

সামলে চল, সামলে চল



মাঝদরিয়ায় উঠলে তুফান

খেলনা তখন ভেঙ্গে দুখান,

সামাল সামাল রব উঠেছে,

সামলাতে কেউ নাই রে,

খেলনা যখন নিদেন আছে,

ভুলিয়ে দেনা ভবিষ্যতে,

তারপরেতে ?

নাইরে।




শুধু খেলনা ভেঙ্গে যায়।



Saturday, January 16, 2021

অবান্তর ৩৩

      অনন্ত জীবনের প্রশ্ন খুঁড়ি





এখনও রাত সাঁঝালে অনন্ত অপেক্ষায় থাকি,

হে মহাজীবন, হে দুর্ণিবার 

তোমাকে প্রনাম,

এমন অমানিশা ঘনিয়ে তোলার জন্য ।



এখনো রাত্রি ঘোর মহাবৃক্ষের তরে ,

বোধি বুদ্ধ সমাহিত, একত্রিত আমার সম্মুখে

আমি, আমি মাত্র, জড়ভরত, সমাধিস্থ।



সেই ক্ষন থেকে কত আলেকজান্ডার পুরু,

রয়ে গেছে মানবী চরিত অরচিত।

আজ সমাধিস্থ তারা একে একে উঠে এসে ,

প্রশ্ন খোঁজে,

চিৎকারে কেঁপে ওঠে নিমিলিত প্রান,

জন্মজন্মান্তরের পূর্বাভাস আজ উপ্ত হয়েছে বপনের তরে,

কান্ডারী জাগো, নয় ভাগো।


অবান্তর ৩২

 

                        সংকলন
     

একটা রাত গভীর কান্না,  শুষে নেওয়া দুই অশ্রুবিন্দুর গভীর আশ্লেষ, চোখ বন্ধ করা ভরসা, একটা নিশ্চিন্ত কাঁধ, বৃষ্টিভেজা ফ্যাকাশে হাত, আর নির্ভার দুটো ঠোঁট সমগ্ৰ গল্পমালার গ্ৰন্থিত সূচিপত্র যেন

এলোমেলো অগ্ৰন্থনের পর সুসজ্জিত গল্পমালায় নীতিকথা রূপকথা হয়,

তখন দিন কি রাত, ঘটন অঘটনের দিনলিপিরা লিপিমালায় অযূতবন্দী।

তোমার সমস্ত চাওয়া তখন হঠাৎ পাওয়ার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে রাজবেশে ।

অথচ সুসজ্জনের তখনো তোমার ঢের বাকি।
আলুথালু বেশে গ্ৰন্থিত ছন্দের সামনে তুমি দর্শক কি কুশীলব , বোধশুন্য।

চোখ তখনো বন্ধ অথচ মন খোলা অনন্ত পারে।
অন্তিম প্রেম তখনো অনন্তে ভেসে যায় ঊর্মিমালার মত।

ডোম্বি শবর তোঁহারি লাগিয়া।

Friday, January 15, 2021

অবান্তর ৩১

                      শুশুকডুব



রাত গভীর হলে ভালোবাসার নক্ষত্রেরা ঝরে পড়ে টুপটাপ করে ঠোঁটে , গালে ,

জন্মনাভিতে।

সেখানে শুশুকডুব দিতে দিতে একটা একটা করে মুক্তোবিন্দু ছেনে আনো তুমি, 

জন্মরহস্যের মোড়ক খুলতে থাকো নির্মমভাবে।


প্রতিটা মোড়ক খোলার পরেও রহস্যসঞ্জাত স্থান আরো দুর্গম হয়, আরো গভীর অন্ধকার।

অন্ধকার ছেনে আনতে রহস্যে ফের ডুব দাও তুমি,

আবার রহস্য ছেনে ছেনে  মাটি খুঁজে ফের মানবী শরীরে,

ডুবুরির মত।


অবান্তর ৩০

 একটা কান্নার এখন বছর তিনেক বয়স ,

অথচ এখনো সে ঝরতে থাকে, ঝরতেই থাকে ,

প্রথম দিনের মত।

তাহলে একি কান্নাপাখি , রাতচরাদের মত কেঁদে কেঁদে বেড়ায় , তারপর ভোর হলে বিলীন হয় ।

নাকি সুখ অ -সুখের দ্বন্দ্বে এও এক অলীকপাখি ,

অন্তিম প্রেম অনন্তে মিশে যায় ।



তাই ,

আভোর  ফটিকজলেরা ঘুরে ঘুরে মরে অনন্ত পিপাসায় ।

ঝর্নার ঝরনগীতি,  নতুন ফল্গু ধারার জন্ম দেয় , 

সে শুধু উষ্ণ প্রস্রবন, শুষে নিতে হয় আলতো করে ,আদরে সঙ্গীতে।



তারপর মাঠে মাঠে যুবতী ধানেদের বুক ভরে এলে কপোত কপোতী মত খুঁটে খেতে হয় খুদ , বারেবারে সারাদিন,

সূর্যও ক্লান্ত তখন, মেলা হাটে বাটে , বাড়ি ফেরার দিন ।

অথচ ক্লান্ত ধূলিকারা পদচিহ্ন চায় কার ,

ধূলিসিক্ত পাঁপড়, পড়ে থাকা খেলনা , বেলুনেরা উড়ে উড়ে যায়।




ভাঙ্গছে মিলন মেলা,

পুরাতন প্রস্তরেরা  শূন্যগর্ভ নিয়ে আবার বচ্ছরকার প্রতীক্ষায় প্রস্তুত,

পিতৃস্কন্ধে চেপে আছে শিশু নিখাদ ভরসায়,

জানেনা সে এ ঋণ শুধবে কিসে।



শুন্যগর্ভ নদীতীরে সরষেরা আঁচল এলিয়েছে রূপবতী মত,

তারাও জানেনা কত কথা তোমার আমার মত ।

তাই মধ্যরাতে ঝরে পড়ে যায় পূর্ণতার তরে অনন্তের পথে।

আরো একটি বছর পার ক্রন্দন পূর্ণতার,

রাতচরা হেঁকে যায় ,

ঝর আরো ঝর, 

নচেৎ - - - - -


Friday, January 8, 2021

অবান্তর ২৯

 

     দেখা হওয়ার পরের গল্প

অনন্ত অপেক্ষার পর যখন সত্যিই আমাদের দেখা হবে,
তখনও ঠিক তখনও আমরা অনর্গল বকে যাবো, অশ্বডিম্ব প্রসব করে।
অথচ আমাদের মনের ভিতর তখন ধু ধু করা আগুন জ্বলছে, ছুঁয়ে থাকার , কাছে থাকার।
তারপর ,পরিপাটি গল্প ফেঁদে আবার আমরা নিরক্ষরেখায় পাড়ি দেবো।

Wednesday, January 6, 2021

অবান্তর -২৮

 

       অনন্ত অপেক্ষায় রাজি আছি

সোনালী মূহুর্তরা একবারই আসে পৃথিবীতে অশরীরী হয়ে,
আবার হাজার বছর অপেক্ষা করতে পারি সেই নিশ্ছিদ্র ক্ষনের জন্য,
মরে যেতে?
তাও পারি বুঝি এখন এক আলোমুখো দিন পেলে।
বুদ্ধ ফিরেছেন পাশ, যীশু হাসে ক্রুসেডের তরে, আর সব যার যা কফিনে বন্দী পরিপাটি ,
ধ্রুপদ জীবন ।

তারপর আর কিবা বাকি থাকে বল,
ঈশ্বর যখন ঈশ্বরী বেশ ধারন করে অঙ্গাঙ্গী হন,
তারপর শুধু পড়ে থাকে শুকরী জীবন, নামমাত্র ধারনের তরে।

তখনও নেমেছে রাত নীলগাত্রে,
রাতপরী শুরু করেছে তাদের চরকী পাক
ধীরে ধীরে চাঁদ হাত বাড়িয়ে চাঁদ ধরতে চায়,
চরকাবুড়ি অবিরাম পাক দেয় সুতায় ,
ঊর্ণনাভ জাল গুটাচ্ছে এখন,
গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন বিছানা স্বপ্ন দেখে ,
আবার নেমেছে রাত পাহাড়চূড়োয় মনের মতন।

Tuesday, January 5, 2021

অবান্তর ২৭

 বুনো তুলসীর বীজের মত ভালোবাসা ছড়িয়ে দেব সোঁতা মাটিতে।

নরম মাটির আদরে ভালোবাসারা  বেড়ে উঠবে ফনফনিয়ে,

বীজ ফেটে ছড়িয়ে পড়বে ভালোবাসা পেঁজা তুলোর মত,

বুনো ঝোপের ডালে, বেড়া কলমীর ডগায়।

জল পেয়ে , মাটি পেয়ে গাছ তার শিকড় ছড়াবে,

যেমন ছড়ায়  মর্ত্যের সোহাগ আদরে বেরাদরে ।


Sunday, January 3, 2021

অবান্তর ২৬

 




        

      প্রাসঙ্গিক


আমরা বড় প্রাসঙ্গিকে বাঁচি

দুহাত বাই তিনহাত বেড়ে খুশি,

জীবন এখন বড্ড পরিপাটি

ব্যালকনিতে মানিপ্ল্যান্ট পুষি।


দরজা বন্ধ জানলা এখন খোলা

বাইরে উদার মনে কড়াকড়ি ,

বন্ধ কপাট , সদর দরজায় লিখি,

অতিথি তুমি দেব ভবময়।


উঠোন এখন ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে

সাজায় গোজায় পরিপাটি ভাঁজে

আমরা এখন বড্ড এলোমেলো,

রাতদুপুরে হাতড়ে বেড়ায় মাটি।


প্রেমের মধ্যে ভীষন কোলাহল,

নিক্তি মেপে নিড়েন দেওয়ার চল,

পাশা খেলার মত গুটির চাল

তক্ষকেরা করছে বাজিমাত।


হাতের উপর হাত ছুঁয়েছে যেই,

শূণ্য বিকেল আর তো মনে নেই

কোথায় পাবো শ্যামলা নদীর ধার

পড়ে আছি শীতের বালিশেই।


গল্প বলো আবার কথা কব,

শূন্য হৃদয় আধেক হৃদয়পুর

একজীবনে শূন্য সবই হলে

ভালোবাসবো সপ্ত সমুদ্দুর।