Monday, March 15, 2021

গল্পঅল্প ৩

 

       পরকীয়া ২


সকাল ১০টা,
স্থান - মানসিক বিভাগ, আর জি কর হাসপাতাল
ইতিমধ্যে উপচে পড়ছে ভিড়, বারে বারে তাদের ফাঁকা করা হচ্ছে কিন্তু রোগীর থেকে রোগীর বাড়ির লোকের উৎপাত বেশী। আমি সাইক্রিয়াটিক বিভাগের নুতন ট্রেনী, আমার কাজ ডাক্তারবাবু আসার আগে সমস্ত রোগীর বিস্তারিত বিবরন অর্থাৎ বায়োডাটা কালেক্ট করে রাখা।
একে একে কাজ সারছি, এমন সময় এক মাঝবয়সী মহিলা কে প্রায় জড়িয়ে নিয়ে এলেন আরেক মধ্যবয়সী উত্তীর্ন মহিলা,পিছনে  ৫৫ -৫৬র একটি লোক। মহিলাটিকে বসতে বলতেই সে নিমরাজি হল,এবং সন্ধিগ্ধ চিত্তে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল, তখন সঙ্গী লোকটি সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখি তার হাত ধরে শান্তশিষ্ট হয়ে বসে পড়ল। আমিও রুটিন মাফিক জিজ্ঞাসা করলাম,
নাম - অন্য মহিলাটি উত্তর দিল, প্রতিমা রূইদাস।
এবং একে একে রোগীর বিবরন নেওয়ার পর রোগীর সাথে আগত মহিলার রিলেশন জিজ্ঞাসা করলাম, মহিলাটি মাথা নামিয়ে বলল, তারা সম্পর্কে কেউ না।
একটু কেমন যেন কৌতুহল হল।ভদ্রলোকের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম তখনও প্রতিমা রুইদাস নিবিড় ভরসায় হাতটি জড়িয়ে রেখেছে আর লোকটি পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। লোকটিকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলাম , ওর স্বামী? উত্তর পেলাম - আমার স্বামী। ব্যাপারটা ঠিক মত না বুঝেই বলে ফেললাম, বুঝলাম না।
আগের মতই নিচু স্বরে মহিলাটি যা বললেন তার মর্মার্থ ‌করলে দাঁড়ায় -
শিবরাম বায়েন আর পুতুল বায়েনের দেওয়াল ঘেঁষা সোমথ্থ প্রতিমা রূইদাসের, একরাতের ঝড়ে দেওয়াল চাপা পড়ে যখন মা বাপ দুজনেই মারা গেল, বেঁচে যাওয়া নুড়ো খুঁটিটা ধরে দিন দুই প্রতিমা রুইদাস সেখানেই বসেছিল।তারপর কালের নিয়মে যদিবা সে উঠলো কিন্তু তার মাথা আর নির্দিষ্ট নিয়মে চললো না। যখন তখন উঠে এদিক ওদিক চলে যায়, একঘর নাতিনাতনি আর সারাদিনের পরিশ্রমের পর পুতুল বায়েনের আর এক কাজ বাড়ল , প্রতিমা কে  খুঁজে নিয়ে আসা।এদিক ওদিক তাবিজ, কবজ, তেলপড়ার পরও এক ঝোড়ো সন্ধ্যায় যখন সে নিখোঁজ হল তখন অগত্যা শিবরাম চললো প্রতিমাকে খুঁজে আনতে, আর যখন সে ফিরলো তখন একমাথা সিঁদুর সমেত ,গ্ৰামের শিবমন্দিরে ঐ অবস্থায় বসে ছিল সে। শিবরামকে পেয়ে পরম আনন্দে হাত ধরে আমার বর, আমার বর বলে হেলেদুলে বাড়ি ফিরেছিল।

সেইদিনই  সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর পুতুল বায়েন শিবরামকে এমন কিছু কথা বলেছিল যে শিবরাম , দুর হ হারামজাদী , বলে দুদিন ঘরে জলস্পর্শ করেনি। কিন্তু তারও নাম পুতুল বায়েন। ঠিক দিন গুনে গুনে ঠিক দিনে সন্ধেবেলা শিবরামকে প্রতিমার ঘরে ঢুকিয়ে শিকল তুলে দিয়ে এল। আর তারপরেই ঘটল ম্যাজিক, আস্তে আস্তে ওষুধ আর শিবরামের গুনে প্রতিমা সুস্থ হয়ে উঠতে লাগল। পুতুল বায়েন দেখে আর মিটিমিটি হাসে আর নাতিনাতনি দের গায়ে হাত বুলিয়ে ঘুমপাড়ানি গান গায়।

আমি অবাক হয়ে বললাম, তুমি নিজে হাতে এমন করতে পারলে! সে লাজুক হেসে উত্তর দিল মাসে তো চারটে দিন দিদিমনি, তাতে যদি কেউ প্রান পায় তাহলে আমি কে?
তখনও নির্বিকার প্রতিমা নিবিড় ভাবে শিবরামকে জড়িয়ে ধরে আছে , আর মিটিমিটি হাসছে।

No comments:

Post a Comment