দরদালান
নবমীর রাত, অনেকক্ষন খ্যান, আরতি শেষ হয়ে এখনো চারদিকে ধুনো আর ধূপের গন্ধ বইছে। জাগপ্রদীপের ধোঁয়া থেকেও ঘি পোড়ার বাস ছাড়ছে, কাল সকাল হলেই দশমী, আবার ঘরে ফেরা, গৃহস্থালীর কাজে ফেরা। পাতলা সরের মত নবীন কুয়াশা ধীরে ধীরে বিষন্নভাবে নামছে।একমাস ধরে সাজসজ্জা , এত আয়োজন, আলাপ, আলোচনার কাল সকালেই সমাপ্তি ঘটবে, কদিনের পুজোবাড়িতে ব্যস্ততার পর ক্লান্ত সবাই আজ ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু পুজোমন্ডপে ঘরের নেড়ি কুকুর কালু দলবল জুটিয়ে আড্ডা জমিয়েছে।
রাত নিশুতি হচ্ছে, একচালা দুর্গা মূর্তি থেকে বেরিয়ে এল এক সাধারন মেয়ে, পরনে কস্তাপেড়ে শাড়ি, প্রাচীন চৌধুরী বাড়ির দেওয়ালের কোটর থেকে লক্ষ্মী পেঁচাটা একবার চোখ তুলে তাকালো। এগিয়ে চলেছে সেই নারী, ঠাকুর দালান পার করে দরদালান, তারপর সদর, বৈঠকখানা, খাজাঞ্জিখানা, টানা বারান্দা,চুনসুরকীর মোটা মোটা দেওয়াল ওয়ালা সারি সারি ঘর, একে একে পার হয়ে গেল সে, কেন জানি এবার যেন তার একটু বেশীই মনখারাপ, অথচ প্রতিবারেই সে আসে আবার ফিরে যায়। ভোর হয়ে আসছে অবশেষে সে গিয়ে বসেছে যেখানে আজ একমাস ধরে মধু কুমোর তাকে সৃষ্টি করে তুলেছে একান্নবর্তী পরিবারের মত, একচালায়। ঠিক যেমন বাঙ্গালী সংসার বাঁধা থাকে তেমনি করেই গনেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতীর গর্ভধারিনী না হয়েও বাঙালী মায়ের মত আগলে রেখেছে সে তার সংসারকে।
সেই প্রথম দিন থেকে কাদামাটি আর খড় ছেনে যেদিন কাঠামে প্রথম মাটি পড়ে, তারপর যত শুকোতে থাকে তত মাটির কোনায় কোনায় ফাঁক ধরে, পিঁপড়েদের তার মধ্যে দিয়ে চলাচল প্রথম জীবনরসের সঞ্চার করে। তারপর ধীরে ধীরে নারীশরীর আকার পেতে পেতে চতুর্থীর সারারাত ধরে রঙ, গর্জনতেল, কাপড় আর সমস্ত সাজসজ্জা নিয়ে পূর্ণরূপিনী হয়ে ওঠেন চৌধুরী দের পূজামন্ডপে, আর সকালে বাড়ির বড়কর্তা দরদালানে দাঁড়িয়ে প্রনাম ঠুকে বলেন ত্বমসো মা জ্যোর্তিরগমঃ, ঠিক সেইমূহুর্ত থেকে দেবী সাধারনের ধরাছোঁয়ার বাইরে গিয়ে পুরোহিতের হস্তে সমর্পিত হন। আবার তাঁকে ছুঁতে পারা যায় ঘট বিসর্জনে দেবীত্ব বিসর্জনের পর। দেবীত্বে শুধুমাত্র পুরুষতন্ত্রের অধিকার আর দেবীত্বহীন কাঠামোয় নারীর।দেবীর ঐশ্বর্য রূপ ভজন করবে পুরুষ আর উপচার সাজিয়ে দুর থেকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকবে ঘরোয়া রমনী, অবাক হয়ে দেখবে আরেক নারীর দেবী হয়ে ওঠার আয়োজন।
দশমীর সকাল, ঢাক বাজছে , সবাই ব্যস্ত শেষক্ষনে, বিজয়া আরতি চলছে, কাল থেকে যে যার কাজে ফিরবে সে সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আলোচনা চলছে আর পাল্লা দিয়ে চলছে ছবি তোলা। সারাবছরের জমানো সিধের মত মূহূর্ত গুলোকে যাতে জমিয়ে রাখা যায় তার জন্য বিভিন্ন কোন থেকে পোজ দেওয়া চলছে, অথচ দেবীর মনে আনন্দ নেই। কোথাও যেন ভাটার স্রোত ধাক্কা মারছে উজান পানে, নিংশব্দে চৌধুরী বাড়ির কার্ণিশ ভেঙ্গে পড়ছে, সবাই ছড়িয়ে পড়ছে, ফাটলের ডালপালাগুলো বড় হতে হতে শিকড় ছড়াচ্ছে, তাদের সন্তান সন্ততি জন্মাচ্ছে আর বাড়িটা আরো নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছে।
দেবী স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন অনাগত ভবিষ্যতে এ বাড়ির একটি নক্ষত্র খসে যাবে, অথচ আজ সেই একচালা একান্নবর্তী পরিবারকে এক ফ্রেমে বেঁধে রাখার কি নিদারুন প্রচেষ্টা।
বিসর্জনের ক্ষন এগিয়ে আসছে, মাঝি পাড়ার হারু, নাড়ু, নিমাই, কাদু সবাই মিলে বাঁশের মাচান করছে, এদিকে দরদালানে প্রতিমাকে আনা হয়েছে, বাড়ির বৌ, মেয়েরা বরন করছে তাদের ঘরের মেয়েকে। এতক্ষনে তার দেবীত্ব ঘুচেছে। ঘরের মেয়ে হয়ে সে ঘরের মেয়েদের সাথে মিশতে পারছে। তার গোটা মুখ সিঁদুরে, মিষ্টিতে মাখামাখি, পা দুটি রক্ত লাল, এ মুহুর্তটি দেবীর বড় প্রিয় মূহুর্ত তবু আজ তার মন বড় বিষন্ন।
দেবী চলেছেন ফিরে, বাঁশের মাচানের দোলায় আন্দোলিত হচ্ছেন তিনি, বাড়ির সমস্ত মহিলারা সিঁদুরে, আলতায় রঞ্জিত হয়ে বিদায় মূহুর্তে দাঁড়িয়ে আছেন দরদালানে, চৌধুরী পুকুরের ঘাটে বিসর্জনের আগে চলছে প্রদক্ষিন, এক- দুই- তিন----- সাত বলার সঙ্গে সঙ্গে বড়কর্তা মাথায় হাত ঠেকিয়ে বলে উঠলেন - মা গো আবার তোর সাথে দেখা হবে তো মা ?
ঠিক সেই সময় জলের মধ্যে ঝপাস করে আওয়াজ হল বিসর্জনের , আর ঠিক আধডোবা মূর্তির মুখমন্ডলী থেকে জলে ডোবা মানুষের মত ডুবডুব ডুবডুব করে বুদবুদ উঠতে আরম্ভ করলো, ঠিক তিনি যেন কিছু বলতে চান, অথচ কান্নায় তার গলা বুজে আসছে, অস্ফুটে দেবী যেন বলে উঠলেন, না বাবা ।
হঠাৎ কাদু চেঁচিয়ে উঠে বললো দেখ হরা ঠাকুরটা জ্যান্ত ছিল নাকি বল দিকিনি !