বাড়া বা বাড়ানো
নৃতত্ত্বের বিচারে রাঢ় বাংলার প্রাচীনতম অধিবাসীদের মুলত আদি অস্ট্রেলিয় বা প্রোটো অস্ট্রেলিয় নরগোষ্ঠীরই সর্বাধিক সংমিশ্রণ ঘটেছে। হিন্দু সমাজের তথাকথিত অন্ত্যজ বা তপশীলিভুক্ত জাতিসমূহের মধ্যে বাগদি, ডোম, মাল ,মুচি, বাউরী ইত্যাদি। এই নৃতাত্ত্বিক বনিয়াদটি গড়ে উঠেছে মূলত আদি অস্ট্রেলীয় উপাদান নিয়ে , আজও তাই এদের মধ্যে আদি অস্ট্রেলিয়া উপাদান যথেষ্ট বিদ্যমান। নৃ- তাত্বিক উপাদান আদি অস্ট্রেলীয় খুব স্বল্প পরিমাণে দ্রাবিড় ঐতিহ্য এই দুই সমন্বয় এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। অতএব এরা বহিরাগত জাতি নয় , আমাদের দেশের আদিম অধিবাসী।
বর্তমানে বাঁকুড়া জেলায় বাউরী উপজাতির আনুমানিক সংখ্যা প্রায় 4 লাখ এর কাছাকাছি। মূলত শালতোড়া মেজিয়া বড়জোড়া, গঙ্গাজলঘাটি, ছাতনা ,বাঁকুড়া খাতড়া, সিমলাপাল ,ওন্দা এই এগারটি থানাতে সারা জেলার দুই তৃতীয়াংশ মানুষ বাস করে। 'বাউরী' শব্দটির বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার হতেও দেখা যায় - বাতাস ও মন শব্দের সঙ্গে । বাউরী শব্দের প্রকৃত অর্থ আমরা পাই যাযাবর অর্থাৎ অনুমেয় যে সুদূর অতীতে এরা যাযাবর ছিলেন।
কার্তিক অমাবস্যায় যখন সমগ্ৰ ভারতবর্ষ দীপাবলীর আলোকমালায় সসজ্জিত হয়ে উঠেছে সেই সময় রাঢ় বাংলার বাউরী তপশীলিজাতি সম্প্রদায় পালন করল তাদের বাড়া বা বাড়ানো অনুষ্ঠান। কালীপুজোর দিন এই সম্প্রদায় তাদের প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তাদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এদিন সকালে স্নান করে উপোস থেকে , কাঁচা জামাকাপড়ে শুদ্ধ হয়ে,নতুন মাটির খোলায় রান্না চাপানো হয়।। বাজারে যত রকম নতুন সবজি, বিশেষত শীতের সবজি বাজারে আমদানি হয় সেই সব দিয়ে নয় রকম তরকারী মাংস ও বিউলির ডাল রান্না করা হয়। পুকুর থেকে তুলে আনা হয় শালুক পাতা ও উড়ু ধান( পুকুরের জলেই জন্মানো একজাতীয় ঘাস থেকে প্রাপ্ত দানা) , ঘরের ভিতর পরিস্কার করে আলপনা দেওয়া হয় এবং চালের গুঁড়ো সেদ্ধ করে নটি ঘিয়ের বা তেলের প্রদীপ ও ধুপ জ্বালানো হয়।তিনটি বা পাঁচটি শালুক পাতার চারদিক উড়ুধানের শিস দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়। এরপর নয়টি বা ষোলোটি পিন্ড যথাক্রমে তিনবার করে দিয়ে পিন্ড তৈরী করেন বর্তমান গৃহকর্তা, তারপর উপোসরত বাড়ির অন্যান্যরা পূর্বপুরুষদের আত্মার উদ্দেশ্যে ভোগ নিবেদন করেন, এদিন মনে করা হয়ে থাকে যে, পূর্বপুরুষেরা নেমে আসেন এই নয় তরকারী ভোগের পিন্ড গ্ৰহন করতে, এবং পরিবারের উপর কৃপা বজায় রাখেন। এজন্য বিধবা স্ত্রীলোক স্বামীর উদ্দেশ্যে, সন্তানেরা পিতার উদ্দেশ্যে এই পিন্ড বাড়িয়ে দেন। কাজ সম্পন্ন হলে সমস্ত জায়গা জল ঢেলে পরিস্কার করে নিকটবর্তী জলাশয়ে গিয়ে বিসর্জন দিয়ে আসা হয়,এরপর এদিন পরিবারের সবাই খাদ্যগ্ৰহন করেন। পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে এই স্মৃতিতর্পণ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্যই এর নাম বাড়া বা বাড়ানো।
ঋন স্বীকার :
ডঃ বিধান মুখোপাধ্যায়, বাউরী সম্প্রদায়ের উৎপত্তির ইতিহাস ও ঐতিহাসিক পর্যালোচনা
সমীক্ষাস্থল: খাতড়া
লোকজীবনের মধ্যে বয়ে চলা সংস্কার কারও মুখাপেক্ষী হয়ে বয় না। সময়, সমসাময়িকতা এবং কালের নিয়মে সে সব স্বতোই যাচিত , শোধিত হয়ে চলে। শিষ্ট জীবনাচারে আমার ভালোত্ব, অন্যের তুলনায় উৎকৃষ্টত্ব প্রকাশের চালাকিত্ব কাজ করে থাকে। লোকজীবনাচার আসল, শুদ্ধ ও সৎ তাই তার প্রমাণ বা প্রচারের প্রয়োজন রাখে না।
ReplyDeleteপ্রতিবেদিকার দৃষ্টিকোণ একটি নতুন সমৃদ্ধির উন্মোচন করে।