Saturday, July 16, 2022

অনুগল্প। দাম্পত্য ১,২

            দাম্পত্য (প্রথম পাঠ)
              অর্পিতা চৌধুরী


রিটায়ারমেন্টের পর একবছর পার হতে চললো জীবনের এই দ্বিতীয় ভাগে এসে নবীনবাবু আর প্রভাদেবী এক নতুন ইনিংস শুরু করেছেন। নবীনবাবুর বদলীর চাকরী  আর বাড়িতে বৃদ্ধ শ্বশুর শাশুড়ির রক্ষনাবেক্ষন, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা এসবের কারনে দুজনের সেরকমভাবে একসঙ্গে থাকা হয়নি, এখন এই একবছরে তারা একে অপরকে যেন নতুন করে  চিনছেন, জানছেন। দৈনন্দিনতায় একে অপরকে একটা অভ্যাস করে ফেলেছেন এই এক বছরে। নবীনবাবু এখনো যথেষ্ট আ্যকটিভ হলেও প্রভাদেবী বাত আর সুগারে জর্জরিত, ইনসুলিন চলে নিয়মিত তাই খাওয়া দাওয়ায় ব্যাপারে নবীনবাবু  তাকে চোখে চোখে রাখেন।

অনেকদিন পর পুরনো বন্ধুদের সাথে নবীনবাবুর যোগাযোগ হয়েছে, সবাই মিলে পরিকল্পনা করেছেন কলেজ বেলার মত  পরিবার ছাড়া তারা ঘুরতে যাবেন। আরেকবার ফিরে পেতে চাইবেন কিশোরবেলাকে। প্রভাদেবীর মনে মনে সায় নেই কিন্তু ব্যাগ গুছিয়ে চলেছেন,কেমন যেন নতুন বিয়ের পরপর বিচ্ছেদ দুঃখে ভারাক্রান্ত মন। আর দিন দুই বাকি, মনে মনে পরিকল্পনা এঁটে ফেললেন। নবীনবাবু নিয়মমাফিক সুগার টেষ্ট করেন, আর কপালের ভাঁজ চওড়া হয় হঠাৎ সুগার বৃদ্ধির বাড়বাড়ন্তে, অথচ কারন খুঁজে পান না।  কয়েকদিন থাকবেন না তাই নবীনবাবু গুছিয়ে বাজার করে এনেছেন, দুই হাতে দুই ব্যাগ, উচ্চস্বরে প্রভাদেবীকে ডাকছেন দরজা খোলার জন্য। 

প্রভাবতীর মুখে তখন ঠাসা মিষ্টি, ফ্রিজের দরজা খোলা, মিষ্টির বাক্স খোলা, কোনোরকমে সাড়া দিলেন উঁ উঁ।


       দাম্পত্য ( দ্বিতীয় পাঠ)
             অর্পিতা চৌধুরী

একসঙ্গে আটত্রিশটা দাম্পত্য কাটানোর পর আজ এ বাড়িটা আশ্চর্য রকম শুনশান।  বাহাত্তর ছুঁইছুঁই অভিরূপ বাবু সারাদিন আজ চুপচাপ। রান্নার মেয়েটি রান্না করছে রান্নাঘরে, আজ আর তিনি কোনো বিষয়েই মাথা ঘামাচ্ছেন না,শুধু মাথা ঝুঁকিয়ে ঢুলছেন আর মাঝেমধ্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। গোটা বাড়িটা যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু মাঝে মাঝে কড়াই খুন্তির আওয়াজ আসছে রান্নাঘর থেকে। আসল ঘটনা হল, অভিরূপ বাবুর স্ত্রী প্রতিমা দেবী দুদিন ধরে নার্সিংহোমে আই সি ইউ তে ভর্তি রয়েছেন বেশ সংকটজনক অবস্থায়। এর আগে অসুস্থ হলেও তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছেন, তবে এবারে ?

দুদিন পর প্রতিমা দেবী আবার একবার যুদ্ধ জয় করে বিকেল বেলা নার্সিংহোম থেকে বাড়ি ফিরেছেন। ঘরে চারদিকে আলো জ্বলছে, টিভিতে সিরিয়াল চলছে আর অভিরূপ বাবুর উত্তেজিত মতামত শোনা যাচ্ছে থেকে থেকে। এখনো প্রতিমা দেবী বেশ দুর্বল, শুয়ে আছেন, রাত দশটা, মশারী টাঙানোর পালা, এমন সময় অভিরূপ বাবুর গলা পাওয়া গেল, চড়া গলায় গজগজ করে বলছেন - এমন কুঁড়ে, অকেজো মেয়েমানুষ আমার বাপের জন্মে দেখিনি বাবা। চিরকেলে  মশারী টাঙ্গানো নিয়ে তাদের ঝগড়া।প্রতিমা দেবী আগের মতই নির্বিকারে পাশ ফিরে বললেন, টিভির সামনে থেকে সরাও তো , শুধু ঝামেলা ।

দেওয়াল ঘড়িটা টিকটিক শব্দ করছে,  বাড়িটা জাগছে।



     
            



অবান্তর ১১৪ রাধা

      রাধা
অর্পিতা চৌধুরী


তোমাকে ভালোবেসে 
 অনন্ত আয়ূধ জয় করেছি।
এক মুহূর্তের কান্না  বাঁচতে শিখিয়েছে হাজার বছর।
অনন্ত আয়ূ অতিক্রম করে এক দুঃসাহসী নারী জন্ম নিয়েছে আজ।
এ নারী ভালোবাসায় মরে যেতে আসেনি,
বাঁচতে এসেছে অনন্ত কাল।
এ এক মোহনীয় পথ
যে পথের দেখা মিলেছে অনন্তের গতিপথে শূন্যবিন্দুতে , অপূর্ণতার আত্মানুসন্ধানে,
 আজ তা পূর্ণ।

আমি কোনোদিন কেউ হব না, অথচ আমিই সব।
এই বোধে আজ অনন্ত লক্ষ্য যোজন বিরূদ্ধতা অতিক্রম করতে পারি,
অতিক্রম করতে পারি এক জীবন।
যেদিন সমস্ত অঙ্গুরীয় বন্ধন ছুঁড়ে জলভরা চোখ প্রশ্ন রেখেছিল,
একটি চুম্বন আখর যেন অনেক আখর এঁকে দিল আকাশ গায়ে, শিলাখন্ডে।
ঝরে পড়া অশ্রু গন্ডুষপাত্রে তুলে নিলে অনায়াসে।

জানলাম অনন্ত বলে কিছু হয় না,
 মূহুর্তই অনন্ত হয়ে যায়।

Monday, July 11, 2022

অবান্তর ১১৩ প্রবাহ

      প্রবাহ

    
ভালোবাসায় যুদ্ধ চলে না
তুমি হও বা আমি
রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত দুমড়ে মুচড়ে ওঠা জীবন 
যতক্ষন না ক্লান্ত রিক্ত হয়ে ওঠে
ততক্ষন অন্ধ আনুগত্যে একে অপরকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে যেতে  একদিন হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে দেখবে তুমি আর তুমি নেই অন্য মানুষ, অন্য হাত, অন্য পা, অন্য জীবন
ঠিক যেন দূরতর অচেনা মানুষ ।
ঠিক যেন কতদিন ঘুম থেকে জেগে উঠে না খাওয়া বুভুক্ষু জীবন
অনন্ত ক্ষিদের মুখে সব কিছু বিস্বাদ বিস্বাদ
অথচ জীবন কিছু চায়,
কি যে চায় , কিছুই না জানে
তবু ঘুম ভাঙ্গা আলসেমি জুড়ে থাকে মন,
চুপচাপ পড়ে থাকে, মাথা ফাঁকা , গা ভারী
সব কথা যেন শেষ হয়ে গেছে চিরদিন 
অথবা সব শব্দই হয়ে গেছে নিংশব্দ আজীবন।
সব কিছু বিষাদ, বিষাদ
যেখানে একদিন আর কোনো তুমি নেই আমি নেই, অস্থিরতা নেই সবকিছু গভীর গভীর , স্থির অনন্ত নীল।

Saturday, July 9, 2022

কথন

     কথন


আবার এক মৃত্যুকীর্ণতা, আবার এক মরচে পড়া দিন। এ দিনের যেন শেষ নেই, কানাগলির মত, শুরু আছে শেষ নেই। অথবা শেষ হলেই সমাপ্ত বলেই এ অনন্ত। ঈশ্বর, নিরীশ্বর, প্রার্থনার মাঝে নির্লিপ্ত জীবন, যে জীবনে সংঘাত পদে পদে নৈরাশ্যের সাথে তবু সব কিছু আলগা আলগা যেন আমি বলে এখানে কোনো দুঃখ সুখের লীলা নেই, সবই দর্শকের দর্শনমাত্র। এই যে একটা দৈনন্দিন সকাল শুরু হল তারপর আবার ঘটনার পুনরাবৃত্তি অভ্যস্থ দ্রুততায় জামাকাপড়, প্রয়োজনয়াদি ব্যাগে পোরা, এখন সে যেন শিশু আমি ধাত্রী, তাই উপশমে নয় প্রয়োজনে বিশ্বাসী, দ্রুততায় সিদ্ধান্তে আসি, আবার সেই হাসপাতাল,শুশ্রুষা,বমন গা, তবু কেন জানি বিবমিষা আসে না, মুছিয়ে দিই, সরিয়ে দিই না। ক্ষিধে নেই, বোধ নেই, অনায়াসে পাঁজাকোলা করে তুলে আনি, এও বুঝি প্রাপ্তি, উপলব্ধি, নিজের সাথে নিজের। সারাদিন দাঁড়িয়ে,ক্লান্তি নেই অথচ ডাক্তার অমিল।

এই তো সেদিনও অচেতন দেহ কাছে সবাই যখন ইতস্তত তখনও কোনো এক বোধের কাছে জিম্মেদারি করেছি মন। কোথাও যেন এক বিচ্ছেদ গন্ধ তীব্র হচ্ছে দ্রুততায় অথচ কি নির্লিপ্ত আমি, যেন মুখোমুখি হতে প্রস্তুত কোনো এক ভবিষ্যতের অথচ কোনো ভয় নেই, ভাবনা নেই , সবই চলছে যন্ত্রসংগীতের মত, সুরে তালে কোথাও কোনো খামতি নেই, ওজর নেই।

বেশ একটা বোধ জন্মেছে আমিত্বে। সেই যখন করোনাকালে একলা উপরনিবাসী সন্ধ্যেবেলায় জানালাপাশে মেঝেতে বসে লিখতে লিখতে অনুভব করলুম মোটাসোটা কালোকুলো একটা সাপ ঢুকে পড়ছে জানলা দিয়ে, চমকে তাকাতেই দেখি কোথাও কিছু নেই, গা টা ছমছম করে উঠলো, দিলুম জানলাটা বন্ধ করে। অথচ ঠিক পরের দিন ভরদুপুরে অমনিই এক ঢ্যামনা জানলা দিয়ে বুকে পড়লো রান্নাঘরে, মনে মনে কেমন একটা খটকা লাগলো, বললাম না, কিন্তু খচখচানি রয়ে গেল। 
আবার দেখ সেই মানুষটা যেদিন বললো মেয়েলি দুপেয়ের তেলখাবার জায়গার সে খোঁজ জানে না, হয়তো মশকরা করেই, তবু কেমন যেন সেই খচখচানিটা ফিরে  এল আর তারপরই ধরনীপ্রপাত । 
আবার দেখ না এই যে সেদিন ঘুমোতে ঘুমোতে কেঁদে কেঁদে উঠলাম, দেখলাম যে ওম স্কুলে খুব অসুস্থ অথচ সেদিন রবিবার, ঠিক পরদিন ছেলে জ্বরের ঘোরে ছেলে বাড়ি ফিরলো। এ কি? এ কেন? প্রশ্ন খুঁজতে ইচ্ছে হয় না, তবু খচখচানিটা ফিরে ফিরে আসে।

কিছুদিন ধরেই এক বিচ্ছেদ সুর শুনতে পাচ্ছি, এ যেন অবচেতনের গান, এখানে কোন ভয় নেই, ভাবনা নেই শুধু কর্তব্য, সবাই কে আশ্বস্ত করার অথচ কেমন যেন নির্লিপ্ততা। সব কিছু তে থেকেও কেমন যেন হাঁসের মত গাঝাড়া দিয়ে চলেছি। বাইরের আমির সাথে ভেতরের আমির কোনো সংঘাত নেই, কোনো দ্বন্দ্ব নেই শুধু যেন বাইরের আমির জন্যে ভিতরের আমি ঘুমিয়ে থাকতে চায়। ঘুম থেকে উঠে হাই তোলে, ভাবে খুব ফাঁকি দেওয়া গেল যাইহোক। এতদিনে ভিতর আমি বুঝতে পারে এই যে মানুষগুলোকে  নাড়ছি ঘাঁটছি এটাই  কর্ম, এরপর অন্তিমে কে কি  আড়ম্বর করলো, কে কত সখ্যতা দেখালো সবই নশ্বর, আপেক্ষিক। তখন আর তোমার কোনো কাজ নেই, তখন তোমার কোনো দায় নেই, তখন বোধহয় তোমার ক্লান্ত হওয়ার সময়, জিরোবার সময়। এখন, এই যে তুমি পাশে আছো, বারে বারে লড়াইয়ে জয়ী হচ্ছো অথচ তুমি নিশ্চিত জানো একদিন হারবেই, তবু লড়াই ছাড়ছো না এটাই প্রাপ্তি, এখানে কোনো শুন্যতা নেই, আফশোস নেই, বলন নেই, শুধুই নৈব্যক্তিকতা।

তবু মাঝে মাঝে বুঝতে ইচ্ছে হয় সত্যিই কি সব দৈন্যতা ঝরে গেছে মাটি থেকে, এখনও কোনো গাছ যদি ঋজু হয়ে দাঁড়ায়, জড়িয়ে ধরে বলে আয় তোর ছায়া হই, অনেকদিন রোদে পুড়ছিস, জলে ভিজছিস, তখনও কি , তখনও কি তামাটে রোদে রোদ ঝরবে না বৃষ্টি!
কি জানি? হয়তো বা ----