Wednesday, November 24, 2021

অবান্তর ৭৮, বৃত্ত

          বৃত্ত




ভনিতা ছাড়াই বলতে পারি কথা,

বহুদিনের পরেও কথা স্রোতে,

হাতের উপর হাত না রেখেও চলি ,

দূরত্বকে আঁকড়ে ধরে সুখে।


ভাব না রেখে আড়ির বোঝা বেশী,

কথার পিঠে কথার পাহাড় জমে।

ভালোবাসার কথায় সাবধানী,

বৃত্ত রক্ষা করে দুইজনে।


খাপ জীবনে খোপ জব্দ হল,

কথামালা সাজে ট্রেনে বাসে।

তারপরেতে অন্ধকার কোনে

চামচিকাতে ধিনতা ধিনা নাচে।


এক জীবনে দুঃখ পুরো হলে,

অন্য হাতে দুখ জমবে কবে?

একের কষ্টে অপূর্ণতা রবে,

দুইয়ের পিঠেই বইতে খানিক হবে।


বৃত্ত শুধু দুটো হাতের খেলা

জমলে খানিক ঝরবে আ্যড্রিনালিন।

একের ঝরন মরন বন্ধ হলে

অন্য পিঠে ঝরবে তখন খালি।


ঝরতে ঝরতে ঝরনা যখন হবে,

বৃত্ত তখন সরলরেখায় কাত।

আবেগ যদি বানায় দশরথ,

কৈকেয়ীকে ভাবতে তখন হবে।


এক জীবনে মরন কি বা বল?

ধরতে জীবন শর্তে বাঁচে যারা।

দ্বন্দ্ব মরন দুইই একই পিঠ,

জীবন জীবন খেলুক এবার তারা।




Friday, November 19, 2021

অবান্তর ৭৭ রুপকথা

          রুপকথা




এখন আমার একটা ঘুম দরকার,

একটা নিশ্চিন্ত নিরুপদ্রব ঘুম।


এখন আমার দুটো হাত দরকার,

যে হাত আমাকে বেড়াকলমির মত 

আস্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকবে।


আমার এখন একটা শীতল বুক দরকার,

যেখানে ফটিক জল ফটিক জল বলে 

ডুব দিতে পারবো।


আমার এখন একটা বিস্তির্ণ মরুভুমি কাঁধ দরকার,

যেখানে মাথা‌ রেখে বেহাগে বেহায়া হব খুব কষে।


আমার একটা মানুষ দরকার ,

সমস্ত রাজ্যজয়ের পর যেখানে ছেলেমানুষী আছড়ে পড়ে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হওয়া যায়।



আসলেই বোধহয় আমার একটা রূপকথা দরকার,

ছেলেবেলা থেকে যাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি।


অবান্তর ৭৭ অনুগত শব্দেরা

    অনুগত শব্দেরা 



উড়ে যাও

মুক্তির সময় এসেছে।

ডানা ঝাপটানো পাখির মত ঝাপটাতে ঝাপটাতে 

ডানা খোলো।

বোঝো এবং বোঝাও নিজেকে

আবেগের পরিপাটি ভালো, 

শৃঙ্খলতা আনো।



ছেলেমানুষী ছাড়ো, 

আবেগীয় তত্বে সমঝোতা না করে 

মার্কস, লেনিন নেহাতই হিটলার হয়ে যাও।

নাৎসী আন্দোলনের বীজ বপন করো জঠরে 

হৃদয়ে।


যা আর নেই,

আবেগীয় তত্ত্বের মগডালে তাকে বিরক্ত প্রশ্নচিহ্নের মত ঝুলিয়ে রেখো না।

পেড়ে ফেল একেবারে ধরাশায়ী করে,

ছেৎরে ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ুক প্রেমজ আবেগরা।


লৌকিকতা বড় বালাই

যা নেই তাই নিয়ে শুধু টানাটানি , দর কষা

তারপর তিতকুটে জিভে শুধু গালাগালি গলাগলি,

সমস্ত অনুগত শব্দদের জব্দ করে মুছে ফেল এক নিমেষে,

আসলেই তারা অনুগত নয়,

উপসংহার মাত্র।

এরপর আর কিছু নেই, স্বস্তি বা স্বস্ত্যয়ন ছাড়া।



দাঁড়ি, কমা, কোলনের মাঝে পড়ে

অনুগত প্রশ্নেরা বিস্ময় চিহ্ন হয়ে যায়।

আবার হেমন্তে হলুদ পাতারা খসে খসে যায়,

সমস্ত প্রশ্নচিহ্ন তুলে রেখে।



শুধু অনুগত শব্দেরা 

ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি খোঁজে

শীত ঘুমে জেগে রয় বুদ্ধ ও লেনিন ।



Thursday, November 18, 2021

অবান্তর ৭৬ উদযাপন

             উদযাপন


ভালোবাসা থেকে যোজন দুরে চলে গিয়ে

ভালোবাসাতেই ফিরতে হয়।

ততদিন না হয় যা যা চেয়েছি 

সব আবদার গুলো সাজিয়ে রেখো

বহু যত্নে, আর আদরে।

প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে 

কৃষ্ণচূড়া, অমলতাসের ডালগুলো বাড়িয়ে যেও।

আর পলাশকে বোলো কানে কানে 

এ স্মৃতি যাপন শুধু সমে ফেরার  উদযাপন।


ভালোবাসা থেকে সরে যেতে যেতে

স্মৃতিতে ফেরা,

এ তো তোমার কাছেই নিজের ফেরা,

শিউলিরা ঝরে পড়ে শুধু স্মৃতি হবে বলে,

ভালোবাসার কাছে কাছাকাছি হতে

দুঃখের কাছাকাছি,  সেও তো নামান্তর।



আমি তো প্রেমিক মাত্র,

শুধু জানি একমাত্র

ভালোবাসা থেকে দুরে সরে গেলে,

ভালোবাসাতেই ফিরতে হয়।


Monday, November 15, 2021

অবান্তর ৭৪ ওপরকক্ষ নীচকক্ষ

    ওপরকক্ষ  নীচকক্ষ



আমার নীচকক্ষে  একজন স্মৃতিতে থাকে আর একজন স্মৃতিচারণায়,

কালের নদীতে শুশুক ডুব দিয়ে দিয়ে তুলে আনে ক্ষয়াটে মনিমুক্তোর হাড়পাঁজর।

দিনশেষে পড়ন্ত বেলায় সারাক্ষন ঝগড়া করে

গা আউলায়

অথবা গুনে গেঁথে ওষুধ বাঁচায়।

স্মৃতিপথে যত  তাগিদ আসে, আঁশশেওড়ার ডালের  ওপর পা ঝুলিয়ে  ক্ষেন্তি বুড়ির দিদি শাশুড়ির গল্প করে।

পুরোনো জিনিস ঝালিয়ে ঝুলিয়ে নেয়,

পুরনো কাপড় চোপড় পোঁটলা করে স্মৃতিতে সাজিয়ে রাখে।


অদেখা মানুষ আর অচেনা সমস্ত বিষয়ে মনোযোগ দিয়ে নিজেকে প্রয়োজনীয় করে তোলে সংসারে।

অস্তিত্ব রক্ষার বড় দায়।



অথচ একদিন ছিল,

দুহাতে দুপায়ে হামাগুড়ি দেওয়ারও  অবসর ছিল না ।

টগবগে ভাতে গরম ফ্যান ফেলে খাওয়ার ফুরসত নেই,

চুলের জট চুলেতে গিঁটিয়ে, ব্যাগ তুলে দৌড়,

ফিরে এসে পুনরাবৃত্তি, কোনো কোনো দিন রাতজাগরন, কোলের শিশুকে কোলে করে।


আর আজ

খনি খুঁড়ে চলে

ধারাবাহিক মনুষ্য জীবন,

বাসা বাঁধে, ডিম পাড়ে, তা দেয় , 

ডানা শক্ত হলে উড়াল দেখে।


তারপর 

একটা চেয়ার, কিছু পোঁটলা,মাথার কাছে কিছু ওষুধের আনাগোনা, একলা নীল বাতি আর

একটা কাজের মেয়ে।

জীবনের সবচেয়ে আপনজন, ওপারের আলো।

তেল মাখে, গল্প করে জীবনের অন্ধি সন্ধি ক্ষন।

সঞ্চিত পুঁটুলিরা নিশ্চিন্তে ঘুমোয়।

এদিকে শুকনো রুটি ফুলতে ফুলতে আকাশ রচনা করে।

মানুষটি তখনো স্বপ্নে বিভোর ।




Sunday, November 14, 2021

গুড়মহল

 গুড় মহল


অর্পিতা চৌধুরী

কলেজ শিক্ষিকা

গৌরব গুঁইন মেমোরিয়াল কলেজ

চন্দ্রকোনা রোড, পশ্চিম মেদিনীপুর



শীতের সূচনা হচ্ছে, সকালে পাতলা সরের মত কুয়াশা ধীরে ধীরে ঘন হচ্ছে , গা শিরশিরানি ঠান্ডা বাতাস এবারে কালিপুজোর আগে থেকেই জানান দিচ্ছে শীত আসছে।  রাতভোরে কার্তিক মাসের হরিনাম সংকীর্তন কানে আসার আগে আগেই রহমত অস্থায়ী খেজুর পাতার ছাউনী ছেড়ে উঠে পড়ে,  শ্বশুর আর ফুফাতো ভাইকে ডেকে দেয়, তারপর উজু করে, ফজরের নামাজ পড়ে। আজ বাঁধের  পশ্চিম পাড়ের গাছ গুলো থেকে রস নামাতে হবে।


ঠিক এই চিত্রটাই এখন বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার প্রান্তরে প্রান্তরে। ভোর থেকে সাইকেলে প্রায় গোটা তিরিশ হাঁড়ি চাপিয়ে রস সংগ্ৰহের পরিচিত চিত্র শুরু হয়ে গেছে পশ্চিম বাঁকুড়ার খাতড়া, মুকুটমনিপুর, রানীবাঁধ, ঝিলিমিলি, সিমলাপাল, সারেঙ্গা, ঝাড়গ্ৰাম, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর অর্থাৎ পুরো জঙ্গলমহল জুড়ে। ভাদ্র মাসে চারদিকে মাঠে ঘাটে, নদীপাড়ে, ছড়িয়ে থাকা খেজুর গাছেদের চেঁছে  রাখা হয়। শীতের শুরুতেই খেজুর পাতার ছাউনী আর মাটির গাঁথনী দিয়ে অস্থায়ী ছাউনী বানিয়ে ফেলেন মহলদারেরা। তৈরী করে ফেলেন এক জাবদা মাটির উনুন আর সঙ্গে থাকে লোহার শিটের চারকোনা বড়সড় কড়াই। ভোর থেকে সকাল ৭টার মধ্যেই চলে সমস্ত রস সংগ্ৰহের কাজ, তারপর বড়সড় কড়াইতে সেই রস কাঠের আগুনে ফুটতে থাকে ঘন্টা তিনেক, পুরো সময় ধরে নাড়তে হয় সেই রস নাহলে পুড়ে বা ধরে যাওয়ার ভয় থাকে। পাটালীর গুড় তৈরি করতে তো আরো বেশীক্ষন ফোটাতে হয় তবেই সেই মোটা গুড় থেকে হয় পাটালী। তারপর সারাদিন সেই ফাঁকা প্রান্তর থেকে চলে প্রয়োজনীয় জ্বালানী সংগ্ৰহ। ভোর থেকে ঝোপেঝাড়ের মধ্যে থাকা গাছে উঠে রস সংগ্ৰহ খুব সহজ কথা নয়, তবু এই ভূমিপুত্ররা বংশ পরম্পরায় এই তিনমাস গুড় মহল তৈরি করেন। যা সারা  পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে স্বাদ আর গন্ধ নিয়ে। বেড়াতে আসা মানুষজন নিয়ে যান তাদের শহুরে আলয়ে, খেয়ে যান খেজুর রস। তবু  সময় প্রেক্ষিতে আর বর্তমান প্রজন্ম এই পরিশ্রমের কাজে আসতে চাইছেন না। হাড় হিম ঠান্ডা, পরিশ্রম, খোলা প্রান্তরে কখনো হাতির উপদ্রব ঐ অস্থায়ী খেজুর পাতার ছাউনী রোধ করতে অপারগ। মূলত পরিশ্রম সাধ্য কাজ বলেই হয়তো মুসলীম শ্রেনীভুক্ত মানুষজন গুড় বানানোর কাজে নিযুক্ত থাকেন।তবে মাটির হাঁড়ি ব্যবহৃত হলে রসের গুনমান ঠিক থাকে, কিন্তু মুখ বড় হওয়ার কারনে বাদুড়ে মুখ দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে যা থেকে নিপা ভাইরাস সংক্রমণের ভয় থেকে যায়। আর ভারী এবং বারে বারে ভেঙ্গে যাওয়ার ভয় থাকে বলেই বেশীরভাগ মহল দার সরু মুখ, হালকা, টেকসই  প্লাষ্টিকের হাঁড়ি বর্তমানে ব্যবহার করেন। গাছ প্রতি  দেড় কিলো করে গুড় গাছ বা জমির মালিক কে দিতে হয়, কেউ কেউ মূল্য নিয়ে নেন।


খেজুর গাছ রাঢ়বঙ্গে যত্রতত্র জন্মালেও কোনো কিছুই ফেলা যায় না। সে খেজুর পাতায় বোনা চাটাই হোক কিংবা ছোটো ছোটো গাছ কেটে কান্ডর মাঝখানের আঁতি বার করে খাওয়া, অথবা বর্ষার জল পেলেই থোকা থোকা ফুলের মত পাকা হলদে বর্নের খেজুরের বাহার আর শীতে সরষের তেলের মত টলটলে গুড়  পিঠে পায়েসের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়। 


প্রকৃতি আসলে শীত উপহার সাজিয়ে দেয় শীত প্রতিরোধের জন্য। খেজুর রস এনার্জি ড্রিঙ্ক হিসেবে কাজ করে , এর মধ্যেকার সোডিয়াম - পটাসিয়াম পেশীকে শক্তিশালী করে তোলে, কর্মক্ষমতা বাড়ায়, মেটাবলিজম রেট বৃদ্ধি করে, গুড়ে অবস্থিত আয়রন আ্যনিমিয়া বা রক্তাল্পতা কমায়, কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে, মেদ ঝরাতে সহায়ক এবং ঠান্ডা প্রতিরোধক । শ্রমজীবি গ্ৰামীন দরিদ্র ভূমিপুত্রদের প্রকৃতি দেবী তার উপহার সাজিয়ে দেন । সমস্ত গাছ গুলোকে দুই ভাগে ভাগ করে নিয়ে তিনদিন পর পর এক একটি ভাগ থেকে রস সংগ্ৰহ করা হয়। তিনদিন পর্যায়ক্রমে একভাগ থেকে রস সংগ্ৰহের পর, পরের তিনদিন অপর ভাগ থেকে রস সংগৃহিত হয়।  তিনদিন জিরান বা বিশ্রামের পর যে রস পাওয়া যায় তাকে বলা হয় ' জিরান কাঠের রস। তবে এই সুস্বাদু রস গ্লাস দুয়েকের বেশী না খাওয়ায় ভালো বা বেলা হয়ে গেলে তা গেঁজে গিয়ে নেশাজাত পানীয় হয়ে ওঠে। গাছের এক পিঠ এ বছর কামানো হলে পরের বছর অপর পিঠ কামানো হয়, এভাবেই গাছ লম্বা হয় আর এপিঠ ওপিঠ করে পরম যত্নে গাছ বাঁচিয়ে রেখে রস সংগ্ৰহ প্রক্রিয়া চলে প্রতি বছর। পৌষ সংক্রান্তির দিন থেকেই  প্রায় সমস্ত মহল ভেঙ্গে ফেলা হয়। আবার অপেক্ষা পরের শীতের, আবার অপেক্ষা মহলের পাশের রাস্তায় ধোঁয়া ওঠা সদ্য গুড়ের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার, রাঢ় বঙ্গের অন্যতম জীবিকা ও জীবনের । 







Sunday, November 7, 2021

প্রতিবেদন - গরুখুঁটা

 বাঁদনা পরব আসলে রাঢ় ভূমির কৃষিজীবনের অষ্ট্রিক প্রতিভাস



কার্তিক অমাবস্যাতে যখন সারা ভারতবর্ষ দীপান্বিতার আরাধনায় ব্যস্ত, দক্ষিনবঙ্গের রাঢ়ভূমিতে শুরু হয়ে যায় সেই রাত থেকেই অন্য এক কৃষিকেন্দ্রিক উৎসব বাঁদনা বা বাঁধনা পরব।

চলে তিনদিন ধরে, কোথাও চারদিন ধরে চলে, আবার কোথাও কোথাও রাসপূর্ণিমায় গিয়ে শেষ হয়। মূলত আদিবাসী মানুষজন প্রকৃতি থেকেই তাদের ধর্মের ধারনা গ্ৰহন করেছেন এবং জীবন লব্ধ অভিজ্ঞতাগুলিকে মান্যতা দিয়ে প্রকৃতি পূজাকেই মান্যতা দিয়েছেন। এই অঞ্চলে কোল, ভীল, মুন্ডা, সাঁওতাল, মাহালি, ছাড়াও আরো অন্যান্য জনজাতি  কূর্মি, ভূমিজরাও  পাশাপাশি বসবাস করেন । প্রত্যেকেই দৈনন্দিন জীবন অভিজ্ঞতা নিজস্ব সাংস্কৃতিক আচার - আচরনের মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করলেও  এদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড কৃষিকেন্দ্রিক হওয়ায় সহজাত ভাবেই সংস্কৃতির আদান-প্রদান ঘটে গেছে অজান্তেই কিছুটা প্রয়োজনে।



 এরকমই একটি কৃষিকেন্দ্রিক উৎসব হল 'বাঁদনা' বা 'বাঁধনা' পরব। বাঁধনা শব্দটির অর্থ হল বন্ধন। মূলত পাকা ধান ঘরে তোলার প্রাক্কালে কৃষিজমির অন্যতম কান্ডারী গো - সম্পদের অর্চনা এই অনুষ্ঠানের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। কালিপুজোর রাত থেকে শুরু হয় অহিরা গান বা গো- জাগান । ধামসা, মাদল, বাঁশি সহযোগে গ্ৰামের কৃষিজীবি সমাজ অহিরা গানে মেতে ওঠেন। পরের দিন সকাল থেকে উঠোন গোবর দ্বারা পরিমার্জন করে একধরনের বনলতা ও চালের গোলায় পিটুলি গুলে সারা উঠোন আল্পনা দেওয়া হয়। এদিন বিকেল বেলা গোয়ালে বা উঠোনে গরুগুলিকে মাঠ থেকে তুলে আনা ধানশীষ মুকুটের মত পরিয়ে দেওয়া হয়, মাঠ থেকে কেটে আনা ঘাস খেতে দেওয়া হয়, পায়ে ঢালা হয় হলুদ জল, গায়ে গিরিমাটির ছাপ। যেন পুনর্বার  লক্ষ্মী আগমনের সূচনা করা হয় এই গো- বন্ধন বা গোরুর বিয়ের মধ্য দিয়ে। একদিকে বিবাহের মধ্য দিয়ে গো- সম্পদ বৃদ্ধির কামনা অপরদিকে বাঁধনা বা বন্ধনের মধ্যে চঞ্চলা লক্ষ্মীকে বেঁধে রাখার প্রয়াস দেখা যায় এই রীতিনীতির মাধ্যমে।এদিন থেকে  রাঢ়বাংলার পিঠে তৈরীর (বিশেষত সেদ্ধ পিঠে যা গড়গড়া নামে পরিচিত) সূচনা হয়, চলে সরস্বতী পুজো পর্যন্ত। এসময় তিনদিন গরুকে বিশ্রামে রাখা হয় এবং মাঠ থেকে ঘাস কেটে এনে বাড়িতে খাওয়ানো হয়। পরের দিন ভাতৃদ্বিতীয়া, এদিন অথবা গ্ৰাম বিশেষে এর পরের দিন বাঁদনার শেষ অনুষ্ঠান গরুখুঁটা পালিত হয়। এদিন বিকেল থেকে বলিষ্ঠ পশুগুলিকে শাল খুঁটি অভাবে বেশ শক্তপোক্ত খুঁটির সঙ্গে বাঁধা হয়। সমানে বাজতে থাকে ধামসা - মাদল, হতে থাকে লম্ফঝম্প দিয়ে নাচ আর চিৎকার, সেইসঙ্গে দোহার ধরে গান, আর গরু বা খুঁটিতে বাঁধা কাড়া বা মোষগুলির সামনে  নাড়া হয় পশুর চামড়া, তাকে ক্রমাগত উত্যক্ত করে তোলা হয় যাতে সে গুঁতো মারতে তেড়ে আসে। কোনো কোনো সময়  গুঁতোর চোটে সামনের মানুষজনও আছাড় খায়, কখনো খুঁটি ছিঁড়তেও দেখা যায়।


মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এটিকে অমানবিক বলে মনে হলেও অনুসন্ধান করলে উঠে আসে অন্য এক চিত্র। জঙ্গল অধ্যুষিত রাঢ় বাংলায় বাড়ি আর জঙ্গল পাশাপাশি অবস্থিত। মানভূম অংশের এই অঞ্চলে এখনো বুনো হাতি, ময়াল, পাইথন, হায়না, বুনো শুয়োর, নেকড়ের দেখা হামেশাই মেলে। অতএব , সহজেই অনুমেয় আরো প্রাচীনকালে এখানে বাঘ- ভাল্লুকের উৎপাত হামেশাই ঘটতো, শীতের সূচনায় গ্ৰামীন মানুষ সন্ধ্যে হতেই আশ্রয় নিতো কুঁড়ের ভিতরে, অথচ গবাদি পশু গুলি পড়ে থাকতো ফাঁকায়। পাশেই জঙ্গল, তাই ফাঁকা জায়গায় বাঁধা গো সম্পদ যাতে নিজেদের রক্ষা করতে পারে, অথবা পাড়া জাগাতে বা মানুষজনকে সচেতন করতে ব্যবহৃত ধামসা- মাদলের শব্দে যাতে বিভ্রান্ত হয়ে না পড়ে সেই চিন্তা থেকেই এই 'গরু খুঁটা বা কাড়া খুঁটা'উৎসবের সূচনা। এ অনুষ্ঠান থেকে তাদের গবাদি পশুদের রক্ষার চিন্তা ও ভালোবাসা প্রকাশ পায়। এ যেন সন্তানকে আত্মরক্ষার কৌশল শেখানোর এক অভিনব প্রয়াস যা উৎসবের রূপকে ধরা দেয় রাঢ়বঙ্গে।


  

Saturday, November 6, 2021

বাঁধনা পরব

       গো বাঁধনা / জামাই বাঁধনা





রাঢ়বঙ্গে হিমেল শিশিরে শুরু হয়ে গেল শীতের আগমনি গান, বাঁধনা পরব তার মুখ বন্ধন  করে দিল। মাঠে মাঠে সোনালি মধুমালতি সুবাস ছড়াচ্ছে এবার শুধু ঘরে আনার পালা। কৃষিজমির চাষবিন্দুতে যারা দাঁড়িয়ে আছে সেই গো সেবার মধ্যে দিয়েই ধন্যবাদ জানায় কৃষককুল। গতকাল গিয়েছে শক্তি রুপিনীর  আরাধনা, গ্ৰামে গ্ৰামে বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয় কুটুম্বে মুখরিত, কাল ভাতৃদ্বিতীয়া, এই মাঝের দিনটি বাঁকুড়া, পুরুলিয়া অঞ্চল বাঁধনা পরবে মেতে ওঠে, শস্যভূমিকে প্রনাম জানায়, বাড়ির নিকোনো মাটির উঠোন চালগোলা আর বনজ পাতার মিশ্রনে গোলা পিটুলি দ্বারা চিত্রায়িত করে, বিকেল হলে গোরুগুলিকে স্নান করিয়ে , বনলতা আর তেল সিঁদুর মাখিয়ে, পিঠ গিরিমাটি বা আলতার ছাপ দিয়ে রাঙিয়ে তোলা হয় , তারপর তাদের বিয়ে দেওয়া হয় , যাতে গো সম্পদ বৃদ্ধি পায় তারই কামনা করা হয়। যেহেতু গ্ৰামজীবনের অর্থনীতিতে কৃষিই মেরুদন্ড তাই টুসুর প্রাক্কালে বাঁধনা পরব কৃষি উৎসবের সূচনা ঘটায়। সকাল থেকেই এদিন গ্ৰামে গ্ৰামে উৎসবের আবহে পাড়ায় ঘুরে ঘুরে নাচ গান  শুরু হয়ে যায় । ফসল কাটার সময় এসেছে, এতদিনের পরিশ্রমের পর যেন একটু বিশ্রাম, তাই গো - বাঁধনা।


এদিকে পশ্চিম মেদিনীপুর অঞ্চলে আজ পালিত হয় 'জামাই ফোঁটা'। অনেকেই মজা করে গান করেন - গরু বাঁধো খুঁটাতে

             জামাই বাঁধো খুঁটাতে

এভাবেই মোটামুটি আজ থেকেই শুরু হয়ে গেল রাঢ় বাংলার পরব, সেইসঙ্গে পিঠা পরব। আজকে রাত্রি বেলা পুরভরা সেদ্ধ পিঠে বাড়ি বাড়ি তৈরী হবে, চলতি ভাষায় 'গড়গড়া পিঠা', চলবে সরস্বতী পূজো পর্যন্ত। তারপর আর কোনোভাবেই এই পিঠে আর তৈরি হবে না। আসলে গ্ৰামীন মানুষ জানে যে এরপর গরম পড়ে গেলে পিঠে হজমে সহায়ক হয় না, আর সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এই নিয়ম। তাই হিমেল স্পর্শে আজ থেকেই শুরু হয়ে গেল বাড়ি বাড়ি পিঠে পরবের সূচনা।


গ্ৰামবাংলার এই আন্তরিক উৎসব বেঁচে থাক, বেঁচে থাক গ্ৰামীন সমাজ, এই উৎসব গুলির মধ্যে দিয়েই আমরা মাটি খুঁজে পাই, শিকড় খুঁজে পাই, লক্ষ্মীর পদধ্বনীর শব্দ পাই মধুমালতির শিরশিরানি গন্ধে। নাক ভরে নিঃশ্বাস নিই, দুর থেকে আসছে শাঁখের আওয়াজ, গরুর বিয়ে হচ্ছে, ক্ষেতের উপর উড়ে যাচ্ছে একটা পেঁচা, চাষা জীবন উঠোনে মাথা ঠেকাচ্ছে, কাঠের উনুন থেকে উবে আসছে গড়গড়ে পিঠের সুবাস। টুসু আসছে, ধান্যলক্ষ্মী উঠোন ভরাবে তারই প্রস্তুতি চলছে, আটচালায় হাত পা ছড়িয়ে মশগুল চাষা জীবন। উৎসবের শেষ নয়, উৎসবের শুরু।

           

                      ‌অর্পিতা


বাড়া বা বাড়ানো

 বাড়া বা বাড়ানো


নৃতত্ত্বের বিচারে রাঢ় বাংলার প্রাচীনতম অধিবাসীদের মুলত আদি অস্ট্রেলিয় বা প্রোটো  অস্ট্রেলিয় নরগোষ্ঠীরই সর্বাধিক সংমিশ্রণ  ঘটেছে‌। হিন্দু সমাজের তথাকথিত অন্ত্যজ বা তপশীলিভুক্ত জাতিসমূহের মধ্যে বাগদি, ডোম, মাল ,মুচি, বাউরী ইত্যাদি। এই নৃতাত্ত্বিক বনিয়াদটি গড়ে উঠেছে মূলত আদি অস্ট্রেলীয় উপাদান নিয়ে , আজও তাই এদের মধ্যে আদি অস্ট্রেলিয়া উপাদান যথেষ্ট বিদ্যমান। নৃ- তাত্বিক উপাদান আদি অস্ট্রেলীয় খুব স্বল্প পরিমাণে দ্রাবিড় ঐতিহ্য  এই দুই সমন্বয় এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। অতএব এরা বহিরাগত জাতি নয় , আমাদের দেশের আদিম অধিবাসী।



বর্তমানে বাঁকুড়া জেলায় বাউরী উপজাতির  আনুমানিক সংখ্যা প্রায় 4 লাখ এর কাছাকাছি। মূলত শালতোড়া মেজিয়া বড়জোড়া, গঙ্গাজলঘাটি, ছাতনা ,বাঁকুড়া খাতড়া, সিমলাপাল ,ওন্দা এই এগারটি থানাতে সারা জেলার দুই তৃতীয়াংশ মানুষ বাস করে। 'বাউরী' শব্দটির বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার হতেও দেখা যায় - বাতাস ও মন শব্দের সঙ্গে । বাউরী শব্দের প্রকৃত অর্থ আমরা পাই যাযাবর অর্থাৎ অনুমেয় যে সুদূর অতীতে এরা যাযাবর ছিলেন।



কার্তিক অমাবস্যায় যখন সমগ্ৰ ভারতবর্ষ দীপাবলীর আলোকমালায় সসজ্জিত হয়ে উঠেছে সেই সময় রাঢ় বাংলার বাউরী তপশীলিজাতি সম্প্রদায় পালন করল তাদের বাড়া বা বাড়ানো অনুষ্ঠান। কালীপুজোর দিন এই সম্প্রদায় তাদের প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তাদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এদিন সকালে স্নান করে উপোস থেকে , কাঁচা জামাকাপড়ে শুদ্ধ হয়ে,নতুন মাটির খোলায় রান্না চাপানো হয়।। বাজারে যত রকম নতুন সবজি, বিশেষত শীতের সবজি বাজারে আমদানি হয় সেই সব দিয়ে নয় রকম তরকারী মাংস ও বিউলির ডাল রান্না করা হয়। পুকুর থেকে তুলে আনা হয় শালুক পাতা ও উড়ু ধান( পুকুরের জলেই জন্মানো একজাতীয় ঘাস থেকে প্রাপ্ত দানা) ,  ঘরের ভিতর পরিস্কার করে আলপনা দেওয়া হয় এবং চালের গুঁড়ো সেদ্ধ করে নটি ঘিয়ের বা তেলের প্রদীপ ও ধুপ জ্বালানো হয়।তিনটি বা পাঁচটি শালুক পাতার চারদিক উড়ুধানের শিস দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়। এরপর নয়টি বা ষোলোটি পিন্ড যথাক্রমে তিনবার করে দিয়ে পিন্ড তৈরী করেন বর্তমান গৃহকর্তা, তারপর উপোসরত বাড়ির অন্যান্যরা পূর্বপুরুষদের আত্মার উদ্দেশ্যে ভোগ নিবেদন করেন, এদিন  মনে করা হয়ে  থাকে যে, পূর্বপুরুষেরা নেমে আসেন এই নয় তরকারী ভোগের পিন্ড গ্ৰহন করতে, এবং পরিবারের উপর কৃপা বজায় রাখেন। এজন্য বিধবা স্ত্রীলোক স্বামীর উদ্দেশ্যে, সন্তানেরা পিতার উদ্দেশ্যে এই পিন্ড বাড়িয়ে দেন। কাজ সম্পন্ন হলে সমস্ত জায়গা জল ঢেলে পরিস্কার করে নিকটবর্তী জলাশয়ে গিয়ে বিসর্জন দিয়ে আসা হয়,এরপর এদিন পরিবারের সবাই খাদ্যগ্ৰহন করেন। পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে এই স্মৃতিতর্পণ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্যই এর নাম বাড়া বা বাড়ানো। 


ঋন স্বীকার : 

ডঃ বিধান মুখোপাধ্যায়, বাউরী সম্প্রদায়ের উৎপত্তির ইতিহাস ও ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

সমীক্ষাস্থল:  খাতড়া



Friday, November 5, 2021

আলোচনা : কাঁদো নদী কাঁদো, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ

 প্রসঙ্গ : কাঁদো নদী কাঁদো

           সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ


            অর্পিতা চৌধুরী



সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বাংলাদেশের সাহিত্যে অন্যতম প্রথম সারির লেখক। বাংলা সাহিত্যে ‌অস্তিত্ববাদের পরিচায়ক এবং সাহিত্যের মাধ্যমে ধর্মীয় ও সামাজিক গোঁড়ামির দিকে আঙ্গুল তোলার অগ্ৰদূত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। বাইরে আপাদমস্তক সাহেবিআনা অথচ ভেতরে বাঙালীয়ানায় ভরপুর মানুষটির ইসলামী মূল্যবোধ ও মুসলিম শিষ্টাচারের সঙ্গে হিন্দু- মুসলমানের সমন্বয়ধর্মী খাঁটি বাঙালীয়ানার কোনো বিরোধ ছিল না। তাঁর সাহিত্যে মানবজীবনের আধ্যাত্মিক অযৌক্তিকতা বা Metaphysical Absurdity বা এর সাথে সামাজিক প্রতিচিত্রও উঠে এসেছে। এমনকি তার উপন্যাসে ব্যক্তি ও সমাজ একে অপরের পরিপূরক হয়ে চেতনাপ্রবাহমূলক রীতির ধারায় এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। তাঁর লেখাতে এসেছে ধর্মীয় গোঁড়ামির বেড়াজালে জড়ানো অধঃপতিত সামাজিক জীবন, এসেছে মানুষের জীবন জিজ্ঞাসা, এসেছে কঠিন সময়ের ঘূর্ণিপাকে হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক মানব জীবন ও মানবীয় আবেগের কথা।


সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহের রচনার প্রেরনা বা উৎস হিসেবে উত্তমর্ণ যে সব পূর্বসূরির উল্লেখ করা হয় তাদের মধ্যে আলজেরীয় জাত ফরাসী সাহিত্যিক আলবেয়ার কাম্যু অন্যতম। তাঁর ' কাঁদো নদী কাঁদো' উপন্যাসটিতে কাম্যুর 'The plague' গল্পটির প্রভাব আছে বলে মনে করা হয়। জীবনের কিমিতিবাদ স্বভাব ও আত্মহত্যার প্রসঙ্গ এই দুই লেখকের উপন্যাসেই লিপিবদ্ধ হয়েছে। ওয়ালীউল্লাহের 'কাঁদো নদী কাঁদো' উপন্যাসটিতে ধীরে ধীরে একটি জীবন্ত চলন্ত নদী মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আর নদীপাড় আশ্রিত মানুষগুলোও ধীরে ধীরে তাদের জীবনের চঞ্চলতা হারিয়ে শ্লথ ও গতিহীন হয়ে পড়ছে আর সমস্ত কিছু ছাপিয়ে নদী যেন নারী হয়ে উঠে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে। একটা মফস্বলীয় জীবন্ত গঞ্জ ধীরে ধীরে রিক্ত, শূন্য হতে শুরু করে। যে নদীকে নিয়েই ছিল চঞ্চলতা, ধারাবাহিকতা, বাইরের সঙ্গে মসৃন যোগাযোগ সেই বহির্বিশ্বের অস্তিত্ব ধীরে ধীরে লোপ পায় কুমুরডাঙ্গার কাছে।


এই  উপন্যাসটিতে সংলাপ অংশের পরিমাণ বেশ কম, কারন এই উপন্যাসের বাঁধুনি বা গঠন কৌশল নির্মান সম্বন্ধে লেখকের অন্যরকম অভিপ্রায় ছিল। একদিকে চাচাতো বোন খাদেজার আত্মহত্যার দায়ভাগ কল্পনার কারন হিসেবে এক অপরাধ মনস্ক মানসিকতায় দীর্ন ক্ষতবিক্ষত ব্যক্তির নিজস্ব কথোপকথন। অপরদিকে বহির্জগতের সঙ্গে সবচেয়ে সহজ মসৃন পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কাব্যাকুল মনস্তত্ব। সমগ্ৰ উপন্যাসটিতে দুজন কথকের সন্ধান পাওয়া যায় - 'আমি' বলে এক ব্যক্তি, যে মুহম্মদ মুস্তফার কথা বলে চলে,  সম্পর্কে মহম্মদ মুস্তফার চাচাতো ভাই। আর ঐ ষ্টীমারেরই যাত্রী তবারক ভুঁইয়া, যার মাধ্যমে কুমুরডাঙ্গা শহরের শারীরিক, মানসিক পরিবর্তনের গল্প শোনা যায়। এই 'আমি' নামক চরিত্রটি পর্যায়ক্রমে একবার তবারকের আচরন, কথাবার্তা, বিবরন বিশ্বস্ত ভাবে লিপিবদ্ধ করে অপরদিকে মহম্মদ মুস্তাফার স্মৃতি আখ্যান বিবৃত করতে থাকে।


উপন্যাসটির আখ্যানকাল মাত্র একদিনের ষ্টীমারযাত্রা, অথচ এই একদিন সময়কালকে লেখক ঘটনাক্রম পরম্পরায় ও দুজন কথকের অন্তরালে এমন ভাবে সাজিয়েছেন যে পাঠক যত গভীরে প্রবেশ করবে ততই যেন কুমুরডাঙ্গার জীবন, যাপন, চঞ্চলতা ধীরে ধীরে মৃত্যু পরিনতি নির্মম রূপ নেবে। একটি আস্ত জলজ্যান্ত নদীর ধীরে ধীরে মৃত্যুর মোহনায় দাঁড়িয়ে থাকা অথবা কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়ার মধ্যে অতিপ্রাকৃতের মর্মরধ্বনি যত না শুনতে পাই তার থেকেও এক ভয়ংকর নির্মম পরিনতির প্রহর যেন ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসছে তারই পদচারনা হতে থাকে সমগ্ৰ উপন্যাস জুড়ে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বাঁধুনির গুনে লেখক,পাঠক মনে একটা বিস্ময় জিজ্ঞাসা জাগিয়ে রাখতে সক্ষম হন।


ঘটনাক্রম শুরু হয় দ্বিপ্রহরে ষ্টিমারের ডেকের উপর থেকে। প্রথম পৃষ্ঠা থেকেই অনুমান ভিত্তিক তবারক ভুঁইয়ার নামহীন  পরিচয় লেখক দিতে থাকেন চেহারা বর্ণনায়। বয়স চল্লিশ বা কিছু বেশি, গায়ের ফর্সা রঙ পুড়ে মলিন, পরনে বহু পুরাতন, বহু ব্যবহৃত কিন্তু পরিস্কার পরিচ্ছন্ন জামাকাপড় , ক্ষয়াটে জুতো। এরপর ধীরে ধীরে  'আমি' নামক বক্তাটি এই তবরেজ মিঞার  হাতে গল্পের চাবিকাঠি তুলে দেন তবে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এই ব্যক্তির পরিচয় প্রসঙ্গে একটা সংশয় সূচক প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে রাখেন। ষ্টিমার ঘাটের টিকিট কেরানী তবরেজ ভুঁইয়ার  সাথে যে কুমুরডাঙ্গার হাকিম মুহম্মদ মুস্তফার ঘনিষ্টতা ছিল তা ধীরে ধীরে জানা যায়।


মানুষ যেমন তার পারিবারিক ভিত্তিভূমিকে অস্বীকার বা অতিক্রম করতে পারে না তেমনি মুহম্মদ মুস্তফাও তার পারিবারিক গন্ডী, পূর্ব জীবন, বাবা খেদমতুল্লার অতীত, মা আমেনা খাতুনের দুঃখ সমস্ত অতিক্রম করে এলেও তার শান্ত , গম্ভীর, নিরুত্তাপ, বহিরাঙ্গিক রূপটি যেন সেই ছেলেবেলাকার নির্মম ইতিহাসের সংগ্ৰামকে মনে পড়ায়। ছেলেবেলার অতীত জীবনকে অতিক্রম করার জন্যই যেন মুস্তফা তার চরিত্র কে খোলসের মধ্যে গুটিয়ে নিয়ে সম্পূর্ণ অন্য মানুষে রূপান্তরিত হয়।


কুমুরডাঙ্গার বাকাল নদীটি ধীরে ধীরে চড়া পড়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে, ষ্টীমার চলাচলের অনুপযোগী হয়ে ওঠে। ষ্টীমার চলাচল বন্ধ, ঘোষনার সাথে সাথে যেন এই প্রায় শহরটিরও মৃত্যুদন্ড ঘোষনা হয়ে যায়। হঠাৎ করেই যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে শহরটি। উকিল কাফিলউদ্দিনের ব্যর্থ চেষ্টা, ডাক্তার বোরহানউদ্দিনের মত অসংখ্য মানুষ প্রহর গোনে এক অজানা আশংকায়। আচমকাই এক মানসিক ব্যাধির উৎপত্তি হয়, যেদিন ঘাট থেকে পুরনো ষ্টিমারটি যেটি ভাসমান টিকিটঘর, বা বাসস্থান হিসেবে পরিচিত ছিল সেটি যখন  নিয়ে যাওয়া হয় তখন যেটুকু আশা ছিল ষ্টিমার চালু হওয়ার সেটুকুও অন্তর্হিত হয়।খতিব মিঞা তার ভাসমান ফ্ল্যাটের বাসস্থান ছেড়ে এই প্রথম ডাঙ্গায় ওঠার কথা চিন্তা করে, যেন জলজ ভাসমান জীবন ছেড়ে শিকড় গাড়ার চেষ্টা। এতদিন মাটির সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, কুমুরডাঙ্গায় থেকেও ননএনটিটি, তা ঘোচাতে উঠে পড়ে লাগতে হয়। আর এই ভাসমান ফ্ল্যাটটি অদৃশ্য হওয়ার সাথে একটা অদৃশ্য শিলমোহর বসিয়ে যায়, শুরু হয় এক অদৃশ্য রোগ। মোক্তার মোসলেহউদ্দিনের মেয়ে, মাষ্টারনি সাকিলা খাতুন হঠাৎ করেই এক বিচিত্র নারী কান্না শুনতে পায়, সেই শুরু, এরপর ধীরে ধীরে গন হিষ্টিরিয়ার মত প্রায় গোটা গ্ৰামের মানুষ এই কান্না শুনতে আরম্ভ করে, এক অজানা আশঙ্কায় নিজেদের মূল্যবান সম্পত্তি বাকাল নদীতে বিসর্জন দিতে শুরু করে আরো দরিদ্র হয়ে পড়ে। উকিল কাফিলউদ্দিনের গ্ৰাম ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে মৃত্যু, বিষয়টিকে আরো ঘনীভূত করে।


মুহম্মদ মুস্তফা, যে একদিন তার সমস্ত সৎচরিত্র দিয়ে পিতার দুশ্চরিত্র ঢাকতে গিয়েছিল, খোদেজার মৃত্যু তাকে ধীরে ধীরে প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে তার মধ্যে জন্মানো অপরাধবোধ মাথা চাড়া দিয়ে খোদেজার প্রতিমূর্তিতে সাকিনা বানু হয়ে সামনে দাঁড়ায়। অথচ সে জানতেও পারে না, খোদেজা তাকে নয় তার চাচাতো ভাইকে ভালোবেসেছিল, অথচ খোদেজার মৃত্যু মুস্তফার এতদিনের কষ্টার্জিত ভিত্তিপ্রস্তরকেই নড়বড়ে করে দেয়।নিঃসঙ্গ, ক্লান্ত আর ভীত করে তোলে মুহম্মদ মুস্তফাকে। তার মনের মধ্যে যে এক নিটোল সংসারের বুভুক্ষুতা ছিল তা তবরেজ ভুঁইয়ার সংসারে সে খুঁজে পায়। দরিদ্রের মত সে  আড়াল থেকে তাদের নিটোল সংসারের চলাফেরা আস্বাদন করতে থাকে এবং আরো নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।


বাকাল নদী ও মহম্মদ মুস্তফা দুজনেই যেন এক ক্লান্ত প্রান, ক্লান্ত শরীর, নিঃসঙ্গ হৃদয়। তারা একে অপরকে অপলকে দেখে আর ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। অবশেষে আত্মহত্যা করে জীবনের সব লেনদেন মিটিয়ে মুক্তির স্বাদ নেয় সে, তার পিতার দুস্কর্মের দেনা শোধ করে।


এদিকে ধীরে ধীরে স্থবির হয় কুমুরডাঙ্গার জীবন। নদী কাঁদে, যেন কুমুরডাঙ্গার দুঃখে কাঁদে, সেই কান্না অতি নির্মমভাবে লেখক গোটা কুমুরডাঙ্গার মধ্যে চারিত করে পরিনতির দিকে নিয়ে যান। চেতনা প্রবাহের বৈশিষ্ট্যের গত ভেঙ্গে শক্তিশালী লেখক ওয়ালীউল্লাহ প্রকৃতি ও জীবনকে অঙ্গাঙ্গী করে সমস্ত মিথকে বর্তমানে রূপান্তরিত করে এক আশ্চর্য ভাঙ্গাগড়া খেলার মনোসমীক্ষন দেখান খুব সাবলীল ভাবে। যেখানে বাকাল হয়ে ওঠে নারী আর কুমুরডাঙ্গা অবক্ষয়িত জনজীবন। যেখানে নদী কাঁদে মানুষের জন্য, মানুষ কাঁদে নদীর জন্য আর পাঠক অনুভব করেন শূন্যতা।



সহায়তা :

১.  সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ : জানা সাহিত্যিকের অজানা        জীবন জীবন , রুবায়েত আমীন, roar. media


২. ষ্টোরী অব সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ : শুভাশীষ 

     চক্রবর্তী, আনন্দবাজার, ১৫ই আগষ্ট ২০২১