Saturday, June 27, 2020

কবিতা ৩০


             
              
               স্বতন্ত্র vs স্বাতন্ত্রতা
         
আমার একটাও সাদা জামা নেই, নেই লাল, নীল এমনকি সবুজ কোনো জামাও ।
আমার কোনো ছাতা নেই, নীল ছাতা, লাল ছাতা সবুজ ছাতা, তাই ছত্রধরও নেই।
আমার কোনো রং নেই, তাই সব রং এক আকাশ।
আসলে আমার কোনো ধর্ম নেই, সবই নিরন্তর, বহমান অনুভূতি।


স্বতন্ত্র  বলে আসলে কোনো শব্দ হয় না,তাই স্বতন্ত্রতাও  মরিচীকা।
তোমাকে কোনো এক অস্তিত্বের তলায় আসতেই হবে, কোনো এক রং, কোনো এক বেশ।
নয়তোো তোমার কোনো দেশ নেই , তোমার কোনো দশ নেই, তোমার কোনো যশও নেই।
আসলে নিজের মত , স্বতন্ত্র বলে কিছু হয় না,
সবই হতে হয় অন্যের মত।
এ বাঁচা কঠিন বাঁচা, তবু মরে যেতে পারে না কেউ।
তাই ছাতা খুঁজে ফেরে, অনন্তর, নিরন্তর।

                অর্পিতা চৌধুরী

Monday, June 22, 2020

কবিতা ২৯



ভোর হবে, কথা আছে


আমাদের কথা হয়নি বহুকাল
অথচ সূর্য আজও অস্তাচলে গেল।

সময় প্রচুর
তবু অন্তিম মূহুর্তে কলম থেমে যায়।

যে জন কাছে রয়
অথচ আশপাশ ফাঁকা।

দেখছি কিন্তু শুনছি না,
শুনছি কিন্তু ভাবছি না,
আসলে তো পকেট ফাঁকা, পকেট ফাঁকা

কথা ছিল-
তারপর পাতাগুলো উড়ে যায়,
উপসংহার।

বৃত্তে বৃত্তে পাক মারছি,
পাকদন্ডী বেয়ে।

হাঁপাচ্ছি, তবু বসছি না,
মাপনযন্ত্র, মাফযন্ত্র।

শিঙ্গি ,মাগুর ,কই খলবল করছিল,
তবু ট্যাংরা টাকেই তুললাম।

এক পৃষ্ঠার দুই মুখ,
অথচ কালি পড়ে না।

দাঁড়িয়ে ছিলাম,
অথচ সরতেই পারলে না।

বলছি দূরে যাও,
শুধু বলছো অন্ধকার, খন্দকার।


                অর্পিতা

Sunday, June 21, 2020

কবিতা ২৮


         এখনও সময় হয়নি


ছায়ার মত ছায়াবাজি যদি ভালোবাসা হয়,
তাহলে অত্যাচার কি?

অনবরত অবহেলা যদি ভালোবাসা হয়,
তাহলে ঘৃনা কি?

ধরবো বললেই পাওয়া যায় কি?
বন্ধ মুঠি খোলা দরজা।

আপোষ আর আফশোস সহজ কথা নয়,
এপিঠ ঘুরলেই দুপিঠ।

অন্তিম কাব্য সর্বোচ্চ বানী !
নাকি তারপরেও কিছু থাকে,
থাকতে হয়।

যাবো বলে ফিরে এলাম,
অথচ চাবি ভুলে গেছি।

অমোঘ বানীর পরেও যে জন থাকে,
সেই টিকে থাকে।

বন্ধ কপাট খোলা জানলা ,
অথচ ঘরভর্তি অন্ধকার।

প্রচুর খেলনা সাজিয়েছি,
অথচ খেলুড়ে মিসিং।

খেলতে খেলতে তাকিয়ে দেখি,
একটিও নেই এ তল্লাটে।

গাছভরা মেঘ আর পাটভাঙ্গা শাড়ি,
দুটোই বর্ষার অন্তিম কাব্য।

চেষ্টা করে যাচ্ছি, করে যাচ্ছি, করেই যাচ্ছি,
অথচ নীট ফল জিরো।

পাল্টাবো বললেই পাল্টানো যায়?
না শুধু ক্ষনগীতির মায়া।

মায়া কাটলেই সূর্য উঠবে,
মায়া তো ভালোবাসারই রূপান্তর।

দরকার বলেই তো ভালোবাসি,
ভালোবাসি বলেই তো দরকারী হই।

পৃথিবী ধরবো বলেই তো ঘরের কোনে আছি,
অথচ তুমি দিগ্বিজয়ে বেরোলে।

যাচ্ছো ? বললে না?
না কি এ পুনরাবৃত্তির পুরাবৃত্ত।

বসে থাকার গান গাইছি,
প্লিজ দৌড়তে বোলোনা।


                         অর্পিতা

Wednesday, June 17, 2020

মধ্যযাম ৯

                    যা দেখি তা লিখি
                              ৯


এখন কেউ কারো বাড়ি দিনমানেও যায় না, তাই সবার আস্তানা এখন শান্ত ছায়াময়, শুধু ভিতরে ভিতরে গুমরায় গর্জনে মেঘের মত।

আজ সারাদিন ঝিপঝিপিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে, আধশুকনো বস্ত্রাদি কখনও নাইছে কখনও কাঁধে চড়ে বাড়ি ঢুকছে একছুটে। বলার মত কিছু নয় ,সাদামাটা গৃহস্থালি। এমনি সময় ,উপরতলা থেকে কানে এল অপরিচিত গলার ক্যাঁচরম্যাঁচর, কৌতূহলে তাকিয়ে দেখি উপর পাড়ার হলা বাউরী উবু হয়ে বসে আছে ঘরের উঠোনে। যে পিচটা আমার আস্তানার সামনে দিয়ে গিয়ে লাল মোরামে গিয়ে শেষ হয়েছে তার ঠিক উত্তর পূব কোনে  হলার সদ্য আধপাকা টিনছাউনির ঘর, সামনে পাকা নালা আবর্জনায় কাঁচা হোয়ে গিয়েছে, ওর বাপের নাম সনাতন বাউরী, ছিপছিপে কেলে বাঁশ পারা চেহারা ছিল তার, নিজে হাতে মনসা গড়ে পুজো করতো সারারাত, তারই ছেলে হলধর বাউরী । সংক্ষেপ গুনে হয়েছে হলা, তা মাঝেমাঝেই কচুটা, মোচাটা দিয়ে যায়, আজ এসেছে কতকগুলো শিঙ্গি মাছ নিয়ে , যার অধিকাংশই মৃত আর দুএকটা অল্পজীবিত তখনও।

তার ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া এক মাথা ঘাড় পর্যন্ত তাল ছিবড়ের মত কুচকুচে চুল থেকে টুপটুপ করে জল ঝরছে, আর আলপথের মত ফাঁকা চাঁদিটা আমার দিকে দন্তবিকশিত করে আছে। হলা আজ এসেছে পুরো ফুল টু হয়ে, মাথা পর্যন্ত ধেনোতে ডুবে।তবে তাতেও তার ব্যবসায়ী জ্ঞান প্রখর টনটনে। এখন সে উবু হয়ে বসে পুঁটুলির শিঙ্গি গুলোকে কাতুকুতু দিয়ে জাগানোর চেষ্টা করছে এবং তার ক্রেতাকে পটানোর চেষ্টায় সর্বতো ভাবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছে। এমনকি শিঙ্গি মাছের গুনাগুণ, কেমন ভাবে ধরেছে , আর কত কষ্ট করে এ বাড়ির জন্যই বয়ে এনেছে সবের বিবরন দিচ্ছে বিস্তৃতভাবে।

তবে ,এত কিছুর পরেও সেয়ানা ক্রেতা রাজি নয়, সে একে নিরামিষাশী তারপর প্রাতেই অন্য সদস্যদের জন্য বরাদ্দ মৎস্য এনেছে, ফলস্বরূপ সে একেবারেই নারাজ। গম্ভীর স্বরে হলাকে যেই জানালেন, তিনি নিরামিষাশী এবং সেদিনের মৎস্য এনেছেন, হলা তার সমস্ত গাম্ভীর্য খানখান করে মাথা ঝুঁকিয়ে তৎক্ষনাৎ বেমালুম বলে বসলো-  তুমি শালা বেদম 'বারাবেউধা' আছ, বলছো নিরামিষ, ইদিকে শালা মাছ লিয়ে বসে আছ।

সাৎ করে কথাটা কানে গিয়ে বাজলো, অর্বাচীনতার তো কালপরিধি ক্ষেত্রবোধ থাকে না, আর অশিক্ষিত , নিম্ন বর্গিও মাতালের তো আরোই দায় নেই কারো কাছে প্রমান দেওয়ার, কারো কাছে নিজেকে উপস্থাপিত করার। এ যেন ছিন্নমাদুরের দুই পিঠ, যার তল বাহির সমান । সমান ছেঁদা, সমান ফুটো যা সারাবার নয় তাই সারানোও  হয় না। তার নেশাতুর মস্তিষ্ক এই মূহুর্তে তাকে জানান দিচ্ছে সে বিক্রেতা হিসেবে আজ অপারগ, তার কুটকুটে হলুদ গেঞ্জি , ঝাঁকড়া চুল বিদ্রোহ করছে  , তার আরো একটু ধেনো খাওয়ার লোভ তাকে বিপাকে ফেলেছে। সে বুঝতে পারছে শিঙ্গি আজ বিকবে না, তবু তার নিখাদ চেষ্টায় জলসেচন মানতে সেও নারাজ।

তার নিজেকে প্রমানের দায় নেই, সৎ সাজার ছক নেই, সংসারের দেনাপাওনা নেই, দায়িত্বও নেই, ভালো সাজার প্রচেষ্টা নেই, জীবন যাপনের পংক্তি নেই শুধু নিজের ধন গচ্ছিত করে একটু ধেনোর জোগাড় করে জগৎ সংসার ভুলে থাকা। জীবনের একমাত্র প্রতিযোগিতায় বাধা হয়ে দাঁড়ালে ভদ্দরলোকেরা তো  'বারাবেউধা' হবেই।


এই যে নশ্বর জীবন, সেখানে মৃত্যু তো খুঁটায় বাঁধা ছাগলদড়ির মত। তার উল্লাসও নাই, উদযাপনও নাই, তাই উৎসবও বড়ই নির্বিবাদী। ইনিয়ে বিনিয়ে কিছুদিন কাঁদে তারপর যে যার স্রোতে বয়ে যায়, সকাল থেকে সর্বৈব ভুলে মূহুর্তের উপলক্ষে এগিয়ে যায়। কোনো প্রতিযোগিতায় না থেকেও মজা দেখে ঝুঁঝকো চুলে, লাল চোখে।
এখানে মৃত্যু কোনো উৎসব নয় মূহূর্তের উপলক্ষ্য মাত্র ঠিক ধেনোর মত।

                       অর্পিতা

Thursday, June 11, 2020

মধ্যযাম - ৮

                   যা দেখি তা লিখি
                                ৮


অন্তিম প্রহর , কৃষ্ণপক্ষের কাস্তে চাঁদও ঘুমের তোড়জোড় করছে। মিশকালো অন্ধকারে ক্ষয়াটে চাঁদের চারপাশের ক্লান্ত হলদে আলোও ক্ষীয়মান , রাতচরারা এখনও ইতিউতি অন্ধকার চিরে শিস দিচ্ছে ইতর প্রানীর সন্ধানে। বাতাসে শিরশিরে ভোরের গন্ধ। আর কিছুক্ষন বাদেই পৃথিবী ডানা মেলবে তাই এখনও পক্ষীবৎ চঞ্চু গুঁজে আছে নিজের পালকে। আরো একটা আলোর দিন শুরু হবার প্রস্তুতি শুরু হচ্ছে গোপনে গোপনে।


ঐ যে দেখা যাচ্ছে একটা বাতায়ন, যার  ফাঁক  দিয়ে  একটা আলোআঁধারী পৃষ্ঠদেশ দৃশ্যমান । সামনের আলো পিছনের আঁধারে ছায়া মন্ডলী রচনা করেছে। তার ঈষৎ প্রলম্বিত ছায়া পড়েছে নাতিলম্বিত রাতের কপালে।লোকটা এখনও জেগে, হামেশাই রাত জাগে। ছায়া রাত্রির কায়া হয়ে ঘুরঘুর করে আনাচেকানাচে। কখনও গার্হস্থ্য মর্জন করে, কখনও ভোরের দখিনার মত বাতাস বওয়ায় নিযুত কোনটিতে। এক আলো দিন থেকে এক রাত্রি অন্ধকার অযুত আগড়ে নিগড় বাঁধতে চায় পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে। থলে ভরে নিয়ে আসে সংসার ,তারপর প্রত্যেকটি কনা উপুড় করে, থলে উল্টে দিয়ে দেখে এতটুকু বাকি রয়ে গেল কিনা সংসারে  দেওয়ার।

বড় সামাজিক সে , তাই চাষ করে , বাস খোঁজে, শিকড় ছড়িয়ে দেয় মাটির পরতে পরতে, যেমনটা গাছেরা জানে খুঁজে নিতে রঙ মাটি ছেনে , জল ছেনে , তারপর ছড়িয়ে দেয় বাকলের খাঁজে খাঁজে মাটির সে রঙ, ধূসরের কোনে। লোকটিও খুঁজে ফেরে সঠিক রঙ, আনাচেকানাচে ধূলিধূসরিত জীবনে। আসলে সে কথা বলতে চায় ,তাই চুপ করে থাকে রাতের প্রতীক্ষায়।

              লোকটা ভালো নেই।

সারাদিন ঘুরে মরে  জীবনে, দ্বীপবিচ্ছিন্নের মত নির্জন, একাকি, মনে মনে। তেল ,নুন সরষের হিসাবের পরেও যে দ্বীপ পায় নাকো খুঁজে, খুঁজে মরে। ছুঁতে পারে হয়তো বা ,তবু মুখ দেখা যায় না কোনোমতেই। তার লুব্ধক হাত হাতছানি দেয় ধ্রুবতারার মত, তার ঠোঁট পৃথিবীর কারুবাসনায় মাখামাখি, অথচ মুখাবয়ব অধরা।

যেখানে মাটির পরে নরম ঘাসের রোমে ঢাকা হয়ে আছে মাটির শরীর সবুজ সবুজ, ঐ তবে ছুঁয়ে থাকা যায়। যেখানে মাটিতে এসে মিশেছে আকাশ, তার কাদাজলে নীলাকাশ মুখ তুলে চায় আয়নার মত। নীল রঙ চলে মাঠে  মাঠে পানসির মত, মন চলে তারও আগে। আকাশ সবুজ  হয় ,বদলের রঙে।
মাঝখানে গুঁড়ি আলপথ, পিচ্ছিল, কর্দমাক্ত, নীচে বহমান ফাঁ লোক। এখানে কোনো ছায়া নেই দুধারে সংকীর্ণ জল নিরন্ত করেছে পথ ।


ইচ্ছে করে মরালী গ্ৰীবায় তিষ্ঠায় ক্ষনকাল, অথবা আদিম কামনাময় নীল স্তনে  মাথা রাখি, জঙ্ঘারামে মুখ রেখে কাঁদি ক্ষনকাল কোলের শিশুর মত, অথবা পায়ের পাতা দুটি ভরি প্রেমজলে , তারপর ফিরে আসি ভাঁজপাঠ করা গানিতিক পৃথিবীতে পঙ্ক ধৌত হয়ে ,নতুন কোরকের মত সাজিয়ে নিতে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ , তবু মুখ তার অধরা।

লোকটি বড় সামাজিক  , তাই সে বড়ই গরীব। অবাঞ্চিত বেড়াকলমিদেরও স্থান দেয় সযতনে । ফনফনিয়ে ঘিরে ধরে তারা নতুন বর্ষায়। নিগড়ের আগড়ে বেঁধেছে নিজেকে ,যথাযথ গন্ডীতে। তবু সে সীতা হতে চায়, তারপর আস্পদ আক্রোশে রাত খুঁড়ে মরে রাতের বুকে, তবু মুখ দেখা যায় না, বুঝতে পারে না ,  কি চায় সে? অথবা কে তাকে চায়?

রাত বাড়ে । মলিন পৃথিবী পরে নির্ঘুম, ক্লান্ত পদ ফিরে যায় গার্হস্থ্য সভ্যতায়। পরিচিত কোন খোঁজে, নিরাপদ ঘুম, কখনও বা পরিচিত  গার্হস্থ্য ভাঁজে মুখ গোঁজে, সুখ খোঁজে অভ্যস্থতায়।

নতুন সকাল হয়, এক আলো দিন, থলেতে থলেতে সংসার সাজায়।তবু মুখ দেখা যায় না, এখনো অধরা সে।

                           অর্পিতা

Sunday, June 7, 2020

মধ্যযাম ৭

                যা দেখি তা লিখি
                           ৭


ঝিঁঝিঁ ডাকা খর দ্বিপ্রহর , পুকুরের চারিপাশ আম ,জাম, জামরুল,কলায় ভর্তি থাকায় বাইরের সঙ্গে বেশ একটা গোপনীয় বেড় সৃষ্টি হয়েছে। সকালে ছাড়া সূয্যিও জলের মুখ দেখতে পায় না ।চারিদিক কেমন তাই শীতল শীতল, স্তব্ধ সুখময় হয়ে থাকে। এই খর প্রহরে স্তব্ধ ঘাটে  ফেলে যাওয়া ভাতের কনায় ঘাই মারছে কালবউস, আর চুনোরা। এ বড় নিজস্ব সময় , হিজলেরা শুয়ে আছে এক কোনে চুপ করে কারও প্রতীক্ষায় ।

খিড়কি দোরের শুনশান  পথ, যে পথ গিয়ে মিশেছে রান্না শালের পিছনে , সেখান দিয়ে কার যেন প্রলম্বিত ছায়া দেখা যায়। এ পথ সাধে না কেউ সচরাচর, শুধু সে ছাড়া, এ যে তার অভিসার পথ।

ঘাট  বাঁধানো সিঁড়ির পৈঠায়  সদ্য জল স্পর্শ করেছে অলক্তরঞ্জিত পা দুখানি নূপুর নিক্বন তুলে । আলতার প্রথম পোচ গুলিয়ে গিয়ে জল এক অযুতবর্ন ধারন করেছে, বাচাল পুঁটিরা ছোটো ছোটো ঘাই মারছে তার অলক্ত অঙ্গুলিতে।

এক নিস্পৃহ ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে কলাবতী ,গায়ে আজ তার সদ্য ঘৃতের বাস। চোখে সেঁটে আছে এক স্থির চিত্র, নাপতেনি বসেছে দাওয়ায় হাঁক পাড়ছে বৌ ঝিদের, এক পিতা তখন নিজ হস্তে রঞ্জিত করছে কন্যার পা, তারপর দুটো আলতা চোবানো  পা দুহাতের জোড়ে নিয়ে মাথায় ঠেকিয়ে বিড়বিড়াচ্ছে - আমার জগজ্জননী।  আজও সেই বিষুত বার ।

তার গম রঙা শরীর দেড় যুগ পরেও নির্মেদ, ঈর্ষক। এ বড় একান্ত সময় তার , কুলুঙ্গি থেকে ঝেড়েঝুড়ে তুলে রাখা মনটা তুলে আনে সে ডুব দেবে বোলে হিজলের সনে।

তার নিতম্ব বেষ্টিত চুল পুকুর ছড়িয়ে আছে,মসৃন বাহু থেকে গড়িয়ে পড়ছে জল, আধডোবা দুর্গা প্রতিমার মত চকচক করছে ঘামতেল, যেন এখুনি গড়িয়ে যাবে পদ্মপাতার মত। তার নাভি স্পর্শ করছে শীতল জল, তার স্তন, মসৃন বাহু, বাহুমূল শুধু জল আর জল, যেন জল সাথে জল হয়ে মিশে যেতে চায় আজ।

মনে বড় সাধ, ঐ যে পুকুরের মাঝখানে বুড়বুড় ওঠে সারাক্ষন সেখানে সে যাবে একদিন , ডুব দিয়ে পার হবে সূক্ষ পথ, দাঁড়াবে  যখার কাছে যক্ষিনী হয়ে । কেন যেন যেতে চায় মন, সব শূন্য ,শূন্য মনে হয় । শুধু যক্ষিনী মন নিরন্তর ঘুরে মরে । সে জলের স্পর্শ পেতে চায়, জলের ঘ্রান পেতে চায়, জলের শব্দ ছুঁতে চায় জল হয়ে শামুকের মতো। হিজলের মত শুয়ে থাকে তাই জলের উপরে অবিন্যস্ত, সময় বয়ে যায়, ঝরে পড়ে দু ফোঁটা স্বেদ ভালোবাসা হয়ে , মরাল গ্ৰীবার মত  ঠোঁট তুলে রাখে অন্তিম সময়ের তরে।

এদিকে ঠিক সেইসময় উত্তর পুবে ঈশান কোনে পোড়ো   আমগাছ  থেকে তাকিয়ে আছে প্রাগৈতিহাসিক জ্বলজ্বলে দুটো চোখ, ধূসর ছিপছিপে শরীর টাকে কালো আমডালের তলা দিয়ে পেঁচিয়ে জলের কিনারে এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ে কলাবতীর আধভাসা শরীর, মুহূর্তে পাক মারে সে, পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে লাফ দেয় উল্টোদিকের ঘেসো ঝোপে , সড়সড় করে চলে যায় , কলাবতী জানতেও পারেনা। যেমনটা, বাস্তুখরিসটা যেদিন পূর্ণিমা রাতে বাগানের  ঢ্যামনার সাথে শঙ্খে মেতেছিল,  কলাবতী তাদের ভালোবাসাবাসি দেখে   সরীসৃপ পা ফেলে  লাছদুয়ারে তালা দিয়েছিল, ঠিক তেমনই।

পৃথিবীর কত যে চোখ, কে জানে! কখনও জল হয়ে, কখনও মীনবৎ, কখনও বা প্রাগৈতিহাসিকের মত প্রাচীন চোখে। শুধু অন্ধ কলাবতী খুঁজে ফেরে তার যখাকে যক্ষিনী হয়ে।

                        অর্পিতা

Thursday, June 4, 2020

মধ্যযাম ৬


                      যা দেখি তা লিখি
                                ৬
পড়ন্ত গোধূলি দুপুর, ফ্যাকাসে রোদ কার্ণিশ বেয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে এখনও, গ্ৰীলের ফাঁক দিয়ে  তার তীর্যক ছায়া  আলপনা এঁকেছে বারান্দার মেঝেতে বার লক্ষ্মীর সরার মত। পিঁপড়েরা মুখে করে সরাচ্ছে সাদা সাদা ডিম দ্রুততায়, বোধহয় জল আসবে। ঈশান কোনে ডিমের মত জেগে উঠেছে খন্ড কালো মেঘ , এখনও তার বুক ভারী হয়নি।  সঞ্চিত রাশি সিঞ্চিত হচ্ছে ধীরে ধীরে ,অদেখা প্রনয়ীর মত ঝরবে বলে।

চারদিক অন্ধকার করে করালবদনা অট্টহাস্য শুরু করেছে, সঙ্গে যোগ দিয়েছে নৃমুন্ডমালিকারা। জোকারের মত ফাটা ব্যাটের ডগায় নাচাচ্ছে ঝোড়ো হাওয়ারা, শুরু করেছে ট্রাপিজের খেলা।

মোমের নরম আলোয় স্নিগ্ধ হয়ে আছে গৃহকোন, এ যেন অযাচিত দীপাবলি।বাইরের ভীষনতায়  মৃদু কম্পমান হলেও ভয়ানক স্থির বর্তিকা টি । ঠিক যেমনটি দেখা যাচ্ছে কদম ফুল মাথা  লোকটিকে বারান্দার এক কোনে ছায়ার মত দেদীপ্যমান। মোমের মৃদু আলোয় তার দীর্ঘ ছায়া  দোদুল্যমান। না, তাকে আর চাষা বলা যায় না। বহুকাল আর সে চাষ করে না, কাদা মাটি ছানে না, বীজতলা রুয়ে না, হাঁক দেয় না ভোর‌ থেকে কামলা মুনিষদের । তবু সে মনেপ্রানে আজও চাষা- সারাক্ষণ বীজতলা খুঁজে ফেরে, বীজ আলুর গন্ধ পায়, ধান পাকার শব্দ শোনে তার আঁতুড়কোনে শুয়ে শুয়ে ।
এখন সে মনে মনে বড় অস্থির, ভাবে নুরের ঘরখানা ঝড়ে উড়ে গেল কিনা, অথবা রামি গয়লার গাভীনটা মাচা চাপা পড়লো কিনা, সেধোর ছিপ নৌকাটা যে বাধা থাকে ঘাটপারাপারের ঘাটে , কি জানি কি হল তার।ভিতরে যত ছটপটায় ততই বলে ধান তো গেলই, তিল শুঁটিও আর একটাও রইলনি মাঠে, সব ধুয়ে গেল। কিছু আর সোরানো গেলনি।

প্রাচীন বৃক্ষ যেমন মাটি আঁকড়াতে চায় চাষা লোকটিও আঁকড়ে ধরতে চায় তার চিরচেনা পৃথিবী। অব্যক্ত যন্ত্রনায়, অনাগত আশংকায় খোঁজ করে তারু, সেধো, নুরু, আলি, খলিলের। শিকড়ের মূলে শুনতে চায় 'ভালো আছি'র গান। উত্তাপে সেঁকতে চায় তার পরিচিত গার্হস্থ্য জীবন, যে জীবন তাকে হাঁকে ডাকে খোঁজ নেয়, তাকে ভালোবাসা দেয়, তার অস্তিত্বের উত্তাপ ছড়ায় ক্লোরোফিলের মত। রোমে রোমে অস্তিত্বের বার্তা ছড়িয়ে বলে 'আমি আছি, আমি এখনও আছি'।

জীবন প্রাসঙ্গিকতা খোজে, তাই খোঁজ করে প্রাচীন  গৃহমন্দিরের, অথবা অপাংক্তেয় উচ্ছে বা ঝিঙ্গে লতের মাচাগুলোর , তাদের ঠিক থাকার বার্তা যেন চলমানতার বার্তা আনবে স্থবির জীবনে।আপ্রাসঙ্গিক মানেই তো মৃত্যু, তাই খুঁজে খুঁজে খোঁজ চলে আনাচে কানাচে, ইতিউতি স্বজন পরিজনের। ভালো থাকার বার্তা শীতের রোদের মত ওম ফেলে প্রাজ্ঞ শরীরে।

এখন তার পাঠের সময়, সাদা ধুতির ফেত্তাটা গায়ে ফেলে তোড়জোড় করে, চন্দন ঘষার আওয়াজ আসে, বাতাসে তখন ধুনোর গন্ধ বইছে ।

                   অর্পিতা চৌধুরী