Friday, May 29, 2020

মধ্যযাম ৫

                  যা দেখি তা লিখি
                                ৫

এখন ভরা জৈষ্ঠ্য , মাছেদের এখনও গর্ভিনি হওয়ার সময় হয় নাই, তাই এখনও তারা জলকেলীতেই ব্যস্ত। গৃহবন্দী মানব মানবী আজ আদিম খেলায় ক্লান্ত, তারাও হাত পা মেলতে চায় নিজের মত করে। প্রথম অনুরাগ ছিল ভালো, আজ সবই বিপর্যস্ত। শুধু এখনও টুনটুনিরা মাতৃত্বভারে ক্লান্ত হয় নাই, কি অসীম জীবনী শক্তি প্রকৃতি ওদের প্রদান করেছে, তাই মাতৃত্বের উপাখ্যানগাথা গাঁথা হয় পরপর, নির্দিষ্ট রীতিতে।সেখানে কোনো সংশয় নাই, লজ্জা নাই, বৈধ অবৈধ নাই, শুধু আছে স্বনির্ভর মাতৃত্বের যাতায়াত। এক হাতে বুনে যাওয়া ফসলের মত বিন্দু বিন্দু করে।

শুধু মানুষ প্রৌঢ়া হলে বুঝি অসামাজিক সমস্ত শব্দের উপর একটা সহজাত অধিকার জন্মায়।লোলচর্ম, লোল বসন, লোল স্তনী হতে হতে লোল জ্বিহাও যেন বয়ঃবৃদ্ধির সাথে সাথে স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী হয়, তখন সে  ভুলেই যায় সেও একদিন মসৃন যুবতী ছিল, তারও এক আকর্ষক কোল ছিল রাত্রিকালের জন্য,  সোহাগের জন্য।

আমার আস্তানার দুয়ারে দীর্ঘকাল যাবৎ ফি রোববার যে বোষ্টম আসতো, তার সাথে দেখা হয় না বহুদিন। এসেই নাকিসুরে বলতো- ভিক্ষা দাও মা নন্দরানী, তোমার গোপালের ভালো হোক।। আর সব প্রশ্নের উত্তরেই বলতো - সঁবই গোবিন্দের ইচ্ছা। ঘরে তার বিকলাঙ্গ শিশু তবূ গোবিন্দের উপর সঁপে দেওয়া জীবন কি জানি কেমন আছে ।

আজকাল এক শাক তুলুনির আবির্ভাব হয়েছে আমার দুয়ারে।  হিঞ্চে, গিমা, কলমী এইসব অবাঞ্ছিত রা থাকে তার কাছে। তার দৌড় দেখে মনে হয় কাঠে আগুন সাজিয়ে জল ফুটতে দিয়ে এসেছে , ঘরে তার অভুক্ত সন্তান। আমায় দেখে সেদিন থতমত খেয়ে থমকে দাঁড়াল, মনে ইতস্তত ভয়, আসলে আমি বোধহয় তার অবাঞ্ছিত শাকের খদ্দের হওয়ার  যোগ্য নই । তারপর ক্রমে ক্রমে সে একটা বোকা খদ্দের পেয়ে খুশীই হল , আসলে শাকের প্রয়োজনীয়তা থেকেও তার আঁচলের কোনে যে শিশু উঁকি দেয় তাকে ফেলতে পারি না, অথচ শাকান্ন জোগাড় করা মাতাকে অহেতুক করুনাও করা যায় না। এ যেন বেশ এক লুকোচুরি খেলা। সেই শিশুর সাথে, সেই মাতার সাথে, নিজের সাথে।

অবশেষে পরিযায়ীরা শিকড়ে ফিরছে। সেদিন হঠাৎ শব্দ পেলাম , দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস কোরলাম - কেমন আছো ঠাকুর? এতদুর থেকে কিভাবে এলে? সেই অমলিন হাসি , সঁবই গোবিন্দের ইচ্ছা ,হেঁটে গ। হেঁটে ! প্রায় ২০-২২ কিমি পথ !
এ কোন পরিযায়ী ! ঘর ছেড়েছে গোবিন্দর ইচ্ছায় নয়, আজ পেটের দায়ে । ভাবতে থাকি, ভাবতেই থাকি , কখন সে চলে গেছে তার ভিক্ষাপাত্র নিয়ে , তবু দাঁড়িয়ে থাকি। কিছু ভাবি কি? কি জানি?  শুধু কানে বাজে -
সঁবই গোবিন্দর ইচ্ছা , তোমার গোপালের ভালো
হোক ।

                 অর্পিতা চৌধুরী

Monday, May 25, 2020

কবিতা ২৬


বদভ্যাসে লিখতে থাকি


ভালোবাসা এক বদঅভ্যাস,
ঠিক নাক খোঁটা বা লুকিয়ে ঘামাচি মারার মত।

তুমি বললে সময় নেই
আমি শুনলাম প্রতীক্ষা করবো।

আমি এরকমই
তবু- - - -।  

যেখানে পরম শক্তি
সেখানেই চরম দুর্বলতা।

অন্য বাসার কাঠিখোঁচা গুলো ঠিক রাখি বলে,
নিজে স্থির থাকি।

তিনটে দেওয়াল নেই বলেই,
ছাদ হতে পারলাম না।

সুখ আর অ-সুখ 
একের পর এক
যেন দিন- রাত্রি।

আমি বলছি ভয় পাও,
তুমি শুনছো কাছে এসো !

একটা সবুজ মাঠ ,
একটা আকাশের সাথে মিশে যাচ্ছে,
ত্রিকোন মাত্রিকে।

মেঘ সেজে বসে আছি ,
বৃষ্টি হবো বলে ।

এত কাছে তাই বড় দূরে,
সর্বাঙ্গে আবেশ লাগে কোনায় কোনায়।

ছুঁতে চাই, ছুঁতেই তো চাই।
তাই উড়িয়ে দি,
প্রতিআস্পর্ধায় ।

মেঘ বলে ডাকো যদি,
বৃষ্টি হয়ে নামি,
চোখের কাজলটিতে
বর্ষা থমথমানি।

দূরে থাকো বলেই কাছে থাকো ,
নাহলে জড়াতে চাই বারেবার,
অবুঝের মত।

হাত বাড়িয়েছি অন্ধকারেই,
অন্ধকার কে ছোঁব বলেই।

আমি ডাকলেই যদি তুমি আসো,
এমন কৃতজ্ঞতা না থাকাই ভালো।
কৃতঘ্ন হও।

শুনছি বলেই বলে যাবে,
আর বলছি বলেই শুনবে,
এ নিশ্চয় বোকা মরমীয়া পাঠ ।

যত দূরেই যাই,
নাকে লাগে শিরিষের পুরুষালী ঘ্রান।
মাথা রাখি সেইখানে,
নোনা নদীপথ যেখানে গিয়ে মিশেছে
জঠরে।

      

Tuesday, May 19, 2020

মধ্যযাম ৪


                    যা দেখি তা‌ লিখি
                                 (৪)

পৃথিবী নির্মল হয়েছে তাই প্রতি পড়ন্ত বিকেলে কালবোশেখী নামে পড়শীদের বৈকালিক আলাপনের মত। ঝোড়ো হাওয়া এসে গুনগুন করে এগাছ ওগাছ , আকাশকোনের ঘন কালো মেঘ চিরে বিদ্যুতবল্লরীর মত ঝটিকাগতিতে‌ একঝাঁক ত্রস্ত বক নীড়ে ফিরে যায় মধ্যবিত্তীয় রীতিতে । জানে তারা এমুহুর্তে কারো ছাঁচতলা মাড়ানো অপরাধ তাই ঘর খুঁজে ফেরে।
জল পড়ছে। অশ্বত্থ গাছটা আর কচি নাই,  তরুন চিকন হয়েছে রোজ জল পেয়ে পেয়ে।

প্রায় এক যুগ ধরে এক সংসারী শালিক তার সংসার সাজিয়েছে ল্যাম্পপোস্টের মাথায় একটু একটু করে। ডালপালা , খড়কুটো, আর মানুষের দেখাদেখি এখান ওখান থেকে ছেঁড়া দড়ি ,কানি কাপড় ,পালক এমনকী নিজের বুড়ো পালক খসিয়ে খসিয়ে শৌখিন করে তুলেছে ঘরটাকে । এদিকে একরত্তি ল্যাম্পপোস্টের মাথাও ক্রমশ শৌখিনতায় ভারী হচ্ছে, ঠিক যেন ফ্ল্যাট বাড়ি। পাতকুয়োরা এখানে ঝামেলা করতে পারে না তাই নিশ্চিন্তে মা যায় কাজে, পোকা টোকা ধরতে । ফিরে এসে আদরে গোবরে কিচমিচ করে ভরিয়ে তোলে সংসার। এক যুগ ধরে সাজিয়েছে সে এ সংসার , ধুলো ঝেড়ে গুছিয়ে, বাগিয়ে ছানা মানুষ করে গড়ে তুলেছে তিলে তিলে।

সেদিনও ঝড় এসেছিল দুপুর থাকতেই , সঙ্গে টিপটিপে বৃষ্টি,আকাশকোনের কালো মেঘে শুরু হল ঝড়ের মাতন , মা শালিক টা তখনও ফিরতে পারেনি বোধহয় ,আজ একটু দুরে গিয়েছিল ঐ বদ্যিপাড়া পর্যন্ত । কোনো ছাঁচতলা পেয়েছে কি? কে জানে ? এদিকে ঝড়ের গুমগুমানি আর জলে ভিজে যাওয়া সংসারটা একমুহূর্তে উড়ে পড়লো নীচে একেবারে তলায় শুয়ে থাকা নেড়িদের কোলে, প্রথমে ভয়ে খ্যাঁক করে খেঁকিয়ে উঠলো নেড়ী, তারপর শুরু হল ভোজ।
তখনও অন্ধকার হয়নি, আকাশ এখনও অভিমানী প্রেমিকার মত মুখ গোমড়া করে আছে আর নওল কিশোরের মতন মেঘ ভাঙ্গা কমলা রোদ রাগ ভাঙ্গাবার তরে  উঁকিঝুঁকি মারছে, জানে আজ অসম্ভব । ধান সিজা হাঁড়ির মত এখনও কালো হয়ে আছে আকাশের এক কোন , বেশ এক বিরহ বিরহ ভাব জমেছে মেঘকোনে।

মা ফিরল, শালিক মা । যেমনটা মানুষে ফেরে শাবক টানে সমস্ত অতিক্রম করে, তবু এক যুগ কাটিয়ে যাওয়া জমি চিনতে পারলো না, মনে মনে ভাবে এই তো এই ছিল , ন্যাড়া জমি হল কি করে, একযুগের সংসার, ঘোরে আর ওড়ে তারপর ন্যাড়া ল্যাম্পপোস্টের মাথায় বসতেই গন্ধ পায় তার নাড়ি ছেঁড়া শাবকদের গায়ের। অস্থির হয়ে উঠে উড়তে যেতেই কচি পালক এসে লাগে তার পায়ে , নীচে আরো কচি পালক তখন বিছানা মেলেছে। হাহাকার করতে গিয়েও গলা ফোটে না, চোখ ফাটে না, কেমন যেন নিস্পৃহ চোখে তাকিয়ে থাকে,যেন এ সব তার ঘটনা নয় তবু সে দর্শক। হঠাৎ সেই কালো মেঘকোনে তাকায় সে তারপর ডানা ঝাপটে উড়ে যায় সেইপানে, কোথায় ?কে জানে? তখন অন্তিম মেঘেরা আর এক পশলার তোড়জোড় করছে , নেড়ি গুলো উঠে শুয়েছে সামনের রোয়াকে।


                                  অর্পিতা চৌধুরী

Wednesday, May 13, 2020

কবিতা ২৫

                   পরিযায়ী

এক সম্পর্ক থেকে আরেক সম্পর্ক,
         তারপর শূন্যতা।
ঠিক যেমন সমের পর আসে ফাঁক,
সেই  ' না তিন তিন না'র  মত
পরিযায়ী হয়ে হেঁটে চলে, অনন্তপথে  অবিরত ।

          কখনও তারা সর্পিল পথ
          কখনো সারিবদ্ধ রেলপথ
অথচ দেখো কেমন পূর্ণিমার চাঁদের মত
রক্তগন্ধে মাখো মাখো হয়ে পড়ে আছে               
                  এখন  নিশ্চিন্ত  চাঁদ ।
          সে জানে গন্তব্য এবার শেষ ,
               আর কোনো ফাঁক নেই
তাই নিশ্চিন্তে জিরিয়ে নেওয়া যাক দুই
                       চারিবার।

          যে চাঁদই দেখো না কেন
গ্ৰহনে বা অভিসারে, হৃদয় তো একটাই।
বারে বারে জন্ম নেয় তাই, মূহূর্ত জন্ম তরে
                 পরিযায়ীর মত
কখনও পড়ে থাকে গ্ৰহন রুটির মত, কখনও  টিপ হয়ে ঝলসায় রমনী কপালে।

        তবু দেখো হৃদয় তো একটাই,
          ঘুরে ঘুরে মরে, দুয়ারে দুয়ারে
               পরিযায়ীর মত ।


                   অর্পিতা চৌধুরী






Friday, May 8, 2020

মধ্যযাম ৩

             যা দেখি তাই লিখি
                            ৩

আজ বুদ্ধপূর্ণিমার থালা  চাঁদটা তে মাঝে মাঝেই মেঘের খেলা চলছে, এ যেন - মেঘে মেঘে এ মুখ শুধুই ঢেকে যায়, কাল আবার রবিঠাকুরের জন্মদিন , লকডাউনেও তার ছাড় নেই, পথে ঘাটে , দুয়ারে ,মাঠে আমরা কড়া নাড়িয়েই যাবো, এখন তো অফুরান সময় ,সেই যেন - জল পড়ে পাতা নড়ে, পাগলা হাতি মাথা নাড়ে র মত আমরাও শিং দুলিয়ে, গাল ফুলিয়ে আড়ং বাঁশি বাজিয়েই যাবো। সবাই যেন প্যাড, গ্লাভস পরে 'waiting for goddo' অথবা সেই অচেনা  'গুরু'র অপেক্ষায় কম্পমান । ছাই চাপা জীবনের এককনা লাল-কমলা- সবুজ আলোচনাই একমাত্র দিনযাপনের ফুলকি ।

আজ আমার বাগানে বোশেখের বেলকুঁড়িতে গাছ ভরে গেছে, ছোটো ছোটো মুক্তোদানা আমাকে ডাকছে আর আমি গাইছি - 'এ মনিহার আমায় নাহি সাজে' । একগাছ ফুল আমাকে মনে করাচ্ছে এক অন্য আখ্যান পত্র।

সেই কোন ছোটো বেলায় রূপনারানের তীরে এক ভিতরখানি গ্ৰাম আম,জাম,জামরুল,সবেদায় পুষ্ট আর কালবোশেখীর এঁটেল কাদায় নিমজ্জিত পায়ে হাঁটা আমার মাতুলালয়, যেখানে রাত ভোর থেকে মানুষ জন ,গাই গরু উঠে পড়ে আর অর্ধচন্দ্রাকৃতি গোবর নাতায় , লাল মেঝের কোলে ভোর থেকে একটা ঝিম ধরা উনুনে কালো মাটির সরায় কালো বালি তে একমুঠ চাল দিলেই ঠিক একগাছ বেলকুঁড়ি মুড়ি হয়ে ফুটে উঠে। কতদিন সেই বেলফুল ফোটাবার শখ আমিও পুষেছি মনে মনে, আজ এই বেলকুঁড়িগুলি যেন সে দৃশ্যপটকেই বিস্তৃত করছে ।

আমি যেন আজো দেখতে পাই, সেই বিস্তৃত রূপনারানের ঘেসো তীর, ডিঙ্গি নৌকা, ভরসন্ধের দুর পারের লাইন দেওয়া আলো, মাঝে মাঝে দুএকটা গারা গাঁথনির সামনে বাঁশ কঞ্চির  বেঞ্চি ,আর জোলো এঁশো বাতাস। ইঁটভাটা আর জোউরে ক্ষয়ে যাওয়া জমির ফাঁকে ফাঁকে এক একটা মেছো ডিঙ্গি রাত ভোরের প্রতীক্ষায় বাঁধা,রাত থেকে শুরু হবে তাদের কাজ ।পাইলেন আর বয়া গুলো ভাটির টানে ডুবছে আর উঠছে, ঠিক যেন কুগলুকানি খেলছে। ঘুম চোখে বাঁধানো পুকুর ঘাটে বসে দেখতে পাচ্ছি আমার নিরক্ষর দাদুর দুই হাতে দুই ইলিশ  আর কাঁধ গামছায় চিংড়া, মুখে বিশ্বজয়ের হাসি।

দাওয়ায় তখন নারকেল কোরার শব্দ , আর ভিতর কোন থেকে  নধর আলুভাজার গন্ধ গরম মুড়িকে রূপসী করছে।তাল গুড়ের গন্ধে ম ম করছে চারদিক।এ যেন কোন কালের কথা, যেখানে সময় ইচ্ছেমত এবাড়ি ও বাড়ি করে সময় কাটায়, এপুকুর ওপুকুর করে উথালপাতাল করে তারপর চোখ লাল করে লাল করকরে ভোলার ঝাল দিয়ে হুপুসহাপুস শব্দ তোলে।

ছোটো বেলাটা কেমন এক অদ্ভুত জীবন,গরমের ছুটি পড়লেই হয় দেশবাড়ি না হয় মামাবাড়ি, ন্যাড়ামাথায় ধানরোঁয়া চুল নিয়ে রেলের জানলায় নাক ঠেকিয়ে, রেল ক্যান্টিনের খোপ থালায় ভাত খেয়ে সে যেন এক সব পেয়েছির দেশ।

জানি, কালও ঘুম ভাঙ্গানোর টিকটিকি টা বিফল হবে, আর দেরীতে ওঠার মাশুল গুলো পঞ্চশর হয়ে ধাওয়া করবে। বেশ লাগে তখন, এই যে চমকানো ধমকানো উপদেশ , আছে বলেই তো মনে হয় শিকড়ে আছি, এই যে উৎকন্ঠা, এই যে বুড়ো বটগাছের মত আগলে রাখা,অহৈতুকি চিন্তা, কিচকিচ এগুলো আছে বলেই তো মনে হয় , ঘরে আছি, ছত্রছায়ায় আছি , বাইরে গাম্ভীর্য রেখে তাই ভিতরে ভিতরে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করি তাদের গজরানো। যেন সব বুঝি রসাতলে গেল এক্ষুনি । আমিও গুটিগুটি পায়ে ঘাড় নিচু করে শুনি, দিনটা ভালো হয়ে যায়।

এই  প্রতীক্ষা, এই উৎকন্ঠা ,এই  টান, এই তো ভালোবাসা, এই তো ঘর। মনে পড়ে যায় আমার বারেন্দায় বাসা করা টুনটুনি টাকে যে আজকাল একবাসাতেই চারবার ডিম পেড়ে পেড়ে বাসাটাকে 'নিশ্চিন্ত ঘর 'বানিয়ে ফেলেছে। সে যেন আমাকে ভরসা করে ছেড়ে যায় তার ঘরখানি , আর আমি আমার ভালোবাসার বারেন্দায় তার কিচকিচানির জন্য অনন্ত প্রতীক্ষা করি।

                    অর্পিতা চৌধুরী

Tuesday, May 5, 2020

মধ্যযাম ২


                  যা দেখি তা লিখি
                              ২
আজ আরো একবার এই মধ্যযামে নিশিডাকের মত এসে দাঁড়িয়েছি আমার আস্তানার ছাতে । পড়শী নেড়ীগুলো আজ কোথাও বেপথুমান। বুড়ো পাহারাদার কিছুক্ষণ আগেই লাঠি ঠুকে নিশ্চিন্ত করে গেছে, তার উপস্থিতি  অতএব 'আল ইজ ওয়েল' ।

তারা খচিত চাদরের উড়নি উড়িয়ে আমি শুয়ে রয়েছি আকাশ চাঁদোয়ার তলে। এ বড় নির্লিপ্ত সময়, এ সময় কারো প্রতীক্ষা করে না , শুধু উদাসীন দৃষ্টিতে আকাশ বারোয়ায় নির্নিমেষ তাকিয়ে থেকে প্রতীক্ষা করে, কিসের কে জানে? এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা প্রতিটি কোনায় কোনায় আলগা শিশিরের মত ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। যেমনটি ছোটবেলায় সকালবেলা ঘাসের ডগা থেকে আঙ্গুলের ডগায় শিশির মাখলে এক অবোধ আনন্দ জাগতো ঠিক তেমনি।

কেমন এক উদাসীন ভালোলাগা এই রাত অবেলার চারপাশে ঘুরঘুর করে মরে। কানে বাজে 'খন্ডন ভব বন্ধন/ জগবন্ধন বন্দি তোমায়' ।অথচ ঐ যে পাছাপেড়ে শাড়ির বুটিদার গায়ে চাপিয়েছি সেই প্রতিটি বুটি যেন শৈশবের কথা কয়, কিশোরী বেলার নলেন‌ জীবনের হাতছানি দেয়। বন্ধন মুক্তি কি এতই সহজ খ্যাপা ,এ শুধু খনিক জীবনের বাচালতা আর সর্বৈব ভন্ডামি ।
কি জানি, এ বুঝি বুড়িয়ে যাবার ডাক বিদায় বেলায় উঁকিঝুঁকি মারে। তবু এ রাত আমাকে আমার করে , আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধে পরম উষ্ণতায়, অসীম নির্লিপ্তিতে জড়িয়ে রাখি বুকে - দু হাত ভরে, বিশাল ব্যাপ্তিতে ক্ষুদ্রতা ঢাকি বিহানের তরে।

আধো ঘুমে আচ্ছন্ন আমি ঘুমজড়ানো মনে আধো শুনতে পাই সেই বুড়ো বৈষ্ণব ফাগুনের ভোরে গেয়ে যাচ্ছে গান-  শুক বলে ওঠো সারি / ঘুমাইও না আর , আমি ভুলে যায় এ ভরা শীতের ফাগুন নয় এ আমমুকুলের বোশেখ ভোর। অর্ধচেতনে লেপ খুঁজে বেড়াই , আর আমার শুক সারি রা স্বপ্নের  মধ্যেই ঘুরঘুর ঘুরপাক খেয়ে মরে আরো একটু ওমের আশায়।
                              অর্পিতা

Saturday, May 2, 2020

মধ্যযাম ১


                  যা দেখি তা লিখি
                             ( ১)

এখন মধ্যরাত, আকাশ ঘন মেঘের চাদর মুড়ি তে নেমে এসেছে ঠিক আমার ঠোঁটের কাছে । একটুকরো লোভী চাঁদ এখানে ওখানে উঁকি ঝুঁকি মারছে । আমার বর্তমান আস্তানার নিস্তব্ধ জানালায় দাঁড়িয়ে আছি মোহাচ্ছন্ন হয়ে। এ সময় যেন নিস্তব্ধ, নিশ্চল, বড়ই একান্ত। এখন আর কোনো পিছুটান নেই, নেই কোনো কর্তব্যকর্ম অথবা ফেলে রাখা কাজের পিছুটান। শুধু সামনে একটা পট আর আমি একমাত্র দর্শক পটুয়া ।

আমার  আস্তানার সামনেই একটা অশ্বত্থ গাছ আমার কিশোরীকাল থেকে দন্ডায়মান, এই কয়দিন আগেও সে নেড়া মাথা সর্বস্ব ত্যাগী সন্ন্যাসীর মত দাঁড়িয়ে ছিল অথচ আজ দেখো ষ্ট্রিট ল্যাম্পের হলদে ক্ষয়াটে আলোয় অল্প বয়সী কচি কিশোরীর মত এক গা কচি পাতায় সেজে উঠে নির্লজ্জের মত এ ওর গায়ে চিরচির ঝিরঝির করছে । দুএকটা পাতা সোনাঝুরীর মত খসখস করে ঝরে পড়ছে ।ওদের বেহায়াপনায় বিরক্ত হয়ে ওরই মাঝে আশ্রিত দুএকটা বক স্বপ্ন দেখে এপাশ ওপাশ করছে আর পড়শী পেঁচা গুলো কর্কশ স্বরে মধ্যযামের নির্ঘণ্ট ঘোষনা করছে ।

সামনের তিনমাথার মোড়ের ষ্ট্রীটল্যাম্পের মাথায় যে শালিকটা বারো মাস তিরিশ কাল বাসা বেঁধেছে সেও এখন শাবক সমেত ঘুমে কাতর । তার তলায় ৭-৮ টা পাড়াতুতো নেড়ী এ ওর ঘাড়ে পড়ে বেকার জীবন যাপন করছে। হঠাৎ একটা তরুন নেড়ী সদ্য সিং গজানো বাছুরের মত  নিজের পৌরুষত্ব জানান দিতে মাতৃকোল থেকে লাফ দিয়ে তারস্বরে চিৎকার করলো , সঙ্গে সঙ্গে তার জেঠা, কাকারাও সঙ্গ দিল শুধু মা সারমেয় আলসেমিতে শুয়ে রইল চোখ বন্ধ করে। কিছুক্ষণ পর বেপাড়া বাজদের তাড়িয়ে এসে আবার মায়ের কোলে , কয়েকজন এদিক ওদিক শুঁকে গোয়েন্দাগিরি করতে লাগলো, অথচ জানতেও পারলো না এই পড়ন্ত রাত্রিতেও কেউ ওদের পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

জানলায় দাঁড়িয়ে ভাবি এই যে অশ্বত্থ গাছ, সামনের আকাশটাকে ঝাপড়ে আড়াল করে রেখেছে তাকে যত দেখি ততই তার পাতার কুঞ্চনে, নাচনে, ঝিরঝির মিরমির শব্দে নদীর কলতান শুনতে পাই। যেন নিশ্চিন্তে কোনো ডিঙ্গি নৌকা বেয়ে চলেছে তার নির্ধারিত ঠিকানায় আদিগন্ত কাল ধরে আলসে গতিতে।সে নিশ্চিত জানে কালরাত্রির পর প্রথম সূর্যের
আলো ঝিলমিলাবে কিশোরীর শ্যাম্পু খোলা চুলের মত

আবার রাতের প্রতীক্ষা। একান্ত সেই রাত, যে রাতের কাঁধে ঠোঁট রেখে ফিসফিসিয়ে কথা বলা যায়, যেখানে কোনো লকডাউন নেই ।
                       অর্পিতা