বাঁদনা পরব আসলে রাঢ় ভূমির কৃষিজীবনের অষ্ট্রিক প্রতিভাস
কার্তিক অমাবস্যাতে যখন সারা ভারতবর্ষ দীপান্বিতার আরাধনায় ব্যস্ত, দক্ষিনবঙ্গের রাঢ়ভূমিতে শুরু হয়ে যায় সেই রাত থেকেই অন্য এক কৃষিকেন্দ্রিক উৎসব বাঁদনা বা বাঁধনা পরব।
চলে তিনদিন ধরে, কোথাও চারদিন ধরে চলে, আবার কোথাও কোথাও রাসপূর্ণিমায় গিয়ে শেষ হয়। মূলত আদিবাসী মানুষজন প্রকৃতি থেকেই তাদের ধর্মের ধারনা গ্ৰহন করেছেন এবং জীবন লব্ধ অভিজ্ঞতাগুলিকে মান্যতা দিয়ে প্রকৃতি পূজাকেই মান্যতা দিয়েছেন। এই অঞ্চলে কোল, ভীল, মুন্ডা, সাঁওতাল, মাহালি, ছাড়াও আরো অন্যান্য জনজাতি কূর্মি, ভূমিজরাও পাশাপাশি বসবাস করেন । প্রত্যেকেই দৈনন্দিন জীবন অভিজ্ঞতা নিজস্ব সাংস্কৃতিক আচার - আচরনের মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করলেও এদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড কৃষিকেন্দ্রিক হওয়ায় সহজাত ভাবেই সংস্কৃতির আদান-প্রদান ঘটে গেছে অজান্তেই কিছুটা প্রয়োজনে।
এরকমই একটি কৃষিকেন্দ্রিক উৎসব হল 'বাঁদনা' বা 'বাঁধনা' পরব। বাঁধনা শব্দটির অর্থ হল বন্ধন। মূলত পাকা ধান ঘরে তোলার প্রাক্কালে কৃষিজমির অন্যতম কান্ডারী গো - সম্পদের অর্চনা এই অনুষ্ঠানের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। কালিপুজোর রাত থেকে শুরু হয় অহিরা গান বা গো- জাগান । ধামসা, মাদল, বাঁশি সহযোগে গ্ৰামের কৃষিজীবি সমাজ অহিরা গানে মেতে ওঠেন। পরের দিন সকাল থেকে উঠোন গোবর দ্বারা পরিমার্জন করে একধরনের বনলতা ও চালের গোলায় পিটুলি গুলে সারা উঠোন আল্পনা দেওয়া হয়। এদিন বিকেল বেলা গোয়ালে বা উঠোনে গরুগুলিকে মাঠ থেকে তুলে আনা ধানশীষ মুকুটের মত পরিয়ে দেওয়া হয়, মাঠ থেকে কেটে আনা ঘাস খেতে দেওয়া হয়, পায়ে ঢালা হয় হলুদ জল, গায়ে গিরিমাটির ছাপ। যেন পুনর্বার লক্ষ্মী আগমনের সূচনা করা হয় এই গো- বন্ধন বা গোরুর বিয়ের মধ্য দিয়ে। একদিকে বিবাহের মধ্য দিয়ে গো- সম্পদ বৃদ্ধির কামনা অপরদিকে বাঁধনা বা বন্ধনের মধ্যে চঞ্চলা লক্ষ্মীকে বেঁধে রাখার প্রয়াস দেখা যায় এই রীতিনীতির মাধ্যমে।এদিন থেকে রাঢ়বাংলার পিঠে তৈরীর (বিশেষত সেদ্ধ পিঠে যা গড়গড়া নামে পরিচিত) সূচনা হয়, চলে সরস্বতী পুজো পর্যন্ত। এসময় তিনদিন গরুকে বিশ্রামে রাখা হয় এবং মাঠ থেকে ঘাস কেটে এনে বাড়িতে খাওয়ানো হয়। পরের দিন ভাতৃদ্বিতীয়া, এদিন অথবা গ্ৰাম বিশেষে এর পরের দিন বাঁদনার শেষ অনুষ্ঠান গরুখুঁটা পালিত হয়। এদিন বিকেল থেকে বলিষ্ঠ পশুগুলিকে শাল খুঁটি অভাবে বেশ শক্তপোক্ত খুঁটির সঙ্গে বাঁধা হয়। সমানে বাজতে থাকে ধামসা - মাদল, হতে থাকে লম্ফঝম্প দিয়ে নাচ আর চিৎকার, সেইসঙ্গে দোহার ধরে গান, আর গরু বা খুঁটিতে বাঁধা কাড়া বা মোষগুলির সামনে নাড়া হয় পশুর চামড়া, তাকে ক্রমাগত উত্যক্ত করে তোলা হয় যাতে সে গুঁতো মারতে তেড়ে আসে। কোনো কোনো সময় গুঁতোর চোটে সামনের মানুষজনও আছাড় খায়, কখনো খুঁটি ছিঁড়তেও দেখা যায়।
মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এটিকে অমানবিক বলে মনে হলেও অনুসন্ধান করলে উঠে আসে অন্য এক চিত্র। জঙ্গল অধ্যুষিত রাঢ় বাংলায় বাড়ি আর জঙ্গল পাশাপাশি অবস্থিত। মানভূম অংশের এই অঞ্চলে এখনো বুনো হাতি, ময়াল, পাইথন, হায়না, বুনো শুয়োর, নেকড়ের দেখা হামেশাই মেলে। অতএব , সহজেই অনুমেয় আরো প্রাচীনকালে এখানে বাঘ- ভাল্লুকের উৎপাত হামেশাই ঘটতো, শীতের সূচনায় গ্ৰামীন মানুষ সন্ধ্যে হতেই আশ্রয় নিতো কুঁড়ের ভিতরে, অথচ গবাদি পশু গুলি পড়ে থাকতো ফাঁকায়। পাশেই জঙ্গল, তাই ফাঁকা জায়গায় বাঁধা গো সম্পদ যাতে নিজেদের রক্ষা করতে পারে, অথবা পাড়া জাগাতে বা মানুষজনকে সচেতন করতে ব্যবহৃত ধামসা- মাদলের শব্দে যাতে বিভ্রান্ত হয়ে না পড়ে সেই চিন্তা থেকেই এই 'গরু খুঁটা বা কাড়া খুঁটা'উৎসবের সূচনা। এ অনুষ্ঠান থেকে তাদের গবাদি পশুদের রক্ষার চিন্তা ও ভালোবাসা প্রকাশ পায়। এ যেন সন্তানকে আত্মরক্ষার কৌশল শেখানোর এক অভিনব প্রয়াস যা উৎসবের রূপকে ধরা দেয় রাঢ়বঙ্গে।
খুব কাছে থেকে দেখা ও বোঝার পরম উপাত্ত এ প্রতিবেদন। সমালোচনার জন্য সমালোচন নয়।
ReplyDelete