Sunday, January 23, 2022

গল্পস্বল্প , নিরামিষেনী

 নিরামিষেনী

অর্পিতা চৌধুরী

 ফুলি বাগদি  মেয়ে হলে কি হবে ,চার ভাইয়ের কোলে এক বোন বলে বড় আদরের। চার ছেলের পর মা মনসার কাছে মানত করে পাওয়া ফুলি, বাপ রামদুলালের জান অন্ত প্রান। পুরো নাম ফুলকুমারী বাগদি, তবে মা মনসার দয়ায় ফুলি বড়ই সুন্দরী, বিশেষত বাগদি সমাজে।কটা কটা ডাগর চোখ, একমাথা চুল, ফরসা রঙ, পাড়ার মেয়ে বৌরা বলে, মা মনসা আঁইছে গো। এ নিয়ে মা রামী বাগদিনীর বেশ চাপা গর্ব আছে। দাদাদের আদর আর বাপের প্রশ্রয়ে ফুলি বেশ জেদী আর রাগী। বাড়ন্ত সাত মুখের সংসারেও ফুলি মোটামুটি যা চায় তাই পায় আর যেটা না পায় তা নিয়ে মাথা কুটে মরে সারাদিন, বাপে আদর করে বলে,' মা আমার মা মনসা গো, রাইগলে যাচাই নাই'। সবচেয়ে সমস্যা বাড়ে যেদিন ঘরে মাছ মাংস না জোটে, নিরামিষ ফুলির দুচক্ষের বিষ, গেঁড়ি গুগলি হলেও তার পাতে চায়, না হলে সেদিন সত্যিই সে মনসা হয়ে ওঠে।


এ হেন ফুলি ধীরে ধীরে কৈশোরে পা দেয় আর ফুলি থেকে ফুলকুমারী হয়ে ওঠে। এক ক্রোশ দুরে স্কুল হওয়ায় অ আ তেই ফুলির লেখাপড়ার সমাপ্তি ঘটে, এদিকে গাঁ ঘরে চন্দ্রকলা বড় হলে পাড়ার লোকের নজর বাড়ে আর বাপ মায়ের দুশ্চিন্তা। রামী তাকে চোখে চোখে রাখে, দিনকাল ভালো না, গাঁয়ের ছেলেদের নজরে পড়তে কতক্ষন , তাই আজকাল ফুলিকে সে ছাগল চরাতেও একা একা শালবনে ছাড়ে না, কিংবা কিছুক্ষন না দেখতে পেলেই  ছেলেদের পাঠায়। মেয়ের রূপের দিকে তাকিয়ে  সে রাতের বেলায় ভয় পায়। ১৪ পার পার ফুলির একঢাল চুল, কটা চোখ,গোরা রঙ, দীঘল বরন ,  মনে মনে মা মনসা কে স্মরন করে সে বলে 'রইকখে কর মা' , ফুলি তখন হয়তো চুনোমাছের বাটি চাঁছছে একমনে। 


রাতের বেলা ক্লান্ত রামদুলালকে চুপিচুপি রামী মনের কথা পাড়ে, ' ইবার তো ছেল্যা দেইখতে হবেক' ? রামদুলালও যে ভাবেনি তা নয়  তবে এখন সে বলে, ' হবে খন '। আসলে  আদরের ফুলিকে গাঁ ঘরে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে নেই তার, তাই সময় পার করে। এদিকে মনসা পুজোতে ফুলিকে দেখে পছন্দ হয়ে যায় ছেলের মেসোর। সম্বন্ধ পাতায় রামদুলালের সাথে, শহরের ছেলে, রঙ মিস্ত্রির কাজ করে, যদিও ঘরে নয় নয় করে অনেকগুলো সদস্য তবে বাগদি ঘরে যত লোক, তত বল। আর ঘর ছাড়াও আরো একটু জমি আছে চাইলে আলাদা ঘর করে থাকতে পারে।


পনেরো পা দিতেই বাপের আদরের ফুলি শহরে এল বড় বৌ হয়ে।  দশজনের সংসার আর শহরের নিম্নবিত্তের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম কানুন বুঝতে বুঝতেই সংসার অনভিজ্ঞ ফুলির মাস ছয়েক কেটে গেল। আগে রাগ করলে বাপ- দাদায় চুনো পুঁটি হলেও ধরে আনতো এখন খাবার দিতে দিতেই অভাবের সংসারে শেষে তার ঝোল ছাড়া কিছুই জোটে না, কিছুক্ষন নাড়াচাড়া করে উঠে পড়ে সে। শাশুড়ি আর ননদেরা মুখ বাঁকিয়ে বলে 'বড়লোকের বিটি'। শুধুমাত্র পরম যখন রাতে দিশী খেয়ে ফেরে আর  লুকিয়ে কাঁকালে গুঁজে শালপাতায়  কাঠিতে মুড়ে কুঁকড়ার ছাঁট নিয়ে আসে, তারপর রাতে সবাই ঘুমোলে তার সামনে ধরে বলে ' খাঁইয়ে লে' সে দিনটায় পরমের ঝাঁঝালো দিশীর গন্ধ ভুরভুর বুকের ভেতর লেপ্টে আয়েশ করে ঘুমোয় ফুলি। 


সংসারযাত্রার নিয়ম-কানুন বুঝতে না বুঝতেই কখন যে এক নতুন জীবন তার শরীরে বাঁসা বাঁধে টের পায় না ফুলি।এখন তার শরীর জুড়ে ক্লান্তি, টগবগে ওঠা ফ্যানের গন্ধে বমি আসে, মাছেও যেন আঁশটে গন্ধ ।শুধু ,মাংসের দুর্ণিবার টান যেন ভিতর থেকে আছাড়ি  পিছাড়ি করে। শাশুড়ি গাল দেয় তবু ফুলির মাংস ছাড়া রুচি হয় না, প্রথম প্রথম পরম ও বাপ হওয়ার আনন্দে লুকিয়ে চুরিয়ে ফুলিকে খাওয়ায়, তবে প্রথম আবেগ কেটে গেলে আর নারী শরীর বিহীন দিন কাটাতে কাটাতে সেও কেমন যেন নিস্পৃহ হয়ে আসে। বৌ এর থেকে মদেই জীবন খুঁজে নেয়। নারী মাংস আর প্রানী মাংস আজ সমার্থক।  শত প্রলোভনেও সাবধানী ফুলি এখন দূরে থাকে পরমের থেকে । 

অবশেষে মা হয়েছে ফুলি, অর্ধাহারে এক অপুষ্ট শিশুর জন্ম দিয়েছে সে। শাশুড়ি মাথায় করাঘাত করে  আর বলে, সব কপালের দোষ, সব মাংস খাওয়ার দোষ । দুমুখে শাপশাপান্ত বাপবাপান্ত করে আর গোলাঘর থেকে মেগে আনা সরষের তেল মাখায় নাতিকে। পরমের মুখ ভার, ছেলে হওয়ার পর থেকে ভাটিতে আনাগোনা আরো বেড়েছে, এদিকে ভাত ভটকায় আর নির্জীব দৃষ্টিতে ফুলি কাঁচা কাঠের জালন গুঁজতে থাকে উনুনে, বোধহয় কাঁচা কাঠের ধোঁয়ায় ফুলির চোখে জল ঝরে।


পাড়ার আটচালায় আজ দুদিন ধরে হরিনাম চলছে। দুদিন ধরে বৈষ্ণব বৈষ্ণবীদের রান্নার জোগাড়ের কাজ করছে ফুলি। দুপুরে কাজ শেষে যখন খেতে বসেছে হঠাৎ বড় বৈষ্ণবী কোথা থেকে এসে এক চামচ গাওয়া ঘি পাতে ফেলে বলে, খাও মা , নইলে গায়ে গত্তি লাগবে কেন। এতদিন বহু লাঞ্ছনায় যে জল ঝরেনি আজ যেন টোকা পড়তেই উষ্ণ প্রসবন বিগলিত হয়। ভাত আর চোখের জল মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।কার যে কি স্বাদ! বেদনা খুঁড়লেই যে দুঃখ ঝরে তা বোধহয় ফুলি ভুলেই গিয়েছিল।


কদিন বৌ কে কাছে না পেয়ে পরম গলা পর্যন্ত মদ গিলে এসেছে কিন্তু  মনে করে শালপাতার ডোঙলায়  ভুঁড়ি চটপটি এনেছে ফুলির জন্য। আজ তার ফুলিকে চায়।ফুলির কাছে পৌঁছতে হলে তার দুর্বলতা সে জানে। মাংসের স্বাদ আর নারীর স্বাদ দুইই বড় প্রবল। রাত বাড়ে, পরমের অস্থিরতা বাড়ে, অথচ ফুলি আসে না, কোলের ছেলে কোলে থাকে। বিরক্ত, নেশাখোর পরম একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। মাংসের চটপটি পাশে পড়ে থাকে, খুপরি ঘরের নিঃশ্বাসে উড়ে ধেনো গন্ধ। ভোর হয়ে আসে , ঘুম চোখে একবার শালপাতা দেখে ফুলি, তারপর পরমের ছেঁড়া বালিশের তলায় মুচকি হেসে চটপটির খালা গুঁজে দেয় ফুলি।


সদ্য স্নাত চুল থেকে জল ঝরে ফুলির। মুখে তার প্রশান্তির আভা। আধভাঙ্গা চোকলা ছাড়া গুটি বসন্তের দাগে ভরা আয়নাটার কোন ধরে যেটুকু দেখা যায় সেটুকু দেখেই যত্নে রসতিলক কাটে সে। পরনে আজ তার ধবধবে কাচা সাদা শাড়ি সাপটা দিয়ে পরা, গলায় তুলসী কাঠির মালা। সদ্যথ্থিত বিস্মিত পরমের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যায় সে। সবে  জাগরন গান শুরু হয়েছে আটচালায়, ভেসে আসছে তারই সুর, রাই জাগো গো, জাগো শ্যামের মনমোহিনী বিনোদিনী রাই। 

সূর্যের ঘুম ভাঙ্গছে। 





সুবিধার্থে

কাঁকাল : কোমর

কুঁকড়া : মুরগী

ভটকায় : টগবগ করে ফোটে







Saturday, January 22, 2022

অবান্তর ৯১ বেঁচে ওঠা

         বেঁচে ওঠা



কথা হয়না, দেখা হয় না,

 কাজে ব্যস্ত রাখি নিজেদের,

বাড়ি থেকে বেরোই না  অতিমারির ভরসায়,

এমনকি অসুস্থ হলে খোঁজ নিই না।

আসলেই  খুব ভালোবাসি ,

তাই খোঁজ অবশ্যম্ভাবী নয়।

মরে যাওয়া সহজ  নয়

অনেক ক্লান্তি জমলে বোধ মরে,

তারপরে মানুষ,


মৃত্যু হলে-

স্মৃতিচেতনায় আবার জীবন্ত হয় ,

বহুদিন পর বিস্মৃত মানুষ আবার জেগে ওঠে

স্মৃতিচারনায়।

 যে মানুষ মৃত ছিল এতদিন,

খোঁজ করা হয়নি বহুকাল,

মৃত্যুর পরে জেগে ওঠে হঠাৎ।

 কত ভালোবাসা ছিল নশ্বর জীবনে, অথবা কত উপকারী,

 সব মনে পড়ে একে একে।


এও তো বাঁচা

জীবন জুড়ে যত্ন, ভালোবাসা সব ঝরে গেলে

মৃতপ্রায় মানুষের দল 

বেঁচে ওঠে মৃত্যু প্রতীক্ষায়।



Monday, January 17, 2022

অবান্তর ৯০ তীর্যকতা

                 তীর্যকতা



কত তীর্যক লিপিমালা গেঁথে নিয়ে লিখতে বসি,

মনে  সারাদিনের শব্দ আনাগোনা

ধরতে গেলে পালিয়ে যায়, পালিয়ে যাওয়া ঘিরে ধরে।

যখনই নালিশ মালা খুলে বসি,

কত কত জড়তা, চোখের সামনে ভিড় করে,

কোন শব্দ সাজালে জুৎসই হবে -

ভাবতে ভাবতে ভুলে যাই,

আসলে ঠিক কি লিখতে চেয়েছিলাম।


কলম খুললেই সব কেমন উবে যেতে চায়,

শব্দ হয়ে যায় শূন্য,

মন হয়ে যায় নরম।

দেরী করে আসা শব্দগুলোকেই ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।


লিখতে চাইলেই ঝাঁঝ কমে গিয়ে,

সব কেমন মোলায়েম হয়ে যায়।

নিজেকেই ভালোবাসতে ইচ্ছে করে,

নরম ঠোঁটের মত।


অবান্তর ৮৯ অনন্য অনুভূতি

   অনন্য  অনুভূতি



ফি রোববার বেড়ে যাওয়া অনুভুতিগুলো নখ কাটার মত সাইজ করে ছেঁটে ফেলবো,

নিয়ম করে আগাছা ছাঁটবো প্রতি রোববার।

তারপর সুন্দর রঙচঙ করে শোপিসের মত সাজিয়ে রাখবো।

নিজে না পারি -

পার্লারে যাবো, সেলফি তুলবো।


বাইরের উঠোনে পিঁড়ি পেতে,হাত পা মেলে। কাঠের উনুনে রগরগে আগুনে ফোটা লাল মাংসের সুবাস ছড়াবে চারদিকে,

পেটের ধুনি জ্বলবে ধিকধিক,

তাজা ফ্যানের গন্ধ ছড়াবে


সদ্য কাটা অনুভূতি গুলি  ঘষেমেজে, আরেকবার ভোঁতা করে নিয়ে ,

কলতলার দিকে এগিয়ে যাবো।


Tuesday, January 11, 2022

অবান্তর ৮৮ এমন যদি হোত

    এমন যদি হোত




অনেক কিছু ইচ্ছে করে,

ঠিক যেমন করে সেদিন করতো,

বৃষ্টি ঝরছে , ঠিক এমনি করেই ,

একটাই বর্ষাতি, অথচ  একা ছাড়বে না,

কাটা মুন্ড হাত পা খোলার মত বর্ষাতিটা ভাগ করে নিয়েছি, আর বৃষ্টিটাও।

তারপর কখনো বা বৃষ্টি এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে ,

পাহাড় থেকে নদীকে, নদী থেকে পাহাড়ে

আষাঢ়স্য প্রথম ঝরনের কালে, অপাংক্তেয় শাল ফুলে সাজিয়ে দিয়েছো খোড়ো ছাউনি,

লজ্জা পাচ্ছে কালিদাস,

পর্দা টাঙিয়েছে  অঝোর বৃষ্টি,

ঠোঁটেও নেমে আসছে বৃষ্টির ছাঁট।


ঠিক সেই সময়,ঝোড়ো কাকের দল ঢুকলো খোড়ো চালায়, 

জোড় শালিকের বেজায় বিরক্তি।

আবার, আবার ছুটে চলা, কখনো একটু ছুঁয়ে, কখনো অঝোর ভিজে।

একজনের গন্তব্য সামনে , আর একজনের দুর, অথচ সবই যেন অবান্তর,

শুধু  ছুটে চলাটাই স্থির ।


সেদিনটা আবার খুব  ছুঁতে ইচ্ছে করছে -

সেই ফ্যাকাসে হাত, ভেজা চোখ, নীরব কথা, অঝোর বোবা বৃষ্টি,

আর  একটা অস্পষ্ট একগুঁয়ে মানুষ।


সমস্ত বিরহকে জয় করেই মিলনেরা জয়ী হয় ঠিক বিরহী অশ্রুর মত।

আবার বৃষ্টি নেমেছে রাতভোর বৃষ্টি,

সব ধুয়ে মুছে নিকোনো উঠোন , 

অথচ ,স্মৃতিরা ঝুল কালি মেখে দাঁড়িয়ে আছে।

ওদের বৃষ্টি লাগে না, ওদের বৃষ্টি হয় না,

কাঠফাটা রোদ্দুরেই ওদের বাস।



আবার বৃষ্টি নামছে, মন কেমনের বৃষ্টি।



Monday, January 10, 2022

অবান্তর ৮৮ ভবিষ্যত

       ভবিষ্যত



আমরা একসাথেই বুড়ো হব

একসাথেই জীর্ন হবে আমাদের সমস্ত মনস্তাপ

এক জীবন ভালোবাসা যে হাতে সাজিয়েছিলে

আর এক সমুদ্র পিপাসা যে আঁচল থেকে চেয়ে নিয়েছিলে,

কখন যে খসে খসে ঝরে ঝরে পড়বে,

 বাড়ি ফিরবো, অথচ  তারা  পৌঁছবে না।

আমরা জানবো না একে অপরের খবর,

তবু খবর খুঁজে চলবো পাতায় পাতায়,

ইজিচেয়ারের কোলে শুয়ে বুঝবো,

সত্বা আছে তাই স্মৃতি আছে,

ভালোবাসা থাকলে মরে যেত।