Thursday, December 31, 2020

অবান্তর ২৫

 


              প্রত্যুত্তর



যদি বলো ভালোবাসি কেন?

তাহলে বলবো ভালোবাসার জন্যই ভালোবাসি।

যদি বলো সরে থাকো কেন?

তাহলেও বলবো কাছে থাকার জন্যই দুরে থাকি।


যদি বলো তাহলে কষ্ট পাও কেন ?

তখনও বলবো, ভালোবাসার জন্যই কষ্ট পাই।

যদি শুধোও তবে এত ঢং কেন ?

উত্তরে বলবো, ঢঙে যে রঙ লাগে , ফাগ রং।



যদি রেগে বল, এত জিদ কেন?

এর একটাই উত্তর, তোমাকে ভালোবাসি বলে।

যদি মুখ ফিরিয়ে বল , অহংকার ভালো নয়,

আমি সহাস্যে বলবো, ও যে তোমার উপহার।



বিস্ময়ে যদি বল, কি করি বলতো  তোমাকে নিয়ে?

আহ্লাদী হয়ে বুকে মুখ লুকিয়ে বলবো,

ভালোবাসো - ভালোবাসো - ভালোবাসো।


অবান্তর ২৪

 

এক জীবন এক ঈশ্বর


ভালোবাসা পেতে পেতে নদীও তখন  নারী  ,
গলতে গলতে হৃদয়ে দাঁড়ের শব্দেরা তখন শব্দহীন,
অথচ মাঝি বিহীন নৌকা তখন মাঝদরিয়ায় ভাসছে, পুবালী নিয়ম মেনে।

ভালোবাসতে বাসতে কখন যে চন্দ্রাবতী কাল ভুলেছে,
ছপাৎ জলে ঢেউ খেলে যায়,
পশ্চিমঘাটের সূর্য তখন রোদ পোহানো বিছানা কাঁথা তুলছে।
অথচ চন্দ্রাবতী তখনও সাঁঝ ঘন্টা সাজাচ্ছে ভাসানবেলার।
হলুদ, সাদা, লাল, সবুজে ভরে যাচ্ছে ডালি,
হৃদঅর্ঘ্য পুষ্পশোভিত।
ভালোবাসতে বাসতে মানুষটাকেই ভুলেছে সে,
আছে শুধু  ঈশ্বরী জীবন।

Monday, December 28, 2020

অবান্তর ২৩

 

আমি তোমার শত্রু নই, মিত্রও নই
তবু  যখন ক্রসেডে বিদ্ধ হও,
অন্তিমেও  হাত পেতে থাকি
আলো খেকো মানুষের মত।


গান্ধারী জীবন ছেড়ে বেরিয়ে আসি,
চক্রবূহ্যের তরে,
ছারখার করে দিতে অক্ষৌহিনী সেনা
তবু ,
ক্রসেডের ভালোবাসা তুমি বুঝিলে না।

Friday, December 25, 2020

অবান্তর ২২

 


                        প্রেমপত্র


আজ আবার নতুন করে একটা প্রেমপত্র লিখতে চাই, একদম নতুন করে  সেই প্রথম দিনের মত।
কমলা রোদে পিঠ বাঁকিয়ে একটা একটা করে সেঁকে নিই অভিমান গুলো,
তারপর ঠোঁট ফুলিয়ে উটের গ্ৰীবার মত ঠোঁটে ঠোঁট রাখতে রাখতে বলি ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি।


মাঝে মাঝে ভাবি সমস্ত দুঃখ  গুলো ঐতোমার ক্লান্ত শার্টের বোতামের মতো যদি একটা একটা করে খুলে দেখাতে পারতাম ,
কিংবা ধরো আদুল গায়ের বুকের কোনে খুনসুটি খেলতে খেলতে সমস্ত অভিমান মেলে ধরতাম।


অথচ ,গান্ধারী জীবন,
অক্ষম ধৃতরাষ্ট্র শুন্যে বিফল পাশা ছোঁড়ে বারংবার,
সঙ্গে অক্ষৌহিনি সেনা
তবু আজ পারিবে না ।


শীতার্ত দিন, চাদরমুড়ির মিথ্যা সংবাদ
দিকে দিকে রটে ,
কুরুক্ষেত্র ছারখার,
তবু সমস্ত মুছে ফেলে একটা একটা করে শিশিরের ঘ্রান চোখ মেলে অন্দরে কন্দরে।


গান্ধারী জীবন ছুঁড়ে ফেলি খোলসের মত,
তারপর পূর্ন রূপে পূর্ণ করে চলি নতুন প্রেমপত্র,
শুরু,নতুন অধ্যায় ।


এ জীবন ভালোবাসি, বাসি কি তা ?
নয়তো বা ,দুঃখ গুলো টেনে টেনে সুখ কেন খুঁজি?
পুরোনো পুঁজির মত ওল্টায় পাল্টায় ধুলো ঝেড়ে সুখ পাই।


তারপর ,
মুখ লুকিয়ে বলি -
তুমি আমার ঈশ্বর হবে, আমি ঈশ্বরী।

Friday, December 18, 2020

অবান্তর ২১

 


        বাজে কথা রাখো এবার


রাখোতো তোমার বাজে কথা,
এবার মেটাও সব রাগ বেরাগ,
অনেক হয়েছে মূর্খতা,
এবার একটা অলৌকিক গল্প শোনাও,
ঠিক যেমন করে কোলে মাথা রেখে আদরেরা উষ্ণতা খোঁজে,
ঠিক তেমন করে চুলে বিলি কেটে কেটে সেই রূপকথার গল্প শোনাও সারারাত।


একটা অলৌকিক ভোর দেখাও,
যাতে সারাদিন রোদ আলো পায়,
সমস্ত দূরত্ব গুলো ঝরে পড়ুক কুয়াশার মত,
ছেলেমানুষী ইচ্ছেগুলো শোনাও।


তারপর অবসর মত একটা একটা করে রং লাগাও তোমার মনের মত,
সব রঙ একসাথে গুলে গেলে দেখো ঠিক আবীর হবে,
লাল আবীর, নীল আবীর, হলুদ আবীর,
মুঠো ভরে কাঁপতে কাঁপতে রাঙিয়ে দেবে এখান ওখান,
তারপর ,ধুয়ে গেলেও  একবিন্দু রয়ে যাবে  ঘন চুলের ভাঁজে প্রেমপত্রের মত।


ছাড়ো তো এসব গল্প,
এসো আবার ঝগড়া শুরু করি আগের মত,
তারপর আবার একসাথে শালপাতা থেকে সেঁয়াকুল  তুলে খাই।
আবার নদীর উপর
এসো, ছলাৎ ছলাৎ খেলি।

Thursday, December 17, 2020

অবান্তর ২০

 

           মস্তিষ্কে পেরেক মারো

প্রশ্রয় দিলেই সন্ত্রস্ত করে ছারখার করবো,
জল, মাটি, আকাশ, বাতাস কাঁপিয়ে তুলে,
বেপরোয়া ইচ্ছেগুলো লাগামছাড়া হবে আবার।
তখন, তখন আবারো দমবন্ধ হয়ে ছটফটাবে, আর কোন খুঁজবে এদিক ওদিক।


তার চেয়ে জোরে, আরো জোরে ,
পেরেক মারো, কফিনে পেরেক মারো,
প্রেতাত্মারা যেন ছিটকে বেরোতে না পারে ।

অবান্তর ১৯

 


                 পৃথিবী রমনী হও

ঋতুবতী হলে পৃথিবী আজও  শীতঘুম ছেড়ে জেগে ওঠে , হলকর্ষনের তরে,
অন্তিম পাটে পড়ন্ত যৌবন রোদ,শুয়ে আছে কাঁথায়-কম্বলে, খাটিয়াতে।
এখনই কুয়াশা চাদর মৃত অস্থি ঢেকে দেবে,
বেলা বয়ে আসে ঘনিষ্ট সন্ধাকালের।


দুচারটে টিপটিপে তারা উঁকিঝুঁকি মারে  পৃথিবী পানে,
নগ্ন বুকে চেয়ে থাকে হাঘরের মত।


অথচ,
ঋতুবতী হলে পৃথিবী রমনী হয় নরমের মত,
আঁজলা করে নিতে হয় কোলে তুলে,
অবোধ জ্যোতিষ্ক আজো তা জানে না।
তাই তারা দূরে রয়, দূর থেকে চেয়ে আজীবন ।


ভালোবাসার অন্তিম মুহূর্তেও তোমার সমস্ত শরীর রমনীকোন ঢেকে থাকে
গোপন অঙ্গের সমস্ত আদর ঢেকে রাখে পুরুষালী রোম।
সংজ্ঞা লুপ্ত পুরুষালী ঘ্রান জেগে থাকে গ্ৰীষ্মের দুপুরের মত,
শুষ্ক, ঘন,তিক্ত,কটু তার স্বাদ।


তবু -
তখনো জেগে থাকে সমস্ত ভালোবাসা আমার দেহের উপরে।

অবান্তর ১৮

 

              ।। পিছুটান রেখো না ।।

আমার রিক্ততার কথা শুনে যদি রিক্ত হতে ইচ্ছে করে,
তাহলে কাছে এসো না।

আমার নির্জনতার কান্না শুনে যদি গলে যেতে ইচ্ছে করে,
তাহলে কঠিন থেকো।

আমার প্রতীক্ষা যদি তোমায় অপেক্ষা করায় ,
তাহলে গন্তব্যে যাও।

যদি শুধুই  ভালোবাসতে ইচ্ছে করে, দিনভর, রাতভর,
চলে এসো, একবারও পিছু না ভেবে ।

Tuesday, December 15, 2020

অবান্তর -১৭

     শহরে আজ রোদ নেমেছে



কুয়াশার শহরে  আজ রোদ  নেমেছে,

সেই সেদিনের মত,

আজ আমায় একটা অলৌকিক শব্দ  শোনাও না,

যাতে  সব কুয়াশারা ঝরঝরিয়ে  গলে যায়।


এসো  আজ সমস্ত রঙ গুলে আবার তোমায়   লাগিয়ে দিই,

সমস্ত কুয়াশা গলে গিয়ে কিছু তো থেকেই যাবে।


এসো আজ শীত কে  আলিঙ্গন করি,

শীত চলে গেলে বসন্ত তো পড়ে  রইবে।


এসো আজ অলৌকিক শব্দ দের জব্দ করি,

তারপর গড়িয়ে পড়ি  পাহাড় ঢালে  ঘাস বিছানায়।


 আজ শীৎকার করে বলি সেই অলৌকিক উচ্চারণ- 

ভালবাসা আজ বিবাগী হও   ,

তারপর রমন খেলায় মেতে উঠি যাযাবরের মত।

Sunday, December 13, 2020

অবান্তর-১৬

 

         কুয়াশারা দাঁড়িয়ে আছে


কি করি বলো,
এরকম আদুরে বৃষ্টি কুয়াশায় আমার বেড়াল কুকুর হতে ইচ্ছে করে,
ইচ্ছে করে বুকের ওমে পা ডুবোতে, ঠোঁট লুকোতে।
ইচ্ছে করে, শূন্য হয়ে লেপের তলায় লুকিয়ে থাকি, রইবে না আর টানাটানি,
এক দেহেতে বিলীন থাকি।


বুকের ওমে জড়িয়ে রইবো,
নাকের কাছে শ্বাস,
আধেক ঘুমে আধেক লীনে রইবে রাত্রিবাস।


হব তখন খুব আদুরে, ছেলেবেলার মত
গল্প শোনাও, গল্প শোনাও
ঠোঁট ফোলাবো কত, তারপরেতে ঘুমিয়ে থাকবোঔ আদর মাখা সুরে, মুখের মধ্যে করবে খেলা রুপকথারা যত।
সারারাত্রি জড়িয়ে থাকবে কইবে কথা কানে,
ঘুমের মধ্যে শুনতে পাবো ফিসফিসানি গানে।


কুয়াশা ভরা এক পৃথিবী আদর মাখা গা,
কোলের কাছে একটা মাথা , বুকের কাছে পা।
গুটিসুটি গুড়িসুড়ি কুয়াশা মেঘ চরে।
কাঁচের বাইরে রূপকথারা স্বপ্ন লিখে চলে।

অবান্তর -১৫

 


      জলের তলার রূপকথারা



চল -

পা ডুবিয়ে বসি কংসাবতীর বাঁকে,

যেখান বিহান বেলায় টুসু ভাসান, তুষাল সুরে ডাকে।

স্তব্ধ জলে পা ডুবিয়ে ছলাৎ ছলাৎ খেলা,

গাছ কুয়াশা জমবে সেথা বসবে তখন মেলা।

দুটো হাতে একটা পাঁপড় এধার ওধারকামড়,

জলের তলায় কথা হবে পায়ে পায়ে খেলা।

হঠাৎ যখন ডুবসাঁতারে পানকৌড়ি হয়ে ,গুগলি তুলে ঝিনুক  গেঁথে মুক্তামালা লয়ে,

হাত দুখানি বাড়িয়ে দেবে অধর খানির মতন,

তুলে নেবো চুপিচুপি আদরচুমি যত। 



মাথায় গাঁথবো, চুলে পরবো ময়ূর পেখম খানি,

হাত বাঁশিটা কথা কইবে ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী।

ধুলো মাখবো, মাতাল হবো , মাতাল বাঁশীর সনে,

চোখে চোখে কথা হবে নিশ্চুপ দুইজনে।



সঙ্গী যত সঙ্গীছাড়া , চাঁদ জ্যোৎস্নায় ভাসে,

গন্ধ বাতাস মাতাল করে মহুয়া উল্লাসে।

সেথায় তখন ঝরনা তলা, সেথায় সমুদ্দুর, নিদেন পক্ষে পঞ্চবটি,সপ্ত সমুদ্দুর।


তোমার আমার দেখা হবে সাঁঝ বিয়ানোর কালে,

ভালো থেকো ,দেখা হবে ,কংসাবতী জলে।


Friday, December 11, 2020

অবান্তর -১৪

 

     ঠিক কতটা জানলে জানা যায়


কুয়াশার পর কুয়াশা পড়ছে ,
ঠিক যেমন করে পরতের পর পরত আদর জমে, জমেই থাকে,
ঠিক যদি এরকম জমিয়ে জমতে পারতাম কুয়াশার মত।

অসময়ে ঘুম ভাঙ্গলে আজও বিরক্ত হই,
অথচ তুমি ছুঁয়ে থাকলে ঐ যে গন্ধ ঘুরপাক খায় মাথার ভিতরে, শব্দ হাতড়াই,
তখন না সুখ, না দুঃখ, শুধুই  আসুখ।

সবই ছেলেমানুষী বললে শুনবো কেন?
এই আসবে তারপর বলবে -তার আর পর নেই,
সবই তোমার।
তা বললেই বা শুনবো কেন?

উপহার দিও না-
তারপর যদি অনেক বরফ একসঙ্গে গলে যায়,
তখন সে বাঁধ পাবে কোথায় ?
তারও পর যদি অনেক 'কেন'  ঘিরে ধরে
তখন, তখন কি করবে বলো ?

ধরে নাও ,তার তখন ভীষণ একটা রুমাল দরকার,
ঝরনা তখন দুয়ার ভাঙ্গতে চাইছে, অথচ -
কি করবে বলো ?

তার চেয়ে উপহার থাক,
এক নৌকো আকাশ দিও,পৃথিবী ঘুরতে।

Wednesday, December 9, 2020

অবান্তর- ১৩

 

                              গিঁট

প্রতি মানবীই চায় সঠিক সময়ে সমস্ত কিছু শিখিয়ে দিতে,
অথচ পুরুষটির পাশবালিশে বড় আসক্তি,
সবজান্তা উল্টো পিঠে হাই তুলে আবার দেদার ঘুমোয়।

  তারপর,

চূড়ান্ত সময়ে,হাত থেকে পিছলে যায় সাঁড়াশি, অথবা হলুদ,নুন, ধনে ,জিরে মাখামাখি।
পুরুষটি ভালোবাসার রুপকথাটাও শিখতে পারেনি তখনও,
তাই খোলা পিঠের চুম্বন কোনো শিহরন জাগায় না রমনী কোনে ।
ঠোঁট এগিয়ে এলে ঠোঁটের ভাষা হাতড়াতে হয় অন্ধকারে গিঁট খোলার মত।
ব্লাউজের হুকে, অথবা রাতপোশাকের গিঁটে গিঁট লাগে অনবরত,
আর বাইরে থেকে অনর্গল আরো গিঁট লাগায় ক্লান্ত পুরুষ।
জানেনা সে ,প্রেম কখনো অপেক্ষা করেনা।


তারপর আরো অনেক বারের মত এবারো উদ্ধারে এগিয়ে আসে সেই রমনী হাত রমন সাহায্যে।
একে একে গিঁট খোলে আরো অনেক বারের উদ্ধারের মত ।

Tuesday, December 8, 2020

অবান্তর - ১২

 


            অর্বাচীন

ঐ যে দূরে পাহাড়টা দাঁড়িয়ে আছে
সবুজ সবুজ শ্যাওলা জড়ানো এক্কেবারে সবুজাভ,
ও আসলে একটা ঘুমন্ত  ভিসুভিয়াস,
অনেক দিন ঘুমিয়ে পড়েছে বলে ওর গায়ে দৈত্যের মত শ্যাওলা পড়েছে, ঠিক পোড়ো বনেদীর ভাঙ্গা কুয়োতলার মত।
অথচ এখনো  ফুটন্ত লাভা পলাশের মত টগবগ করছে  ভিতরে।

ও বর্ষা -
দোহাই তোমার এখন বৃষ্টি ঢেলো না,
ঝরনের শুচিতায় ফুটন্ত কনা ছিটকে পড়লে সমস্ত অভিসার পন্ড হবে ।

সবুজ পাতায় ছাওয়া বলেই জঙ্গল হবে, ছায়া দেবে এমন তো না হতেই পারে,
হয়তো ও তোমার শেষ রাতের বকুল ফুল।
দেয়া নেয়ায় রং পাল্টেছে।

ঐ যে দূরে ঝকঝকে নদী দেখছো,
ও তো কাকচক্ষূ নাও হতেই পারে,
ও হয়তো তোমার ফেলে যাওয়া হৃদয় ,যে বহুকাল নিরুদ্দেশ
ঝর্নার মত ঝরতে ঝরতে আজ তন্বী হয়েছে।

একদিন সকালে ঘুম ভেঙ্গে দেখলে , হালকা হয়ে উড়াল দিয়ে  গেছে তোমার সবচেয়ে প্রিয় হৃৎপিণ্ডটা ।
তাকে কি কুয়াশাচোখে অর্বাচিন বলে গাল পাড়বে?
নাকি একগাল হেসে নিখুঁত ভুলের পর থেকে , একদম নিখুঁত ঠিক শুরু করবে?
তারপর-
নিজেকেই অর্বাচিন বলে গাল পাড়বে মনে মনে।

দোহাই বর্ষা শুধু বৃষ্টি ঢেলো না,
আবেগ পেলে কুয়াশারাও গড়িয়ে যেতে পারে।










Thursday, November 26, 2020

 

খুব আদর চাই জানো
যতটা আদর পেলে প্রশ্নচিহ্নেরা সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ।

খুব আদর চাই
যতটা আদর পেলে পোষবিড়ালীর মত বুকের ওমে গুটিসুটি থাকা যায়।

খুব আদর চাই
যতটা আদরে পৃথিবীকে তুচ্ছ মনে হয়।
আদরের লেপে ডুবে গিয়ে ডুবসাঁতার দিই খরস্রোতায়।

আদরে আদর চায়
যে আদরে নেই সংশয়।

Wednesday, November 25, 2020

অবান্তর ১১

 


            হেমন্ত, কথা বলো




আমরা মরে গেছি জেনেও আমাদের আত্মারা সংস্কার মেনে চলে,

পায়ে পায়ে ঘুরে মরে পোষবিড়ালির মত।


আমরা মরে গেছি জেনেও 

আমাদের আত্মারা ছুঁয়ে পেতে চায় সেই হাত,

বলিষ্ঠ ও নরম।


আমরা মরে গেছি জেনেও 

শীত বিকেলের হেমন্তেরা ঠোঁট ছুঁয়ে যায়

নরম শাবকের মত।


আমরা মরে গেছি জেনেও 

আমাদের আত্মারা শরীরী খেলা খেলে

অশরীরীর মত।


আমরা  মরে গেছি জেনেও

অর্ধেক আমার জীবন, অর্ধেক তোমার যাতায়াত

উঁকিঝুঁকি মারে।


আমরা মরে গেছি , তবুও 

বাঁচার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত মরে যেতে চাই

অন্তিম আদরে।


আমরা জানি আমরা মরে গেছি,

তবু দড়ি টানাটানি ,

পাকেপাকে টান লাগে, কষেকষ আঁটে

তোমার বাটে এখন চৈত্রমাস, আমার হেমন্ত।


Saturday, November 21, 2020

অবান্তর ৯

 


                      দেবী

তোমার কপালে সূর্যোদয়ের লাল টিপ, পরনে সুখী ঢাকাই শাড়ি, তোমার অঙ্গে অঙ্গে গৃহকোনের নিপুনতা,কঠিন ব্যাস্ততার ফাঁক গলে তুমি এসেছো আমার কাছে, ঠিক যেমন করে সব কাজের ফাঁকে তুমি নখে পালিশ দাও হাসিমুখে।

বোধন চলছে
আমার কঠিন মুখের সামনে নতজানু তুমি, অথচ কঠিন মুখের আড়াল থেকে আমি লোভীর মত দেখছি তোমার সুখের ঢাকাই আর লাল টিপ, তুমি ভাবছো দেবী তাকিয়ে আছেন আমার দিকে ।

তিলে তিলে গড়ে ওঠা দেবী আমি,
তাই দূরত্ব আমার আয়ত্ব,আমি বরাভয়, অথচ  তাকিয়ে থাকি তোমাদের সুখচিহ্ন সজ্জিত মাটির দিকে।

দেবীর বোধন হয় তাই বিসর্জন অবশ্যম্ভাবী,
তোমাদের তো আবাহন বিসর্জন নেই, শুধুই ধারাবাহিক সংসার।

ঢাক বাজছে চারিদিকে, বিসর্জনের বাজনাতে ডুবে যাচ্ছি আমি,
সমস্ত পূজন নিয়ে তলিয়ে যাচ্ছে বরদাত্রী,
এখনও শুধু শুন্যে উত্থিত আমার আরাধ্য কুচযুগ ও মুখমন্ডলী।

তখনও ,ঠিক তখনও, তোমাকেই দেখছি আমি
পরনে ঢাকাই শাড়ী, কপালে লাল টিপ, পরিপাটি।
মুখে জ্বলজ্বল করছে সুখচিহ্ন।

Sunday, November 15, 2020

অবান্তর- ৮

 


ভন্ড, লোভী, সুবিধেবাদী, প্রবঞ্চক আর নিঁখুতভুলের আক্ষেপ গাইতে গাইতে পার করছো তুমি দীর্ঘ পথ।

প্রতিটি নিঁখুতভুলের  বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে একটা করে বোধিবৃক্ষ।

একটা করে পার করছো আর লাভ করছো অনন্ত অভিজ্ঞতা , সঞ্চয় করছো ধন অনন্ত কঠিনতার।

প্রতিটি বোধিবৃক্ষের পরেই আছে অনন্ত আক্ষেপ তারপর স্তিমিতি।

এখন নিঁখুতভুল গুলো ধরতে পেয়ে একেএকে পার হচ্ছো  গুছিয়ে বাগিয়ে ।

নিঁখুতভুল গুলো  বাঁক নিতে নিতেই একদিন সমান্তরাল নিঁখুত ঠিক আসবে ।

আর ঠিক তখনই সব আক্ষেপ ফেলে রেখে সমস্ত আঁকিবুঁকি সেরে টুক করে নেমে যাবে জীবন ষ্টেশন থেকে ।

অবান্তর - ৭

                      উৎসব


আজ আমার অঙ্গে অঙ্গে উৎসব

ঠোঁটের সব রক্তিম শূন্য করে মেখেছি গরল নীল।

আমার ওষ্ঠরঞ্জনী ভেদ করে যাচ্ছে গহন কালোর শূন্যতা ।

অতল, স্থবির নীল ঠোঁটে মেখে রেখেছি সমস্ত প্রেমালাপ, 

এখনও রাত্রির নৈঃশব্দ্যের মত স্থির।

শুধু পৃথিবীর চলাচল শুনতে পাচ্ছি পার্থিব সময়ে।


হে প্রেম, হে প্রিয়

 পারবে কি তুমি নীলকন্ঠ হতে ?

সমস্ত গরল চুম্বন করে, নিঃশেষিত, নির্বাক ।


Tuesday, November 10, 2020

ছোটো গল্প

 


                পরকীয়া - ১

কুঁকড়া ডাকা ভোর থেকে এই পৌষের জাড়েও বুধা বাউরীর ঘরে আজ সবাই উঠে আছে। ঘরে তার বৌ, বিটি,লাতি - লাতিন, ছেলে- বৌমা অথচ সবাই একপ্রকার জুবুথুবু হয়ে যে যার মত বসে আছে। বাচ্ছাদুটা পঁটা পড়া নাকে ছড়ানো মুড়ি খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে সেইসঙ্গে ঘরের দু-পাঁচটা মুরগীও মুড়ি খুঁটছে আপনমনে উঠানে ।

এমনসময় বুধা বুড়ার বৌ তাবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো , মাগী মরে বাঁচল। সাঁঝ ভোরেই ভরত উপর পাড়া থেকে এসে খবর দিয়ে গেছে, এখন দাহকার্য বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত  হবে সেই বিষয়ে কেউ বুধা বাউরীকে শুধাতে সাহস পায় নাই। তাই দুই বৌমাও ইতস্তত করে আর তাদের গোলাঘরে বেরোতে পারে নাই। খবরটি পাওয়া ইস্তক বুধা বাউরী গুম হয়ে বসে আছে।

তাবির মনে পড়ে যাচ্ছে কতককালের কথা, সেই ১৩ বছরে এ ঘরে বৌ হয়ে আসা, বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পোয়াতি হওয়া, এদিকে কংসাবতী ড্যামের তখন হড়বড়াই কাজ চলছে আর ঘনঘন সাহেবদের আনাগোনা, জিপ ড্রাইভার বুধা বাউরীর তখন নাওয়া খাওয়ার সময় নাই, কখন আসে কখন যায় তাবি জানতেও পারে না, যখন আসে মদে চুর। এদিকে তাবির শরীর ভাঙ্গতে লাগলো, ডাক্তর দেখানো ওষুধ সবই অবশ্য বুধা করেছিল, তখন উয়ার হাতে অঢেল কাঁচা পয়সা, তো সেযাত্রায় তাবি উদ্ধার হলেও আর পুরনো গত্তি ফিরে আসে নাই ।তবু একে একে চারবার কিকরে যেন পোয়াতি হল তাবি আর উৎরে গিয়ে বেঁচেও রইলো, কিন্তু বুধার ঘর আসা ধীরে ধীরে কমতে লাগলো। প্রথম প্রথম তাবি কাজের  কথা ভাবলেও পরে পরে এদিক ওদিক থেকে দুএকটা খবর উড়ে আসতে লাগলো, আর যতদিনে ভালো করে উড়লো ততদিনে বুধন বাউরি উপর পাড়ার ভারির ঘরে গেড়ে বসেছে। তারপর কত বৃথা রাগ অভিমান কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ভারিকে মেনে ও মানিয়ে নিয়েই চলতে হয়েছে তাবিকে। নাঃ,  এঘরে তাকে এনে বুধা কোনোদিনই তুলে নাই কিন্তু আসাযাওয়া এমনকি ছেলেমেয়েদের  বিয়াতেও তার উপস্থিতি সবাই মেনে নিয়েছিল।

তবে বাঁজা ভারী বলেই সবাই তাকে ডাকতো, এমনকি বুধনের ছেলেমেয়েরাও, এতে কোথাও শান্তি ছিল কিনা জানা নেই, তবে কিছুটা অভ্যাস তো ছিলই।
সেই ভারীও শেষকালে এক মা-বাপ মরা ছেলেকে মানুষ করেছিল, নিজে গোলাঘরে খাটতো আর বুধন মাসকাবারি কিছু টাকা তাকে দিতো , এভাবেই তার শেষকালটা কেটে গেল।

যাইহোক , এখন সমস্যা দেখা দিয়েছে এই যে , তার দাহকার্য ও পালন কি হবে? বুধার কোন ছেলে মুখাগ্নি করবে, কতদিন পালন করবে কেউ কিছু বুঝতে পারছে না, অথচ বুধা সকাল থেকে চুপ, কেউ যে জিজ্ঞাসা করবে সে সাহসও নাই।

বড় ছেলে বিশা বৌয়ের ইশারাতে মায়ের শরনাপন্ন হল। তাবির মনে কিছুটা হলেও দুঃখ জমা হয়েছিল, ছেলের কথায় সেসব ঝেড়ে গলা খাঁকরে বলল - ইসব আমাকে কেনে শুধাচ্ছিস, বুড়াকে শুধা। অতএব খুকখুক করে কেশে ইতস্তত করে বিশা বাপকে শুধাল , বলি বেলা তো বাড়ছে, তা পালন তো ১৪ দিনেই হবেক, নাকি ? এবার তো যেতে হয় ?

এতক্ষনে বুধা ছেলের মুখ দিকে তাকাল , তারপর অবাক দৃষ্টিতে বললো , পালন ! কিসের পালন ?

 বিয়াই তো করি নাই ।

Monday, November 9, 2020

অবান্তর ৬

 


                            তূন

পাহাড়ের অন্তিম ঢালে দুটি অবয়ব খাঁজে খাঁজ , ভাঁজে ভাঁজ মিশে আছে।
তাদের নাক, মুখ ওষ্ঠ, স্তন,জঙ্ঘা এখন সবই অবিভাজিত,
অস্পষ্ট পাহাড়ী কুয়াশার মত।
এ শুধু ছুঁয়ে থাকা নয় , অন্তিম ঢালে মিশে থাকা, নির্বিকার।
এরপর হয়তো বা অজন্তা ইলোরার সূচিপত্র তৈরী হবে,
নয়তো বা পত্রমোচিত ন্যাড়া গাছ টিকি দোলাবে আকাশে।

ছুঁয়ে থাকার পরও যদি অন্তিম জাগে , তবে মরনের কি দোষ বল ?
মিশে থাকার পরও যদি কম্পন জাগে , তবে চোখ খোলো ।
চেয়ে দেখো - আমি রাধা নই,
  অর্জুন ।

Sunday, November 8, 2020

অবান্তর ৫

 

               হতেই হবে মহীরুহ

ধীরে ধীরে মহীরুহরা ঝিমিয়ে আসছে /ওদের ঘুম পাচ্ছে এবার / শীতঘুম / ঐ যে সোনালী উপত্যকা দেখছো / ও আসলে অন্তিম হেমন্তের আভা / তাই এত ঝকঝকে / ঠিক সত্যনারানের পিতলের বাসন /  কাজ শেষ/ তুলে রাখার সময় হল / এবার শীত / এবার আর বসন্ত আসবে কি / গুলি মাখা মামাচাটনি আর মাছ লজেন্স এখনও হাতে / মহীরুহরা কি যেন বলছে / যেন বলছে / গুল্ম এবার মহীরুহ হও
               গুল্ম এবার মহীরুহ হও
                               হও ।

অবান্তর ৪

 


      চকমকি


একটা মজবুত গাছ

কিছু নিশ্চিন্ত শাখাপ্রশাখার জড়ামড়ি

একটা নিশ্চিন্ত শষ্প ছায়াতল

নীল পাখির নিশ্চিন্ত বাসায় হলুদ -সবুজ ডিম

খুব সহজ কথা অথচ -

মেলানো খুব জটিল

ধরতে গেলেই মিলিয়ে যায়

কোল খুঁজতে ঠাঁইনাড়া

ঠাঁই খুঁজতে কোল

কেমন করে হিসেব মেলাই

মেলা হিসেব রই  


Saturday, November 7, 2020

অবান্তর ৩

 


                কোনো প্রশ্ন নেই

এলিজা কার্লসনের মতোই আজ আর কোনো প্রশ্ন চিহ্ন জেগে নেই।
প্রতীক্ষা করতে করতে ওরা এখন কোলের শিশুর মত নিস্পাপ নিদ্রাতুর।

দেখছো না ওদের দেয়ালা হচ্ছে,
অথচ সেখানেও কোনো প্রশ্ন নেই,
এক থেকে একক প্রশ্নোত্তরে মেতেছে ওরা ,সব উত্তর তবু ওদের অজানা নয় আজ-
কিছু জানে, কিছু অনুমানে।
কেননা জানতে হয়, জানার কোনো হিসেব নেই মানা।

যে সমুদ্র ভোরে ওদের জন্ম হয়েছিল, কোল পেতে পেতে ওরাও আজ নিরুত্তাপ ।
আজান দেওয়া ভোরের ধ্রুবতারায়,
জোনাকিরা জোনাকিপথ তৈরী করে নতুন প্রেমের ব্রীড়ার মত।

শুধু দুর থেকে কিছু প্রশ্ন কাস্তের মত দুলে দুলে ভাসতে থাকে,ভাসতে থাকে,  ভাসতেই থাকে।
যদি ধরতে পারো, হয়তো ওরা বলে বসবে -
                  জানো কি ?
ঠিক কতটা উপযুক্ত হলে এক পৃথিবী আরেক পৃথিবীর খবর রাখতে পারে ?
স্যাটেলাইটের ওপারে --------

Sunday, October 25, 2020

অবান্তর ২

 


               জ্যোর্তিরগময়ঃ

পূর্ন মিলনের পর যে যুদ্ধ জাগে
তার সাক্ষী শুধু টেরাকোটার প্রস্তরফলক,
প্রাগৈতিহাসিক চোখ নিয়ে তারা শুধু যুদ্ধ যুদ্ধ খেলে, অযুত অনাড়ম্বর মিলনবাসনায়।
তাদের তীক্ষ্ণ তরবারী সূচীভেদ্য নয় ,
তাই তারা প্রস্তুতি সারে অনন্তকাল ধরে।

তুমি আমি তেমন না,
আমাদের আস্তিনের ভিতর লুকোনো অস্ত্র আছে,
যাতে ফালাফালা করা যায় সমস্ত মিলন,
সে অস্ত্র -  নিঃশব্দ।

এসো ,আস্তিন গুটোই
অন্তিম মিলনের পর শুধু ,যে যুদ্ধ জেগে রয়
তাকে আলিঙ্গন করি মহৎ ভাবে।

এসো - যুদ্ধ করি ।

Tuesday, July 21, 2020

কবিতা ৩৭


                        নির্বিবাদ

আজ জানি,
হারাবার  নেই কিছু মানে, বাঁচার নির্লজ্জতা মানি

 যদি ঘটে অপচয়, সেও সঞ্চয়,
পচে হবে জৈব সার।
তাই যাব বললেই যাওয়া নয়।

রয়ে রয়ে তাই, সার খুঁজি ,
 জীবনের নয়, বাঁচার অনুষ্ঠানের।
 অনাগত ভয় , আগত ভীষণ, তবু ক্ষয় রোধ করা, ক্ষয়ে ক্ষয়ে।
যদি আটকানো যায় ক্ষয়, আমার নয়, মাটির।

শিকড়ের তলবোনা ঝাঁঝরিরা জল ঝাড়ে, টুপটাপ করে।
 আমি শুধু চেষ্টা করে যায় রোধ করার, আমার নয়, মৃত্তিকার।
           
                    অর্পিতা

Wednesday, July 15, 2020

কবিতা ৩৬


                    ফেরিওয়ালা


ভালো থেকো বললেই হল, জানো না ,ভালো রাখার দায় থাকে ?
জলসেচনের পর তাপ চাই, চাই সুর্যতাপ।
না হলেই, পাতা হলুদ হতে হতে ফ্যাকাশে ।
অবাঞ্চিত হাওয়া এসে পাতা ছিঁড়ে নেয় একটি দুটি করে, অজান্তেই।

অথচ, তখনও তুমি বলে যাচ্ছো ,
যত্নে থেকো,
অথচ যত্নের ভাগ নিচ্ছো না !
তাই ,একঘর যত্ন কিনেছি,
তেল সাবান শ্যাম্পু্র যত্ন ।
সাজিয়ে রাখছি এবেলা ওবেলা পরিপাটি করে।

একদিন নিশ্চয় ঝোড়ো ফেরিওয়ালা হাঁক দেবে -
যত্ন চাই গো  যত্ন ?  ভালো থাকা চাই? বেশি না গো ,এই দুটাকা পাঁচটাকা ।
সেইদিন একে একে বার করবো সাজ পরীদের।
তারপর একে একে উড়িয়ে দিয়ে বলবো - যত্ন চাই গো ? ভালো থাকা চাই? ভালোবাসা - এখনও পড়ে আছে শেষপাতে ।

আমিও ফেরিওয়ালা হবো ।
     
                      অর্পিতা

Wednesday, July 8, 2020

কবিতা ৩৫


প্রচন্ড মাথাব্যাথায় আধো ঘোরে শব্দেরা উঁকিঝুঁকি মারে, কি জানি কি লেখা হয় অবচেতনে , অজান্তেই। একে একে শব্দ আসে আধো ঘোরে, কারো মুখ ভেসে ওঠে, কিছু ঘ্রান, তাও কি জানি ছাই, ঢলে পড়ি ঘুমের কিনারে। শব্দেরা ঝিকিমিকি করে মগজ ভিতরে, ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়, কিছু ধরতে পারি কিছু হেসে উড়ে যায়। বাতাসের কানে ফিসফিস করে , বলে- 

           কি জানি

অনেক পথ বাকি এখনও
আশমানী রঙে ঢেকেছি যে আঁচল,
ধূসর রঙের প্রায় উড়ে উড়ে যায়।

অথচ সবুজ ছিল প্রিয়,
বিশুদ্ধ সবুজ, জলে ভেজা সোঁতা গন্ধ তার,
হরেকরকম রঙ, লাল সবুজ ,নীল সবুজ
এখনও কাঁচপোকারা মিটিমিটি চায়,
প্রেম আগলায়, এ ঘরে ও ঘরে।

রাত্রি আসে রাত্রি যায় , গুবরেরা ডাক ছাড়ে,
পেখম মেলার তার হয়েছে সময়
তবু কাছে যাই, বিদায় জানায় নিস্পৃহভাবে,
যেন তার কর্মসংগতি।

এরপর বহু কাজ একে এক উমনো ঝুমনো,
ছুটে চলে এঘর ওঘর রাত্রিকাল নাই তার বাস,
তবু ছুটে চলে ইচ্ছে মাতনেরা।
ঝড় ওঠে, ঝড় থামে এ দিনকাল।
নিভৃত জীবন
নিরাকার, সাকার।


                  অর্পিতা চৌধুরী

Thursday, July 2, 2020

কবিতা ৩৪


একটা চাটাই বুনেছি কতদিন ধরে,
এখন পরতে পরতে আমসত্ত্ব শুকোচ্ছি।
এক পরত যায়, আবার এক পরত।
মেলে দিয়েছি রাস্তায়, উঠোনে, এমনকি বাঁশবাগানেও ।
এখন আর কোনো জায়গা নেই, না চাটাই আছে না রাস্তা ফাঁকা।
চৌরাস্তার মোড়টা ফাঁকা আছে কি?
বহুদিন দেখি না ।
এখনও মাঝে মাঝেই বৃষ্টি ঝরছে
তুমি কি কাল আসবে?
      
                      অর্পিতা

Saturday, June 27, 2020

কবিতা ৩০


             
              
               স্বতন্ত্র vs স্বাতন্ত্রতা
         
আমার একটাও সাদা জামা নেই, নেই লাল, নীল এমনকি সবুজ কোনো জামাও ।
আমার কোনো ছাতা নেই, নীল ছাতা, লাল ছাতা সবুজ ছাতা, তাই ছত্রধরও নেই।
আমার কোনো রং নেই, তাই সব রং এক আকাশ।
আসলে আমার কোনো ধর্ম নেই, সবই নিরন্তর, বহমান অনুভূতি।


স্বতন্ত্র  বলে আসলে কোনো শব্দ হয় না,তাই স্বতন্ত্রতাও  মরিচীকা।
তোমাকে কোনো এক অস্তিত্বের তলায় আসতেই হবে, কোনো এক রং, কোনো এক বেশ।
নয়তোো তোমার কোনো দেশ নেই , তোমার কোনো দশ নেই, তোমার কোনো যশও নেই।
আসলে নিজের মত , স্বতন্ত্র বলে কিছু হয় না,
সবই হতে হয় অন্যের মত।
এ বাঁচা কঠিন বাঁচা, তবু মরে যেতে পারে না কেউ।
তাই ছাতা খুঁজে ফেরে, অনন্তর, নিরন্তর।

                অর্পিতা চৌধুরী

Monday, June 22, 2020

কবিতা ২৯



ভোর হবে, কথা আছে


আমাদের কথা হয়নি বহুকাল
অথচ সূর্য আজও অস্তাচলে গেল।

সময় প্রচুর
তবু অন্তিম মূহুর্তে কলম থেমে যায়।

যে জন কাছে রয়
অথচ আশপাশ ফাঁকা।

দেখছি কিন্তু শুনছি না,
শুনছি কিন্তু ভাবছি না,
আসলে তো পকেট ফাঁকা, পকেট ফাঁকা

কথা ছিল-
তারপর পাতাগুলো উড়ে যায়,
উপসংহার।

বৃত্তে বৃত্তে পাক মারছি,
পাকদন্ডী বেয়ে।

হাঁপাচ্ছি, তবু বসছি না,
মাপনযন্ত্র, মাফযন্ত্র।

শিঙ্গি ,মাগুর ,কই খলবল করছিল,
তবু ট্যাংরা টাকেই তুললাম।

এক পৃষ্ঠার দুই মুখ,
অথচ কালি পড়ে না।

দাঁড়িয়ে ছিলাম,
অথচ সরতেই পারলে না।

বলছি দূরে যাও,
শুধু বলছো অন্ধকার, খন্দকার।


                অর্পিতা

Sunday, June 21, 2020

কবিতা ২৮


         এখনও সময় হয়নি


ছায়ার মত ছায়াবাজি যদি ভালোবাসা হয়,
তাহলে অত্যাচার কি?

অনবরত অবহেলা যদি ভালোবাসা হয়,
তাহলে ঘৃনা কি?

ধরবো বললেই পাওয়া যায় কি?
বন্ধ মুঠি খোলা দরজা।

আপোষ আর আফশোস সহজ কথা নয়,
এপিঠ ঘুরলেই দুপিঠ।

অন্তিম কাব্য সর্বোচ্চ বানী !
নাকি তারপরেও কিছু থাকে,
থাকতে হয়।

যাবো বলে ফিরে এলাম,
অথচ চাবি ভুলে গেছি।

অমোঘ বানীর পরেও যে জন থাকে,
সেই টিকে থাকে।

বন্ধ কপাট খোলা জানলা ,
অথচ ঘরভর্তি অন্ধকার।

প্রচুর খেলনা সাজিয়েছি,
অথচ খেলুড়ে মিসিং।

খেলতে খেলতে তাকিয়ে দেখি,
একটিও নেই এ তল্লাটে।

গাছভরা মেঘ আর পাটভাঙ্গা শাড়ি,
দুটোই বর্ষার অন্তিম কাব্য।

চেষ্টা করে যাচ্ছি, করে যাচ্ছি, করেই যাচ্ছি,
অথচ নীট ফল জিরো।

পাল্টাবো বললেই পাল্টানো যায়?
না শুধু ক্ষনগীতির মায়া।

মায়া কাটলেই সূর্য উঠবে,
মায়া তো ভালোবাসারই রূপান্তর।

দরকার বলেই তো ভালোবাসি,
ভালোবাসি বলেই তো দরকারী হই।

পৃথিবী ধরবো বলেই তো ঘরের কোনে আছি,
অথচ তুমি দিগ্বিজয়ে বেরোলে।

যাচ্ছো ? বললে না?
না কি এ পুনরাবৃত্তির পুরাবৃত্ত।

বসে থাকার গান গাইছি,
প্লিজ দৌড়তে বোলোনা।


                         অর্পিতা

Wednesday, June 17, 2020

মধ্যযাম ৯

                    যা দেখি তা লিখি
                              ৯


এখন কেউ কারো বাড়ি দিনমানেও যায় না, তাই সবার আস্তানা এখন শান্ত ছায়াময়, শুধু ভিতরে ভিতরে গুমরায় গর্জনে মেঘের মত।

আজ সারাদিন ঝিপঝিপিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে, আধশুকনো বস্ত্রাদি কখনও নাইছে কখনও কাঁধে চড়ে বাড়ি ঢুকছে একছুটে। বলার মত কিছু নয় ,সাদামাটা গৃহস্থালি। এমনি সময় ,উপরতলা থেকে কানে এল অপরিচিত গলার ক্যাঁচরম্যাঁচর, কৌতূহলে তাকিয়ে দেখি উপর পাড়ার হলা বাউরী উবু হয়ে বসে আছে ঘরের উঠোনে। যে পিচটা আমার আস্তানার সামনে দিয়ে গিয়ে লাল মোরামে গিয়ে শেষ হয়েছে তার ঠিক উত্তর পূব কোনে  হলার সদ্য আধপাকা টিনছাউনির ঘর, সামনে পাকা নালা আবর্জনায় কাঁচা হোয়ে গিয়েছে, ওর বাপের নাম সনাতন বাউরী, ছিপছিপে কেলে বাঁশ পারা চেহারা ছিল তার, নিজে হাতে মনসা গড়ে পুজো করতো সারারাত, তারই ছেলে হলধর বাউরী । সংক্ষেপ গুনে হয়েছে হলা, তা মাঝেমাঝেই কচুটা, মোচাটা দিয়ে যায়, আজ এসেছে কতকগুলো শিঙ্গি মাছ নিয়ে , যার অধিকাংশই মৃত আর দুএকটা অল্পজীবিত তখনও।

তার ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া এক মাথা ঘাড় পর্যন্ত তাল ছিবড়ের মত কুচকুচে চুল থেকে টুপটুপ করে জল ঝরছে, আর আলপথের মত ফাঁকা চাঁদিটা আমার দিকে দন্তবিকশিত করে আছে। হলা আজ এসেছে পুরো ফুল টু হয়ে, মাথা পর্যন্ত ধেনোতে ডুবে।তবে তাতেও তার ব্যবসায়ী জ্ঞান প্রখর টনটনে। এখন সে উবু হয়ে বসে পুঁটুলির শিঙ্গি গুলোকে কাতুকুতু দিয়ে জাগানোর চেষ্টা করছে এবং তার ক্রেতাকে পটানোর চেষ্টায় সর্বতো ভাবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছে। এমনকি শিঙ্গি মাছের গুনাগুণ, কেমন ভাবে ধরেছে , আর কত কষ্ট করে এ বাড়ির জন্যই বয়ে এনেছে সবের বিবরন দিচ্ছে বিস্তৃতভাবে।

তবে ,এত কিছুর পরেও সেয়ানা ক্রেতা রাজি নয়, সে একে নিরামিষাশী তারপর প্রাতেই অন্য সদস্যদের জন্য বরাদ্দ মৎস্য এনেছে, ফলস্বরূপ সে একেবারেই নারাজ। গম্ভীর স্বরে হলাকে যেই জানালেন, তিনি নিরামিষাশী এবং সেদিনের মৎস্য এনেছেন, হলা তার সমস্ত গাম্ভীর্য খানখান করে মাথা ঝুঁকিয়ে তৎক্ষনাৎ বেমালুম বলে বসলো-  তুমি শালা বেদম 'বারাবেউধা' আছ, বলছো নিরামিষ, ইদিকে শালা মাছ লিয়ে বসে আছ।

সাৎ করে কথাটা কানে গিয়ে বাজলো, অর্বাচীনতার তো কালপরিধি ক্ষেত্রবোধ থাকে না, আর অশিক্ষিত , নিম্ন বর্গিও মাতালের তো আরোই দায় নেই কারো কাছে প্রমান দেওয়ার, কারো কাছে নিজেকে উপস্থাপিত করার। এ যেন ছিন্নমাদুরের দুই পিঠ, যার তল বাহির সমান । সমান ছেঁদা, সমান ফুটো যা সারাবার নয় তাই সারানোও  হয় না। তার নেশাতুর মস্তিষ্ক এই মূহুর্তে তাকে জানান দিচ্ছে সে বিক্রেতা হিসেবে আজ অপারগ, তার কুটকুটে হলুদ গেঞ্জি , ঝাঁকড়া চুল বিদ্রোহ করছে  , তার আরো একটু ধেনো খাওয়ার লোভ তাকে বিপাকে ফেলেছে। সে বুঝতে পারছে শিঙ্গি আজ বিকবে না, তবু তার নিখাদ চেষ্টায় জলসেচন মানতে সেও নারাজ।

তার নিজেকে প্রমানের দায় নেই, সৎ সাজার ছক নেই, সংসারের দেনাপাওনা নেই, দায়িত্বও নেই, ভালো সাজার প্রচেষ্টা নেই, জীবন যাপনের পংক্তি নেই শুধু নিজের ধন গচ্ছিত করে একটু ধেনোর জোগাড় করে জগৎ সংসার ভুলে থাকা। জীবনের একমাত্র প্রতিযোগিতায় বাধা হয়ে দাঁড়ালে ভদ্দরলোকেরা তো  'বারাবেউধা' হবেই।


এই যে নশ্বর জীবন, সেখানে মৃত্যু তো খুঁটায় বাঁধা ছাগলদড়ির মত। তার উল্লাসও নাই, উদযাপনও নাই, তাই উৎসবও বড়ই নির্বিবাদী। ইনিয়ে বিনিয়ে কিছুদিন কাঁদে তারপর যে যার স্রোতে বয়ে যায়, সকাল থেকে সর্বৈব ভুলে মূহুর্তের উপলক্ষে এগিয়ে যায়। কোনো প্রতিযোগিতায় না থেকেও মজা দেখে ঝুঁঝকো চুলে, লাল চোখে।
এখানে মৃত্যু কোনো উৎসব নয় মূহূর্তের উপলক্ষ্য মাত্র ঠিক ধেনোর মত।

                       অর্পিতা

Thursday, June 11, 2020

মধ্যযাম - ৮

                   যা দেখি তা লিখি
                                ৮


অন্তিম প্রহর , কৃষ্ণপক্ষের কাস্তে চাঁদও ঘুমের তোড়জোড় করছে। মিশকালো অন্ধকারে ক্ষয়াটে চাঁদের চারপাশের ক্লান্ত হলদে আলোও ক্ষীয়মান , রাতচরারা এখনও ইতিউতি অন্ধকার চিরে শিস দিচ্ছে ইতর প্রানীর সন্ধানে। বাতাসে শিরশিরে ভোরের গন্ধ। আর কিছুক্ষন বাদেই পৃথিবী ডানা মেলবে তাই এখনও পক্ষীবৎ চঞ্চু গুঁজে আছে নিজের পালকে। আরো একটা আলোর দিন শুরু হবার প্রস্তুতি শুরু হচ্ছে গোপনে গোপনে।


ঐ যে দেখা যাচ্ছে একটা বাতায়ন, যার  ফাঁক  দিয়ে  একটা আলোআঁধারী পৃষ্ঠদেশ দৃশ্যমান । সামনের আলো পিছনের আঁধারে ছায়া মন্ডলী রচনা করেছে। তার ঈষৎ প্রলম্বিত ছায়া পড়েছে নাতিলম্বিত রাতের কপালে।লোকটা এখনও জেগে, হামেশাই রাত জাগে। ছায়া রাত্রির কায়া হয়ে ঘুরঘুর করে আনাচেকানাচে। কখনও গার্হস্থ্য মর্জন করে, কখনও ভোরের দখিনার মত বাতাস বওয়ায় নিযুত কোনটিতে। এক আলো দিন থেকে এক রাত্রি অন্ধকার অযুত আগড়ে নিগড় বাঁধতে চায় পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে। থলে ভরে নিয়ে আসে সংসার ,তারপর প্রত্যেকটি কনা উপুড় করে, থলে উল্টে দিয়ে দেখে এতটুকু বাকি রয়ে গেল কিনা সংসারে  দেওয়ার।

বড় সামাজিক সে , তাই চাষ করে , বাস খোঁজে, শিকড় ছড়িয়ে দেয় মাটির পরতে পরতে, যেমনটা গাছেরা জানে খুঁজে নিতে রঙ মাটি ছেনে , জল ছেনে , তারপর ছড়িয়ে দেয় বাকলের খাঁজে খাঁজে মাটির সে রঙ, ধূসরের কোনে। লোকটিও খুঁজে ফেরে সঠিক রঙ, আনাচেকানাচে ধূলিধূসরিত জীবনে। আসলে সে কথা বলতে চায় ,তাই চুপ করে থাকে রাতের প্রতীক্ষায়।

              লোকটা ভালো নেই।

সারাদিন ঘুরে মরে  জীবনে, দ্বীপবিচ্ছিন্নের মত নির্জন, একাকি, মনে মনে। তেল ,নুন সরষের হিসাবের পরেও যে দ্বীপ পায় নাকো খুঁজে, খুঁজে মরে। ছুঁতে পারে হয়তো বা ,তবু মুখ দেখা যায় না কোনোমতেই। তার লুব্ধক হাত হাতছানি দেয় ধ্রুবতারার মত, তার ঠোঁট পৃথিবীর কারুবাসনায় মাখামাখি, অথচ মুখাবয়ব অধরা।

যেখানে মাটির পরে নরম ঘাসের রোমে ঢাকা হয়ে আছে মাটির শরীর সবুজ সবুজ, ঐ তবে ছুঁয়ে থাকা যায়। যেখানে মাটিতে এসে মিশেছে আকাশ, তার কাদাজলে নীলাকাশ মুখ তুলে চায় আয়নার মত। নীল রঙ চলে মাঠে  মাঠে পানসির মত, মন চলে তারও আগে। আকাশ সবুজ  হয় ,বদলের রঙে।
মাঝখানে গুঁড়ি আলপথ, পিচ্ছিল, কর্দমাক্ত, নীচে বহমান ফাঁ লোক। এখানে কোনো ছায়া নেই দুধারে সংকীর্ণ জল নিরন্ত করেছে পথ ।


ইচ্ছে করে মরালী গ্ৰীবায় তিষ্ঠায় ক্ষনকাল, অথবা আদিম কামনাময় নীল স্তনে  মাথা রাখি, জঙ্ঘারামে মুখ রেখে কাঁদি ক্ষনকাল কোলের শিশুর মত, অথবা পায়ের পাতা দুটি ভরি প্রেমজলে , তারপর ফিরে আসি ভাঁজপাঠ করা গানিতিক পৃথিবীতে পঙ্ক ধৌত হয়ে ,নতুন কোরকের মত সাজিয়ে নিতে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ , তবু মুখ তার অধরা।

লোকটি বড় সামাজিক  , তাই সে বড়ই গরীব। অবাঞ্চিত বেড়াকলমিদেরও স্থান দেয় সযতনে । ফনফনিয়ে ঘিরে ধরে তারা নতুন বর্ষায়। নিগড়ের আগড়ে বেঁধেছে নিজেকে ,যথাযথ গন্ডীতে। তবু সে সীতা হতে চায়, তারপর আস্পদ আক্রোশে রাত খুঁড়ে মরে রাতের বুকে, তবু মুখ দেখা যায় না, বুঝতে পারে না ,  কি চায় সে? অথবা কে তাকে চায়?

রাত বাড়ে । মলিন পৃথিবী পরে নির্ঘুম, ক্লান্ত পদ ফিরে যায় গার্হস্থ্য সভ্যতায়। পরিচিত কোন খোঁজে, নিরাপদ ঘুম, কখনও বা পরিচিত  গার্হস্থ্য ভাঁজে মুখ গোঁজে, সুখ খোঁজে অভ্যস্থতায়।

নতুন সকাল হয়, এক আলো দিন, থলেতে থলেতে সংসার সাজায়।তবু মুখ দেখা যায় না, এখনো অধরা সে।

                           অর্পিতা

Sunday, June 7, 2020

মধ্যযাম ৭

                যা দেখি তা লিখি
                           ৭


ঝিঁঝিঁ ডাকা খর দ্বিপ্রহর , পুকুরের চারিপাশ আম ,জাম, জামরুল,কলায় ভর্তি থাকায় বাইরের সঙ্গে বেশ একটা গোপনীয় বেড় সৃষ্টি হয়েছে। সকালে ছাড়া সূয্যিও জলের মুখ দেখতে পায় না ।চারিদিক কেমন তাই শীতল শীতল, স্তব্ধ সুখময় হয়ে থাকে। এই খর প্রহরে স্তব্ধ ঘাটে  ফেলে যাওয়া ভাতের কনায় ঘাই মারছে কালবউস, আর চুনোরা। এ বড় নিজস্ব সময় , হিজলেরা শুয়ে আছে এক কোনে চুপ করে কারও প্রতীক্ষায় ।

খিড়কি দোরের শুনশান  পথ, যে পথ গিয়ে মিশেছে রান্না শালের পিছনে , সেখান দিয়ে কার যেন প্রলম্বিত ছায়া দেখা যায়। এ পথ সাধে না কেউ সচরাচর, শুধু সে ছাড়া, এ যে তার অভিসার পথ।

ঘাট  বাঁধানো সিঁড়ির পৈঠায়  সদ্য জল স্পর্শ করেছে অলক্তরঞ্জিত পা দুখানি নূপুর নিক্বন তুলে । আলতার প্রথম পোচ গুলিয়ে গিয়ে জল এক অযুতবর্ন ধারন করেছে, বাচাল পুঁটিরা ছোটো ছোটো ঘাই মারছে তার অলক্ত অঙ্গুলিতে।

এক নিস্পৃহ ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে কলাবতী ,গায়ে আজ তার সদ্য ঘৃতের বাস। চোখে সেঁটে আছে এক স্থির চিত্র, নাপতেনি বসেছে দাওয়ায় হাঁক পাড়ছে বৌ ঝিদের, এক পিতা তখন নিজ হস্তে রঞ্জিত করছে কন্যার পা, তারপর দুটো আলতা চোবানো  পা দুহাতের জোড়ে নিয়ে মাথায় ঠেকিয়ে বিড়বিড়াচ্ছে - আমার জগজ্জননী।  আজও সেই বিষুত বার ।

তার গম রঙা শরীর দেড় যুগ পরেও নির্মেদ, ঈর্ষক। এ বড় একান্ত সময় তার , কুলুঙ্গি থেকে ঝেড়েঝুড়ে তুলে রাখা মনটা তুলে আনে সে ডুব দেবে বোলে হিজলের সনে।

তার নিতম্ব বেষ্টিত চুল পুকুর ছড়িয়ে আছে,মসৃন বাহু থেকে গড়িয়ে পড়ছে জল, আধডোবা দুর্গা প্রতিমার মত চকচক করছে ঘামতেল, যেন এখুনি গড়িয়ে যাবে পদ্মপাতার মত। তার নাভি স্পর্শ করছে শীতল জল, তার স্তন, মসৃন বাহু, বাহুমূল শুধু জল আর জল, যেন জল সাথে জল হয়ে মিশে যেতে চায় আজ।

মনে বড় সাধ, ঐ যে পুকুরের মাঝখানে বুড়বুড় ওঠে সারাক্ষন সেখানে সে যাবে একদিন , ডুব দিয়ে পার হবে সূক্ষ পথ, দাঁড়াবে  যখার কাছে যক্ষিনী হয়ে । কেন যেন যেতে চায় মন, সব শূন্য ,শূন্য মনে হয় । শুধু যক্ষিনী মন নিরন্তর ঘুরে মরে । সে জলের স্পর্শ পেতে চায়, জলের ঘ্রান পেতে চায়, জলের শব্দ ছুঁতে চায় জল হয়ে শামুকের মতো। হিজলের মত শুয়ে থাকে তাই জলের উপরে অবিন্যস্ত, সময় বয়ে যায়, ঝরে পড়ে দু ফোঁটা স্বেদ ভালোবাসা হয়ে , মরাল গ্ৰীবার মত  ঠোঁট তুলে রাখে অন্তিম সময়ের তরে।

এদিকে ঠিক সেইসময় উত্তর পুবে ঈশান কোনে পোড়ো   আমগাছ  থেকে তাকিয়ে আছে প্রাগৈতিহাসিক জ্বলজ্বলে দুটো চোখ, ধূসর ছিপছিপে শরীর টাকে কালো আমডালের তলা দিয়ে পেঁচিয়ে জলের কিনারে এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ে কলাবতীর আধভাসা শরীর, মুহূর্তে পাক মারে সে, পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে লাফ দেয় উল্টোদিকের ঘেসো ঝোপে , সড়সড় করে চলে যায় , কলাবতী জানতেও পারেনা। যেমনটা, বাস্তুখরিসটা যেদিন পূর্ণিমা রাতে বাগানের  ঢ্যামনার সাথে শঙ্খে মেতেছিল,  কলাবতী তাদের ভালোবাসাবাসি দেখে   সরীসৃপ পা ফেলে  লাছদুয়ারে তালা দিয়েছিল, ঠিক তেমনই।

পৃথিবীর কত যে চোখ, কে জানে! কখনও জল হয়ে, কখনও মীনবৎ, কখনও বা প্রাগৈতিহাসিকের মত প্রাচীন চোখে। শুধু অন্ধ কলাবতী খুঁজে ফেরে তার যখাকে যক্ষিনী হয়ে।

                        অর্পিতা

Thursday, June 4, 2020

মধ্যযাম ৬


                      যা দেখি তা লিখি
                                ৬
পড়ন্ত গোধূলি দুপুর, ফ্যাকাসে রোদ কার্ণিশ বেয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে এখনও, গ্ৰীলের ফাঁক দিয়ে  তার তীর্যক ছায়া  আলপনা এঁকেছে বারান্দার মেঝেতে বার লক্ষ্মীর সরার মত। পিঁপড়েরা মুখে করে সরাচ্ছে সাদা সাদা ডিম দ্রুততায়, বোধহয় জল আসবে। ঈশান কোনে ডিমের মত জেগে উঠেছে খন্ড কালো মেঘ , এখনও তার বুক ভারী হয়নি।  সঞ্চিত রাশি সিঞ্চিত হচ্ছে ধীরে ধীরে ,অদেখা প্রনয়ীর মত ঝরবে বলে।

চারদিক অন্ধকার করে করালবদনা অট্টহাস্য শুরু করেছে, সঙ্গে যোগ দিয়েছে নৃমুন্ডমালিকারা। জোকারের মত ফাটা ব্যাটের ডগায় নাচাচ্ছে ঝোড়ো হাওয়ারা, শুরু করেছে ট্রাপিজের খেলা।

মোমের নরম আলোয় স্নিগ্ধ হয়ে আছে গৃহকোন, এ যেন অযাচিত দীপাবলি।বাইরের ভীষনতায়  মৃদু কম্পমান হলেও ভয়ানক স্থির বর্তিকা টি । ঠিক যেমনটি দেখা যাচ্ছে কদম ফুল মাথা  লোকটিকে বারান্দার এক কোনে ছায়ার মত দেদীপ্যমান। মোমের মৃদু আলোয় তার দীর্ঘ ছায়া  দোদুল্যমান। না, তাকে আর চাষা বলা যায় না। বহুকাল আর সে চাষ করে না, কাদা মাটি ছানে না, বীজতলা রুয়ে না, হাঁক দেয় না ভোর‌ থেকে কামলা মুনিষদের । তবু সে মনেপ্রানে আজও চাষা- সারাক্ষণ বীজতলা খুঁজে ফেরে, বীজ আলুর গন্ধ পায়, ধান পাকার শব্দ শোনে তার আঁতুড়কোনে শুয়ে শুয়ে ।
এখন সে মনে মনে বড় অস্থির, ভাবে নুরের ঘরখানা ঝড়ে উড়ে গেল কিনা, অথবা রামি গয়লার গাভীনটা মাচা চাপা পড়লো কিনা, সেধোর ছিপ নৌকাটা যে বাধা থাকে ঘাটপারাপারের ঘাটে , কি জানি কি হল তার।ভিতরে যত ছটপটায় ততই বলে ধান তো গেলই, তিল শুঁটিও আর একটাও রইলনি মাঠে, সব ধুয়ে গেল। কিছু আর সোরানো গেলনি।

প্রাচীন বৃক্ষ যেমন মাটি আঁকড়াতে চায় চাষা লোকটিও আঁকড়ে ধরতে চায় তার চিরচেনা পৃথিবী। অব্যক্ত যন্ত্রনায়, অনাগত আশংকায় খোঁজ করে তারু, সেধো, নুরু, আলি, খলিলের। শিকড়ের মূলে শুনতে চায় 'ভালো আছি'র গান। উত্তাপে সেঁকতে চায় তার পরিচিত গার্হস্থ্য জীবন, যে জীবন তাকে হাঁকে ডাকে খোঁজ নেয়, তাকে ভালোবাসা দেয়, তার অস্তিত্বের উত্তাপ ছড়ায় ক্লোরোফিলের মত। রোমে রোমে অস্তিত্বের বার্তা ছড়িয়ে বলে 'আমি আছি, আমি এখনও আছি'।

জীবন প্রাসঙ্গিকতা খোজে, তাই খোঁজ করে প্রাচীন  গৃহমন্দিরের, অথবা অপাংক্তেয় উচ্ছে বা ঝিঙ্গে লতের মাচাগুলোর , তাদের ঠিক থাকার বার্তা যেন চলমানতার বার্তা আনবে স্থবির জীবনে।আপ্রাসঙ্গিক মানেই তো মৃত্যু, তাই খুঁজে খুঁজে খোঁজ চলে আনাচে কানাচে, ইতিউতি স্বজন পরিজনের। ভালো থাকার বার্তা শীতের রোদের মত ওম ফেলে প্রাজ্ঞ শরীরে।

এখন তার পাঠের সময়, সাদা ধুতির ফেত্তাটা গায়ে ফেলে তোড়জোড় করে, চন্দন ঘষার আওয়াজ আসে, বাতাসে তখন ধুনোর গন্ধ বইছে ।

                   অর্পিতা চৌধুরী

Friday, May 29, 2020

মধ্যযাম ৫

                  যা দেখি তা লিখি
                                ৫

এখন ভরা জৈষ্ঠ্য , মাছেদের এখনও গর্ভিনি হওয়ার সময় হয় নাই, তাই এখনও তারা জলকেলীতেই ব্যস্ত। গৃহবন্দী মানব মানবী আজ আদিম খেলায় ক্লান্ত, তারাও হাত পা মেলতে চায় নিজের মত করে। প্রথম অনুরাগ ছিল ভালো, আজ সবই বিপর্যস্ত। শুধু এখনও টুনটুনিরা মাতৃত্বভারে ক্লান্ত হয় নাই, কি অসীম জীবনী শক্তি প্রকৃতি ওদের প্রদান করেছে, তাই মাতৃত্বের উপাখ্যানগাথা গাঁথা হয় পরপর, নির্দিষ্ট রীতিতে।সেখানে কোনো সংশয় নাই, লজ্জা নাই, বৈধ অবৈধ নাই, শুধু আছে স্বনির্ভর মাতৃত্বের যাতায়াত। এক হাতে বুনে যাওয়া ফসলের মত বিন্দু বিন্দু করে।

শুধু মানুষ প্রৌঢ়া হলে বুঝি অসামাজিক সমস্ত শব্দের উপর একটা সহজাত অধিকার জন্মায়।লোলচর্ম, লোল বসন, লোল স্তনী হতে হতে লোল জ্বিহাও যেন বয়ঃবৃদ্ধির সাথে সাথে স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী হয়, তখন সে  ভুলেই যায় সেও একদিন মসৃন যুবতী ছিল, তারও এক আকর্ষক কোল ছিল রাত্রিকালের জন্য,  সোহাগের জন্য।

আমার আস্তানার দুয়ারে দীর্ঘকাল যাবৎ ফি রোববার যে বোষ্টম আসতো, তার সাথে দেখা হয় না বহুদিন। এসেই নাকিসুরে বলতো- ভিক্ষা দাও মা নন্দরানী, তোমার গোপালের ভালো হোক।। আর সব প্রশ্নের উত্তরেই বলতো - সঁবই গোবিন্দের ইচ্ছা। ঘরে তার বিকলাঙ্গ শিশু তবূ গোবিন্দের উপর সঁপে দেওয়া জীবন কি জানি কেমন আছে ।

আজকাল এক শাক তুলুনির আবির্ভাব হয়েছে আমার দুয়ারে।  হিঞ্চে, গিমা, কলমী এইসব অবাঞ্ছিত রা থাকে তার কাছে। তার দৌড় দেখে মনে হয় কাঠে আগুন সাজিয়ে জল ফুটতে দিয়ে এসেছে , ঘরে তার অভুক্ত সন্তান। আমায় দেখে সেদিন থতমত খেয়ে থমকে দাঁড়াল, মনে ইতস্তত ভয়, আসলে আমি বোধহয় তার অবাঞ্ছিত শাকের খদ্দের হওয়ার  যোগ্য নই । তারপর ক্রমে ক্রমে সে একটা বোকা খদ্দের পেয়ে খুশীই হল , আসলে শাকের প্রয়োজনীয়তা থেকেও তার আঁচলের কোনে যে শিশু উঁকি দেয় তাকে ফেলতে পারি না, অথচ শাকান্ন জোগাড় করা মাতাকে অহেতুক করুনাও করা যায় না। এ যেন বেশ এক লুকোচুরি খেলা। সেই শিশুর সাথে, সেই মাতার সাথে, নিজের সাথে।

অবশেষে পরিযায়ীরা শিকড়ে ফিরছে। সেদিন হঠাৎ শব্দ পেলাম , দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস কোরলাম - কেমন আছো ঠাকুর? এতদুর থেকে কিভাবে এলে? সেই অমলিন হাসি , সঁবই গোবিন্দের ইচ্ছা ,হেঁটে গ। হেঁটে ! প্রায় ২০-২২ কিমি পথ !
এ কোন পরিযায়ী ! ঘর ছেড়েছে গোবিন্দর ইচ্ছায় নয়, আজ পেটের দায়ে । ভাবতে থাকি, ভাবতেই থাকি , কখন সে চলে গেছে তার ভিক্ষাপাত্র নিয়ে , তবু দাঁড়িয়ে থাকি। কিছু ভাবি কি? কি জানি?  শুধু কানে বাজে -
সঁবই গোবিন্দর ইচ্ছা , তোমার গোপালের ভালো
হোক ।

                 অর্পিতা চৌধুরী

Monday, May 25, 2020

কবিতা ২৬


বদভ্যাসে লিখতে থাকি


ভালোবাসা এক বদঅভ্যাস,
ঠিক নাক খোঁটা বা লুকিয়ে ঘামাচি মারার মত।

তুমি বললে সময় নেই
আমি শুনলাম প্রতীক্ষা করবো।

আমি এরকমই
তবু- - - -।  

যেখানে পরম শক্তি
সেখানেই চরম দুর্বলতা।

অন্য বাসার কাঠিখোঁচা গুলো ঠিক রাখি বলে,
নিজে স্থির থাকি।

তিনটে দেওয়াল নেই বলেই,
ছাদ হতে পারলাম না।

সুখ আর অ-সুখ 
একের পর এক
যেন দিন- রাত্রি।

আমি বলছি ভয় পাও,
তুমি শুনছো কাছে এসো !

একটা সবুজ মাঠ ,
একটা আকাশের সাথে মিশে যাচ্ছে,
ত্রিকোন মাত্রিকে।

মেঘ সেজে বসে আছি ,
বৃষ্টি হবো বলে ।

এত কাছে তাই বড় দূরে,
সর্বাঙ্গে আবেশ লাগে কোনায় কোনায়।

ছুঁতে চাই, ছুঁতেই তো চাই।
তাই উড়িয়ে দি,
প্রতিআস্পর্ধায় ।

মেঘ বলে ডাকো যদি,
বৃষ্টি হয়ে নামি,
চোখের কাজলটিতে
বর্ষা থমথমানি।

দূরে থাকো বলেই কাছে থাকো ,
নাহলে জড়াতে চাই বারেবার,
অবুঝের মত।

হাত বাড়িয়েছি অন্ধকারেই,
অন্ধকার কে ছোঁব বলেই।

আমি ডাকলেই যদি তুমি আসো,
এমন কৃতজ্ঞতা না থাকাই ভালো।
কৃতঘ্ন হও।

শুনছি বলেই বলে যাবে,
আর বলছি বলেই শুনবে,
এ নিশ্চয় বোকা মরমীয়া পাঠ ।

যত দূরেই যাই,
নাকে লাগে শিরিষের পুরুষালী ঘ্রান।
মাথা রাখি সেইখানে,
নোনা নদীপথ যেখানে গিয়ে মিশেছে
জঠরে।

      

Tuesday, May 19, 2020

মধ্যযাম ৪


                    যা দেখি তা‌ লিখি
                                 (৪)

পৃথিবী নির্মল হয়েছে তাই প্রতি পড়ন্ত বিকেলে কালবোশেখী নামে পড়শীদের বৈকালিক আলাপনের মত। ঝোড়ো হাওয়া এসে গুনগুন করে এগাছ ওগাছ , আকাশকোনের ঘন কালো মেঘ চিরে বিদ্যুতবল্লরীর মত ঝটিকাগতিতে‌ একঝাঁক ত্রস্ত বক নীড়ে ফিরে যায় মধ্যবিত্তীয় রীতিতে । জানে তারা এমুহুর্তে কারো ছাঁচতলা মাড়ানো অপরাধ তাই ঘর খুঁজে ফেরে।
জল পড়ছে। অশ্বত্থ গাছটা আর কচি নাই,  তরুন চিকন হয়েছে রোজ জল পেয়ে পেয়ে।

প্রায় এক যুগ ধরে এক সংসারী শালিক তার সংসার সাজিয়েছে ল্যাম্পপোস্টের মাথায় একটু একটু করে। ডালপালা , খড়কুটো, আর মানুষের দেখাদেখি এখান ওখান থেকে ছেঁড়া দড়ি ,কানি কাপড় ,পালক এমনকী নিজের বুড়ো পালক খসিয়ে খসিয়ে শৌখিন করে তুলেছে ঘরটাকে । এদিকে একরত্তি ল্যাম্পপোস্টের মাথাও ক্রমশ শৌখিনতায় ভারী হচ্ছে, ঠিক যেন ফ্ল্যাট বাড়ি। পাতকুয়োরা এখানে ঝামেলা করতে পারে না তাই নিশ্চিন্তে মা যায় কাজে, পোকা টোকা ধরতে । ফিরে এসে আদরে গোবরে কিচমিচ করে ভরিয়ে তোলে সংসার। এক যুগ ধরে সাজিয়েছে সে এ সংসার , ধুলো ঝেড়ে গুছিয়ে, বাগিয়ে ছানা মানুষ করে গড়ে তুলেছে তিলে তিলে।

সেদিনও ঝড় এসেছিল দুপুর থাকতেই , সঙ্গে টিপটিপে বৃষ্টি,আকাশকোনের কালো মেঘে শুরু হল ঝড়ের মাতন , মা শালিক টা তখনও ফিরতে পারেনি বোধহয় ,আজ একটু দুরে গিয়েছিল ঐ বদ্যিপাড়া পর্যন্ত । কোনো ছাঁচতলা পেয়েছে কি? কে জানে ? এদিকে ঝড়ের গুমগুমানি আর জলে ভিজে যাওয়া সংসারটা একমুহূর্তে উড়ে পড়লো নীচে একেবারে তলায় শুয়ে থাকা নেড়িদের কোলে, প্রথমে ভয়ে খ্যাঁক করে খেঁকিয়ে উঠলো নেড়ী, তারপর শুরু হল ভোজ।
তখনও অন্ধকার হয়নি, আকাশ এখনও অভিমানী প্রেমিকার মত মুখ গোমড়া করে আছে আর নওল কিশোরের মতন মেঘ ভাঙ্গা কমলা রোদ রাগ ভাঙ্গাবার তরে  উঁকিঝুঁকি মারছে, জানে আজ অসম্ভব । ধান সিজা হাঁড়ির মত এখনও কালো হয়ে আছে আকাশের এক কোন , বেশ এক বিরহ বিরহ ভাব জমেছে মেঘকোনে।

মা ফিরল, শালিক মা । যেমনটা মানুষে ফেরে শাবক টানে সমস্ত অতিক্রম করে, তবু এক যুগ কাটিয়ে যাওয়া জমি চিনতে পারলো না, মনে মনে ভাবে এই তো এই ছিল , ন্যাড়া জমি হল কি করে, একযুগের সংসার, ঘোরে আর ওড়ে তারপর ন্যাড়া ল্যাম্পপোস্টের মাথায় বসতেই গন্ধ পায় তার নাড়ি ছেঁড়া শাবকদের গায়ের। অস্থির হয়ে উঠে উড়তে যেতেই কচি পালক এসে লাগে তার পায়ে , নীচে আরো কচি পালক তখন বিছানা মেলেছে। হাহাকার করতে গিয়েও গলা ফোটে না, চোখ ফাটে না, কেমন যেন নিস্পৃহ চোখে তাকিয়ে থাকে,যেন এ সব তার ঘটনা নয় তবু সে দর্শক। হঠাৎ সেই কালো মেঘকোনে তাকায় সে তারপর ডানা ঝাপটে উড়ে যায় সেইপানে, কোথায় ?কে জানে? তখন অন্তিম মেঘেরা আর এক পশলার তোড়জোড় করছে , নেড়ি গুলো উঠে শুয়েছে সামনের রোয়াকে।


                                  অর্পিতা চৌধুরী

Wednesday, May 13, 2020

কবিতা ২৫

                   পরিযায়ী

এক সম্পর্ক থেকে আরেক সম্পর্ক,
         তারপর শূন্যতা।
ঠিক যেমন সমের পর আসে ফাঁক,
সেই  ' না তিন তিন না'র  মত
পরিযায়ী হয়ে হেঁটে চলে, অনন্তপথে  অবিরত ।

          কখনও তারা সর্পিল পথ
          কখনো সারিবদ্ধ রেলপথ
অথচ দেখো কেমন পূর্ণিমার চাঁদের মত
রক্তগন্ধে মাখো মাখো হয়ে পড়ে আছে               
                  এখন  নিশ্চিন্ত  চাঁদ ।
          সে জানে গন্তব্য এবার শেষ ,
               আর কোনো ফাঁক নেই
তাই নিশ্চিন্তে জিরিয়ে নেওয়া যাক দুই
                       চারিবার।

          যে চাঁদই দেখো না কেন
গ্ৰহনে বা অভিসারে, হৃদয় তো একটাই।
বারে বারে জন্ম নেয় তাই, মূহূর্ত জন্ম তরে
                 পরিযায়ীর মত
কখনও পড়ে থাকে গ্ৰহন রুটির মত, কখনও  টিপ হয়ে ঝলসায় রমনী কপালে।

        তবু দেখো হৃদয় তো একটাই,
          ঘুরে ঘুরে মরে, দুয়ারে দুয়ারে
               পরিযায়ীর মত ।


                   অর্পিতা চৌধুরী






Friday, May 8, 2020

মধ্যযাম ৩

             যা দেখি তাই লিখি
                            ৩

আজ বুদ্ধপূর্ণিমার থালা  চাঁদটা তে মাঝে মাঝেই মেঘের খেলা চলছে, এ যেন - মেঘে মেঘে এ মুখ শুধুই ঢেকে যায়, কাল আবার রবিঠাকুরের জন্মদিন , লকডাউনেও তার ছাড় নেই, পথে ঘাটে , দুয়ারে ,মাঠে আমরা কড়া নাড়িয়েই যাবো, এখন তো অফুরান সময় ,সেই যেন - জল পড়ে পাতা নড়ে, পাগলা হাতি মাথা নাড়ে র মত আমরাও শিং দুলিয়ে, গাল ফুলিয়ে আড়ং বাঁশি বাজিয়েই যাবো। সবাই যেন প্যাড, গ্লাভস পরে 'waiting for goddo' অথবা সেই অচেনা  'গুরু'র অপেক্ষায় কম্পমান । ছাই চাপা জীবনের এককনা লাল-কমলা- সবুজ আলোচনাই একমাত্র দিনযাপনের ফুলকি ।

আজ আমার বাগানে বোশেখের বেলকুঁড়িতে গাছ ভরে গেছে, ছোটো ছোটো মুক্তোদানা আমাকে ডাকছে আর আমি গাইছি - 'এ মনিহার আমায় নাহি সাজে' । একগাছ ফুল আমাকে মনে করাচ্ছে এক অন্য আখ্যান পত্র।

সেই কোন ছোটো বেলায় রূপনারানের তীরে এক ভিতরখানি গ্ৰাম আম,জাম,জামরুল,সবেদায় পুষ্ট আর কালবোশেখীর এঁটেল কাদায় নিমজ্জিত পায়ে হাঁটা আমার মাতুলালয়, যেখানে রাত ভোর থেকে মানুষ জন ,গাই গরু উঠে পড়ে আর অর্ধচন্দ্রাকৃতি গোবর নাতায় , লাল মেঝের কোলে ভোর থেকে একটা ঝিম ধরা উনুনে কালো মাটির সরায় কালো বালি তে একমুঠ চাল দিলেই ঠিক একগাছ বেলকুঁড়ি মুড়ি হয়ে ফুটে উঠে। কতদিন সেই বেলফুল ফোটাবার শখ আমিও পুষেছি মনে মনে, আজ এই বেলকুঁড়িগুলি যেন সে দৃশ্যপটকেই বিস্তৃত করছে ।

আমি যেন আজো দেখতে পাই, সেই বিস্তৃত রূপনারানের ঘেসো তীর, ডিঙ্গি নৌকা, ভরসন্ধের দুর পারের লাইন দেওয়া আলো, মাঝে মাঝে দুএকটা গারা গাঁথনির সামনে বাঁশ কঞ্চির  বেঞ্চি ,আর জোলো এঁশো বাতাস। ইঁটভাটা আর জোউরে ক্ষয়ে যাওয়া জমির ফাঁকে ফাঁকে এক একটা মেছো ডিঙ্গি রাত ভোরের প্রতীক্ষায় বাঁধা,রাত থেকে শুরু হবে তাদের কাজ ।পাইলেন আর বয়া গুলো ভাটির টানে ডুবছে আর উঠছে, ঠিক যেন কুগলুকানি খেলছে। ঘুম চোখে বাঁধানো পুকুর ঘাটে বসে দেখতে পাচ্ছি আমার নিরক্ষর দাদুর দুই হাতে দুই ইলিশ  আর কাঁধ গামছায় চিংড়া, মুখে বিশ্বজয়ের হাসি।

দাওয়ায় তখন নারকেল কোরার শব্দ , আর ভিতর কোন থেকে  নধর আলুভাজার গন্ধ গরম মুড়িকে রূপসী করছে।তাল গুড়ের গন্ধে ম ম করছে চারদিক।এ যেন কোন কালের কথা, যেখানে সময় ইচ্ছেমত এবাড়ি ও বাড়ি করে সময় কাটায়, এপুকুর ওপুকুর করে উথালপাতাল করে তারপর চোখ লাল করে লাল করকরে ভোলার ঝাল দিয়ে হুপুসহাপুস শব্দ তোলে।

ছোটো বেলাটা কেমন এক অদ্ভুত জীবন,গরমের ছুটি পড়লেই হয় দেশবাড়ি না হয় মামাবাড়ি, ন্যাড়ামাথায় ধানরোঁয়া চুল নিয়ে রেলের জানলায় নাক ঠেকিয়ে, রেল ক্যান্টিনের খোপ থালায় ভাত খেয়ে সে যেন এক সব পেয়েছির দেশ।

জানি, কালও ঘুম ভাঙ্গানোর টিকটিকি টা বিফল হবে, আর দেরীতে ওঠার মাশুল গুলো পঞ্চশর হয়ে ধাওয়া করবে। বেশ লাগে তখন, এই যে চমকানো ধমকানো উপদেশ , আছে বলেই তো মনে হয় শিকড়ে আছি, এই যে উৎকন্ঠা, এই যে বুড়ো বটগাছের মত আগলে রাখা,অহৈতুকি চিন্তা, কিচকিচ এগুলো আছে বলেই তো মনে হয় , ঘরে আছি, ছত্রছায়ায় আছি , বাইরে গাম্ভীর্য রেখে তাই ভিতরে ভিতরে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করি তাদের গজরানো। যেন সব বুঝি রসাতলে গেল এক্ষুনি । আমিও গুটিগুটি পায়ে ঘাড় নিচু করে শুনি, দিনটা ভালো হয়ে যায়।

এই  প্রতীক্ষা, এই উৎকন্ঠা ,এই  টান, এই তো ভালোবাসা, এই তো ঘর। মনে পড়ে যায় আমার বারেন্দায় বাসা করা টুনটুনি টাকে যে আজকাল একবাসাতেই চারবার ডিম পেড়ে পেড়ে বাসাটাকে 'নিশ্চিন্ত ঘর 'বানিয়ে ফেলেছে। সে যেন আমাকে ভরসা করে ছেড়ে যায় তার ঘরখানি , আর আমি আমার ভালোবাসার বারেন্দায় তার কিচকিচানির জন্য অনন্ত প্রতীক্ষা করি।

                    অর্পিতা চৌধুরী

Tuesday, May 5, 2020

মধ্যযাম ২


                  যা দেখি তা লিখি
                              ২
আজ আরো একবার এই মধ্যযামে নিশিডাকের মত এসে দাঁড়িয়েছি আমার আস্তানার ছাতে । পড়শী নেড়ীগুলো আজ কোথাও বেপথুমান। বুড়ো পাহারাদার কিছুক্ষণ আগেই লাঠি ঠুকে নিশ্চিন্ত করে গেছে, তার উপস্থিতি  অতএব 'আল ইজ ওয়েল' ।

তারা খচিত চাদরের উড়নি উড়িয়ে আমি শুয়ে রয়েছি আকাশ চাঁদোয়ার তলে। এ বড় নির্লিপ্ত সময়, এ সময় কারো প্রতীক্ষা করে না , শুধু উদাসীন দৃষ্টিতে আকাশ বারোয়ায় নির্নিমেষ তাকিয়ে থেকে প্রতীক্ষা করে, কিসের কে জানে? এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা প্রতিটি কোনায় কোনায় আলগা শিশিরের মত ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। যেমনটি ছোটবেলায় সকালবেলা ঘাসের ডগা থেকে আঙ্গুলের ডগায় শিশির মাখলে এক অবোধ আনন্দ জাগতো ঠিক তেমনি।

কেমন এক উদাসীন ভালোলাগা এই রাত অবেলার চারপাশে ঘুরঘুর করে মরে। কানে বাজে 'খন্ডন ভব বন্ধন/ জগবন্ধন বন্দি তোমায়' ।অথচ ঐ যে পাছাপেড়ে শাড়ির বুটিদার গায়ে চাপিয়েছি সেই প্রতিটি বুটি যেন শৈশবের কথা কয়, কিশোরী বেলার নলেন‌ জীবনের হাতছানি দেয়। বন্ধন মুক্তি কি এতই সহজ খ্যাপা ,এ শুধু খনিক জীবনের বাচালতা আর সর্বৈব ভন্ডামি ।
কি জানি, এ বুঝি বুড়িয়ে যাবার ডাক বিদায় বেলায় উঁকিঝুঁকি মারে। তবু এ রাত আমাকে আমার করে , আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধে পরম উষ্ণতায়, অসীম নির্লিপ্তিতে জড়িয়ে রাখি বুকে - দু হাত ভরে, বিশাল ব্যাপ্তিতে ক্ষুদ্রতা ঢাকি বিহানের তরে।

আধো ঘুমে আচ্ছন্ন আমি ঘুমজড়ানো মনে আধো শুনতে পাই সেই বুড়ো বৈষ্ণব ফাগুনের ভোরে গেয়ে যাচ্ছে গান-  শুক বলে ওঠো সারি / ঘুমাইও না আর , আমি ভুলে যায় এ ভরা শীতের ফাগুন নয় এ আমমুকুলের বোশেখ ভোর। অর্ধচেতনে লেপ খুঁজে বেড়াই , আর আমার শুক সারি রা স্বপ্নের  মধ্যেই ঘুরঘুর ঘুরপাক খেয়ে মরে আরো একটু ওমের আশায়।
                              অর্পিতা

Saturday, May 2, 2020

মধ্যযাম ১


                  যা দেখি তা লিখি
                             ( ১)

এখন মধ্যরাত, আকাশ ঘন মেঘের চাদর মুড়ি তে নেমে এসেছে ঠিক আমার ঠোঁটের কাছে । একটুকরো লোভী চাঁদ এখানে ওখানে উঁকি ঝুঁকি মারছে । আমার বর্তমান আস্তানার নিস্তব্ধ জানালায় দাঁড়িয়ে আছি মোহাচ্ছন্ন হয়ে। এ সময় যেন নিস্তব্ধ, নিশ্চল, বড়ই একান্ত। এখন আর কোনো পিছুটান নেই, নেই কোনো কর্তব্যকর্ম অথবা ফেলে রাখা কাজের পিছুটান। শুধু সামনে একটা পট আর আমি একমাত্র দর্শক পটুয়া ।

আমার  আস্তানার সামনেই একটা অশ্বত্থ গাছ আমার কিশোরীকাল থেকে দন্ডায়মান, এই কয়দিন আগেও সে নেড়া মাথা সর্বস্ব ত্যাগী সন্ন্যাসীর মত দাঁড়িয়ে ছিল অথচ আজ দেখো ষ্ট্রিট ল্যাম্পের হলদে ক্ষয়াটে আলোয় অল্প বয়সী কচি কিশোরীর মত এক গা কচি পাতায় সেজে উঠে নির্লজ্জের মত এ ওর গায়ে চিরচির ঝিরঝির করছে । দুএকটা পাতা সোনাঝুরীর মত খসখস করে ঝরে পড়ছে ।ওদের বেহায়াপনায় বিরক্ত হয়ে ওরই মাঝে আশ্রিত দুএকটা বক স্বপ্ন দেখে এপাশ ওপাশ করছে আর পড়শী পেঁচা গুলো কর্কশ স্বরে মধ্যযামের নির্ঘণ্ট ঘোষনা করছে ।

সামনের তিনমাথার মোড়ের ষ্ট্রীটল্যাম্পের মাথায় যে শালিকটা বারো মাস তিরিশ কাল বাসা বেঁধেছে সেও এখন শাবক সমেত ঘুমে কাতর । তার তলায় ৭-৮ টা পাড়াতুতো নেড়ী এ ওর ঘাড়ে পড়ে বেকার জীবন যাপন করছে। হঠাৎ একটা তরুন নেড়ী সদ্য সিং গজানো বাছুরের মত  নিজের পৌরুষত্ব জানান দিতে মাতৃকোল থেকে লাফ দিয়ে তারস্বরে চিৎকার করলো , সঙ্গে সঙ্গে তার জেঠা, কাকারাও সঙ্গ দিল শুধু মা সারমেয় আলসেমিতে শুয়ে রইল চোখ বন্ধ করে। কিছুক্ষণ পর বেপাড়া বাজদের তাড়িয়ে এসে আবার মায়ের কোলে , কয়েকজন এদিক ওদিক শুঁকে গোয়েন্দাগিরি করতে লাগলো, অথচ জানতেও পারলো না এই পড়ন্ত রাত্রিতেও কেউ ওদের পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

জানলায় দাঁড়িয়ে ভাবি এই যে অশ্বত্থ গাছ, সামনের আকাশটাকে ঝাপড়ে আড়াল করে রেখেছে তাকে যত দেখি ততই তার পাতার কুঞ্চনে, নাচনে, ঝিরঝির মিরমির শব্দে নদীর কলতান শুনতে পাই। যেন নিশ্চিন্তে কোনো ডিঙ্গি নৌকা বেয়ে চলেছে তার নির্ধারিত ঠিকানায় আদিগন্ত কাল ধরে আলসে গতিতে।সে নিশ্চিত জানে কালরাত্রির পর প্রথম সূর্যের
আলো ঝিলমিলাবে কিশোরীর শ্যাম্পু খোলা চুলের মত

আবার রাতের প্রতীক্ষা। একান্ত সেই রাত, যে রাতের কাঁধে ঠোঁট রেখে ফিসফিসিয়ে কথা বলা যায়, যেখানে কোনো লকডাউন নেই ।
                       অর্পিতা

Saturday, April 25, 2020

কবিতা ২৪


               পোয়াতি হও পৃথিবী

আমরা আমাদের নিদ্রা নয় , জাগরন হয়ে গেছি
বুড়ো পংক্তি গুলো যতই টান মারুক,
মনবিলাসের প্রশ্নের থেকেও
কুচোকাঁচাদের গান বড় স্বপ্নিল আজ ।
এ বড় সংসারী সময় , তাই রেঁধে বেড়ে , ঝুল ঝেড়েও পোয়াতি সময় ঘরময় ঘোরে ,
জঠরের দামাল শিশুর মত ।
প্রতীক্ষায় থাকে মিটিমিটি , রাত্রির ।

রাতের কাঁধে হাত রেখে দূরত্ব বজায় রাখি ।
মুখের কাপড় এঁটে প্রেম করি আভরনহীন ।
আজ আর ওষ্ঠরঞ্জনীর প্রয়োজন নেই,
জায়গা আজ দখল হয়েছে ,না তোমার নয় -
এক অভেদ্য পাহাড়ী কুয়াশা আশ্রয় নিয়েছে আজ দুই ঠোঁটে ওষ্ঠরঞ্জনী হয়ে ।

এসো- দিন হই ,রাত হই, না হয় দুপুর  ,
দেখা হোক, না হোক বাজুক নূপুর ।
ক্ষনে ক্ষনে এসেছে বরষা , এ নব বৈশাখে ।
তবু বসন্ত মনে মনে, ঝরে যাক, ঝরে যাক
সব বুড়ো অমলতাস, বিছিয়ে থাকুক সমস্ত শরীর জুড়ে, যেমন করে ঘাসেরা মাটিকে বিছায় , আঁকড়ে ধরে , জড়িয়ে থাকে, ছড়িয়ে রাখে বুনো ফুলের গন্ধের মতো বেড়ার ধারে, ঝোপেঝাড়ে ,অন্ধকারে ফুটে থাকে ড্যাবডেবিয়ে পড়ন্ত সন্ধ্যায় ।
অথবা মাথার খোঁপার পরে আদুরে ললনার মত ।

               রাত্রি হতে চাও ?
দিলাম একটা নীল পৃথিবী যেখানে‌ পশু চরে মানুষের মত, আর মানুষ হাততালি দেয় , অসহায় শব্দ তার ।
এসো একসাথে থাকি , দূরত্বে থাকি ,
অনন্ত ঠোঁটের অথবা জঙ্ঘারামের ফাঁকে ফাঁকে কলমীলতাদের সাজিয়ে রেখে বলি -
         জল হও নদী , জল হও ।
গড়িয়ে পড়, ছড়িয়ে পড়, সর্বাঙ্গ সিঞ্চিত কর ,
তারপর ধৌত করে দিয়ে যাও
ভোরের শুকতারার মত জ্বলজ্বলে করে,

শঙ্খবেলার মত সেই ভোরের বালুকাবেলায়,
যেখানে ইলিশেরা লাফ দেয় জীবনের আশ্চর্য পতন , সেই ভোর, সেই পোয়াতি ভোর ,
ধীরে ধীরে বিকশিত হোক আবার জীবনে ।

                  অর্পিতা চৌধুরী

Tuesday, March 31, 2020

কবিতা ২৩

                    সংক্রমন


কাঁটা খোঁচা স্বপ্ন গুলো একটু একটু করে        জোড়া লাগছে ,
অথচ তুমি বুঝতেও পারছো না।
সংসারিক ফুটিফাটাগুলোও জোড়া লাগছে নিঃশব্দে, আবার আগের মতন ।
বাসন মাজা কেজো হাত গুলো আবার মসৃণ হয়ে উঠছে সেই পুরনো বেলার মত।
দাম্পত্য বোরোলিনের ছোঁয়ায়, স্নিগ্ধ আঁচলের হলুদ বাস আজ বিশ্ব শঙ্কাকেও দূর করে ।


আমি দেখতে পাচ্ছি, জানালার পাশে বসে রয়েছো তুমি সুদুরপানে , পাশে পড়ে নিস্তব্ধ কলম।
যা লিখছো, ভাবছো অনেক বেশি, দেখছো তারও কম ।
শুধু অতি পরিচিত এক ফেনা গন্ধ দিয়েছে তোমাকে নিশ্চিত অবকাশ ।
চলে নীল শাড়ি নিঙাড়ি নিঙাড়ি
        পথ পানে চেয়ে থাকি।

 
                           অর্পিতা

Friday, March 27, 2020

কবিতা ২২

             কয়েদবন্দীর রোজনামচা

                             ১
            আজ সকালেই তুমি এসেছিলে,
                               স্বপ্নে
     অথচ, তোমাকে জড়িয়ে ধরা তো দূর
                ছুঁতেই চাইলাম না ,
           ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, তোমাকে
             সুস্থিত নীড়ে ফেরাবার জন্য।

                                   ২
        এখন ভালোবাসাটাও হয়ে গেছে চার
                      দেওয়ালে বন্দী ।
      কোথাও তার লাফালাফি , ঝাঁপাঝাঁপি নেই,
       পরম সুস্থিত, পরিপাটি, বাগানো, গোছানো
           একবার করে শুধু বেঁচে থাকার
                   শব্দতরঙ্গেই বন্দী ।
           ।     ঠিক যেন ধ্যানরত বুদ্ধ ।

                              ৩
    আমাদের ভালোবাসা এতটাই গভীর যে
   একে অপরকে সর্বদাই মনে করিয়ে দিই,
        যাও কর্তব্য কর, তারপর ভালোবেসো ।
        আমাদের দায়িত্ব এতটাই গভীর যে,
         দায়িত্বটাকেই ভালোবেসে ফেলেছি ।

                                ৪
     বাগিয়ে গুছিয়ে বাঁচার মত অবসর কই?
     আমরা তো আর পারিনা কার্ফু লাগাতে।
বলতে পারিনা সজোরে, দায়িত্বরা ঘর ঢোকো
        এবার আমরা একটু ভালোবাসবো ।

                                 ৫
     সেই ঝর্না, পাথর, জঙ্গল সবই আছে ,
                 শুধু মানুষ ,ঘরবন্দী ।
মনবন্দী তো নয় ? তাই মাঝেমাঝেই উড়াল দিই
                         সেই স্বপ্নপারে ।

মনমাঝি তোর বৈঠা নে রে, আমি আর বাইতে                          পারলাম না ।



                           অর্পিতা






Thursday, March 26, 2020

কবিতা ২১

                   মানুষসোর

আবার কোনো একদিন গভীর অরণ্যবুক হতে
অথবা প্রস্তর গুহায় অগুনতি জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া যাবে।
সেই হাড়গোড়, জীবাশ্চর কান্নায় উঠে আসবে আরো এক সিন্ধু সভ্যতার গল্প ,
নাম হবে মানুষসোর ।

ডাইনোসরের মতই তারা হাহাকার করে বলবে,
আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী ছিলাম,
আমরা ,পৃথিবীতে সবচেয়ে স্বার্থপর প্রানী ছিলাম।

আর তখন গাছপালার ভিতর থেকে পাখপাখালিরা গান ধরবে- ছিলাম, ছিলাম, ছিলাম।
আর আমরা - আছি, থাকবো, থাকবো।

                        অর্পিতা

                   মানুষসোর

আবার কোনো একদিন গভীর অরণ্যবুক হতে
অথবা প্রস্তর গুহায় অগুনতি জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া যাবে।
সেই হাড়গোড়, জীবাশ্চর কান্নায় উঠে আসবে আরো এক সিন্ধু সভ্যতার গল্প ,
নাম হবে মানুষসোর ।

ডাইনোসরের মতই তারা হাহাকার করে বলবে,
আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী ছিলাম,
আমরা ,পৃথিবীতে সবচেয়ে স্বার্থপর প্রানী ছিলাম।

আর তখন গাছপালার ভিতর থেকে পাখপাখালিরা গান ধরবে- ছিলাম, ছিলাম, ছিলাম।
আর আমরা - আছি, থাকবো, থাকবো।

                        অর্পিতা


Friday, March 20, 2020

কবিতা ২১


      অর্ধরাত্রির  গান

শাবকের কাছে ঘৃনিত জেনেও
যে মাতা বিবর্ণ বসন্ত বহন করে না ,
তাকে আর যাই বলো ,
বুদ্ধিমান বোলো না ।

চন্দন গন্ধ বুকে রেখেও যে নারী চন্দনী হল না,
সেখানে নারীদিবস আর গরুর বিয়ে সমার্থক ।

আঙ্গুলের ফাঁকে ফাঁকে যখন শাল ফুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়,
তখনও যেন দুর থেকে বেদবানী  ঘৃণাগুলো ঝরে ঝরে পড়ে,
অনিশ্চিত কাব্যের মত ।

প্রান্তিক আলুরা ঢিবি হয়ে পড়ে থাকে প্রান্তবেলার মাঠে, ঘরে ফেরার আশায় , পলাশতলির পাশে পাশে ।


তখনও কারো পৌঁছনোর তাড়া, কারো বা ফেরার,
তবু অফুরান জিজ্ঞাসা প্রশ্ন চিহ্নের মতো পাক খায় -
এখনও ঘৃনাদেরকে গুছিয়ে রাখতে পেরেছো তো পরিপাটি করে ? খাপে খোপে সযতনে ?
শুনতে‌ পাচ্ছো? জেগে আছো কি? অনন্তকাল-
           
         লেখনী - অর্পিতা চৌধুরী

Monday, March 2, 2020

কবিতা - ২০


                         পিতৃভূমি
জানো, এটা আমার  জন্মভূমি নয়, পিতৃভূমি।
এখানে আমি বড় হইনি , তাই এখানে আমার কোনো শৈশব নেই।
নেই কোনো কৈশোর বা কিশোরী বেলার প্রেম।
তবু যখনই ফিরে ফিরে আসি,
স্মৃতিচিহ্নের মত লম্বা টানা বারান্দা,টিমটিমে হ্যারিকেনের আলোয় কচিকাঁচাদের পাত পেড়ে  সার সার মাথা, আর হাতপাখা গুলো প্রশ্ন চিহ্নের  মতো দুলতে থাকে, দুলতেই থাকে ।
এখন আর কোন রাগ নেই, ভাগ নেই, চিৎকার ক্যাঁচ ক্যাঁচ এমনটি বাসন মাজার শব্দ টুকুও নেই।
সব যেন শালগ্রাম শিলা, নিটোল নিশ্চুপ।
এমনকি পায়রা, কাকগুলোও ভদ্রলোকের মত ঘড়ি ধরে এসে খেয়ে যায়।
সবকিছু নিটোল নীরব ।
এখানে তুমি নেই, আমি নেই , নেই কোন প্রশ্নচিহ্ন।
সারি সারি তালা বন্ধ ঘরেদের পিছনে নেই কোনো অদেখা রহস্য,
তবু বড় নিশ্চিন্ত হই।
রঙচটা জামায়, না আঁচড়ানো চুলে এলোমেলো দিনযাপন বড় প্রিয় আমার।
এ যেন এক অন্য সুখ, শুধু একার, চেটেপুটে খাওয়ার।
ঝরাপাতার মত ঝরতে ঝরতে ,
যখন নিশ্চিন্তে বিছিয়ে থাকি,
তখনই তো আনন্দ,
এ পুজো আমার ,একান্ত আমার, নিজস্ব ।
               লেখনী- অর্পিতা চৌধুরী

Friday, January 24, 2020


        ছাড়িয়ে থাকো জড়িয়ে রাখো

তোকে ভালবাসি বলেই অলিন্দের ছায়া গুলো এত দীর্ঘায়িত হতে দিই, সূর্য ধরতে যাই না।

তোকে জড়িয়ে থাকি বলেই আর খিড়কি পথে পালানো হল না, জানালা গরাদ আমার বড় প্রিয়।

শীতের রাতের ওম চাই বলেই পৌঁছে গেছি জঙ্গলে ডালপালা দের কাছে, সেঁকে নিচ্ছি গা,
একটু উষ্ণতার জন্য।

তোকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে চাই বলেই, পাঠিয়ে দিই শিকড়ের কাছে, যেন শিকড়ে লাগে টান কোলবালিশের মত।


মৃদুমন্দ পড়ন্ত বেলায় বাঁকের সিঁথির পরেও যে বাঁক থাকে, হাত ছেড়ে দিই তোর নরম ওষ্ঠাধরের মত, শুধু ভালোবাসি বলে ।


তোমার হিমেল রাতের উষ্ণতা, তোমার নরম ওষ্ঠাধর, তোমার নীরব শীতঘুম আর আদরের ওমে জড়িয়ে থাকা রাতকলিরা ঘুমিয়ে থাকুক পরম প্রাপ্যতায়, জড়িয়ে থাকো , জড়িয়ে থাকো।

রাধা ভাব দ্যুদ্য             অর্পিতা চৌধুরী

Saturday, January 4, 2020

মুহূর্তে বাঁচো

              মুহূর্তে বাঁচো

অনেকদিন আলো পড়েনি, হৃদয়ে সোঁদাগন্ধ, কেমন যেন চিমসে, মিসকে মত,
অজান্তেই নাক কুঁচকায় ঘন কুয়াশায়।

যে পথ বেঁকে গেছে সেখানেই একটা টিলা,
খুব ছোট তবু অনতিক্রম্য।

দেখতে পাচ্ছো আগুন জ্বলছে-
দেখতে পাচ্ছোওও
শুনতে পাচ্ছো কি ওদের হাড়কাঁপানো ঠকঠকানির গান।
তিনটে বুড়ো, তিন ভাই ওরা,আপাদমস্তক চাদরমুড়িতে  ওম নিচ্ছে, মুখ তাদের আবৃত।
আমি ওদের নাম দিয়েছি অতীত- বর্তমান- ভবিষ্যত।

পাশাপাশি এত কাছাকাছি তবু টিলাটা অনতিক্রম্য।
ভাবছি, একটা বুলডোজার অথবা ডিনামাইট দিয়ে টিলাটাকে গুঁড়িয়ে একেবারে মিশিয়ে দেব, তারপর ওদের তিনজনকে একটাই নামে ডাকবো- মুহূর্ত ।


      লেখনীতে - অর্পিতা চৌধুরী