Wednesday, March 31, 2021

অবান্তর ৫৬

                  পর্ণমোচী




এসো না পর্ণমোচী  তোমাকে একটু একটু করে চিরহরিৎ  সাজাই,

একটা একটা করে পাপড়ি খুলে ফেলে ওষ্ঠকোরক রাঙিয়ে তুলি,

ঐ যে দুরে যেখানে শিশিরেরা বৃষ্টিফোঁটায় পড়ছে ঠিক অমনি করে ভিজিয়ে রাখি তোমায় শিশির সিক্ত গভীরতায়।

তোমার শিৎকার, লজ্জা, পর্ণমোচন সমস্ত, 

সমস্ত এমনকি তোমার থেকে ধোঁয়া ওঠা শিরিষ ফুলের বাস ,

সমস্ত কিছু কে চিরহরিতে সাজিয়ে দিই একটু একটু করে আমার তুলির আঁচড়ে, রঙে আর মনের ছটায়।



তারপর! 

দেখবো তুমি আর কতবার পর্ণমোচন করতে পারো, কতবার ঝরতে পারো ?

চিরহরিতের সবুজ দেখে কতবার তোমার অপ্রেম নিস্তব্ধ হতে পারে ,

আমি তো একা নই,

তোমার প্রেম, তোমার অপ্রেম, তোমার অবহেলা, তোমার বিসর্জন সব নিয়েই আমি পরিপূর্ণ চিরহরিৎ।

ঐ কাঁসায়ের তীরে হাত বাড়াও,

দেখো কুসুমের লাল পাতারা তোমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে, বিছানা করে থাকা শালফুল ,

অপ্রেম , চিরহরিৎ হও ---- 


Thursday, March 25, 2021

একা বাড়ি অনেক গলি

 এক আশ্চর্য ছাদের বামন হওয়ার গল্প




আমাদের ছোটো বেলায় গরমের ছুটি আর পুজোর ছুটিতে একটা গ্ৰামের বাড়ির গল্প ছিল, না, তখন ছুটি পড়লেই বাবা - মায়েরা অন্য কোথাও যাওয়ার প্ল্যান করতো না। ছুটি পড়লেই পরদিন ভোরে বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে ঘুম চোখে রওনা দিতাম এক মাসের জন্যগ্ৰামের বাড়ি অথবা খুব জোর তার মধ্যে তিন থেকে চার দিনের জন্য মামাবাড়ি। আমাদের ছিল  জমকালো ছবি বিশ্বাসের মত পেল্লায় মোটা মোটা বিশ পঁচিশ ইঞ্চি দেয়ালের  এক জাবদা চুন সুরকির খিলান দেওয়া গুরুগম্ভীর বাড়ি, গ্ৰামের শেষ প্রান্তে একটেরে‌ সাদা খিলান দেওয়া বাড়িটা ঘাড় উঁচু করে ছবি বিশ্বাসের মতই আভিজাত্য নিয়ে বেশ কিছু গিজগিজে লোক নিয়ে গমগম করে দাঁড়িয়ে থাকতো, লোকে বলতো ' বাবুর বাড়ী'।


এই বাড়ির অন্দরমহল কিসসা অন্যদিন শোনাবো, তবে এই পেল্লায় বাড়ির এক পেল্লায় ছাদ ছিল , আজ সেই ছাদেরই গল্প বলবো - 

ছাদটা প্রায় পনেরো ইঞ্চি মোটা দেওয়াল দিয়ে বেশ আঁটোসাঁটো করে প্রায় দেড় মানুষ উঁচু করে ঘেরা ছিল, আর এর গায়ে ছিল একটা করে ইটের মাপে কুলুঙ্গির মত ছোটো ছোটো খোপ। বেশ একটা পর্দানশিন ব্যাপার। মানে হল ঐ খোপ দিয়েই সামনের রাস্তাটা দেখা যেত অথচ ভালো করে খেয়াল না করলে বাইরের লোক দেখতে পেত না। বেশ একটা আদিকালের পূর্বরাগ পূর্বরাগ ব্যাপার।


তবে সবচেয়ে এর আকর্ষন ছিল, এর খোলামেলা বিস্তৃতি। যতটা না বড় তার থেকেও এর চারপাশ  শুধু না  বহু বহু দূর পর্যন্ত ধু ধু করে অনায়াসে দেখা যেত, যা নিমেষে ছোটো ছোটো মনগুলোকে অনায়াসে ভরিয়ে দিত। ছাদের দেড় মানুষ সমান উঁচু কার্ণিশ ধরে দাঁড়ালেই সামনের শান্ত শিলাবতী পার হয়ে কুমারীর সিঁথির মত আলপথ পার হয়ে ও পারের গ্ৰামগুলির বাড়ি, চাষাদের চাষ আর এ বাড়ির সেজ কর্তার গাঁয়ের পারের মাঠের মাঝের একলা সাদা স্কুলবাড়ীটি এক মনোহর চিত্রপটে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতো।পুবদিকে তাকালে নেড়া আমড়া গাছটার ডালে দুটো প্যাঁচা বসে বসে ঢুলতো,তাদের ছাড়িয়ে চন্দন গাছের মাথা ছুঁয়ে, আঁশ শ্যাওড়া আর নারকেল গাছের মাথা ছুঁয়ে খোপ কাটা এ বাড়ির সবজি বাগান আর ডোবা ছাড়িয়ে এ বাড়ির চাষের খেত অলস ভঙ্গিতে শুয়ে থাকতো। এ সব দেখতে দেখতে যদি দক্ষিনে যাও দেখতে পাবে বাজ পড়া তালগাছটার নীচে একটা মাছরাঙ্গা খিড়কি পুকুরের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বসে আছে, ও পাশের ছোটো পুকুর থেকে আজন্মকুমারী টুনি গা ধুয়ে আসছে এ বাড়ির বিষ্ণু মন্দিরে প্রদীপ সাঁজাবে বলে। একটু আগেই টুসির মা একরাশ শুকনো জামাকাপড় ঘাড়ে গর্দানে  করে  ছাদ শুন্য করে দিয়ে তুলে নিয়ে গেছে


এখন বড় শান্ত সময়, পৃথিবীতে গোধূলি নামছে, বিষ্ণু মন্দির থেকে ঝাঁঝ ঘন্টার আওয়াজ আসছে, শালগ্ৰাম শিলার শয়নের সময়  হল, একটা দুটো করে তারা ফুটছে আকাশে। বড় মন কেমনের সময়, হাতের চেটোয় ভর দিয়ে যদি চিৎ হয়ে শুয়ে থাকো ছাতের বুকে তাহলে আস্তে আস্তে সমস্ত আকাশ চুপ করে তোমার বুকের পরে নেমে আসবে, বয়ঃসন্ধির মন উদাসের কালে নিজের অজান্তেই দু ফোঁটা আবেগ জল বিনা কারনেই টুপটুপ করে ঝরে পড়বে কোন বেয়ে , আর ঠিক এই মনকেমনের উদাস কালেই  আসবে দূর্বাসার বানীর মত মাতৃদেবীদের সন্ধ্যাকালে পড়তে বসার আহ্বান। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অবজ্ঞা করার সাহস‌ নেই বলেই হয়তো ফিরতে হবে নিম্নপানে পরের দিনের আবেগ অবশিষ্ট রেখে।


আজ বাড়ির সেদিনের কচিকাঁচা গুলো বড় হয়ে গেছে, বাড়ির কর্তারা বৃদ্ধ হয়েছে, আর প্রায়  দেড়শত বছরের জীর্ণ বাড়িটার দেওয়ালে ছাদে  ঝিরঝিরে চিড় ধরেছে। মাঝেমাঝেই তার শুশ্রুষা চলছে তবে এখন ছাদ বাঁচানোর লড়াই। তাই হাল ফ্যাশনের জাবদা একটা ঢাকনা ওর মাথায় পরিয়ে দেওয়া হয়েছে, দেখতে হয়েছে ঠিক যেন প্যাগোডা বাড়ি কিংবা টোপর পরা বর এর মত।এর আগেও বাড়িটার গাত্রমর্জন হয়েছে,‌চুন সুরকির সাবেক কালের খিলান গিয়েছে খসে, বদলে এসেছে ছিমছাম আধুনিক পলেস্তারা। তবে এর আগে এমন লজ্জা আর দুঃখ কখনো পায়নি বাড়িটা। তার মাথা রক্ষা হয়েছে, তার আয়ু বৃদ্ধি হয়েছে ঠিকই কিন্তু ছবি বিশ্বাসের সেই গাম্ভীর্য, সেই একআকাশ বিস্তৃতি হঠাৎ করে যেন কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। এখন আর দুরের গ্ৰাম সামনে মনে হয় না, আকাশ টা ঢেকে গিয়ে ছাতটাকে যেন বড্ড ছোটো করে দিয়েছে একলহলায়। সব বড় আপন ছিল, এক লহমায় সব পর হয়ে গেছে। চোখের ছোঁয়ায় যে মন ছোঁয়াছুঁয়ির খেলা ছিল তা হারিয়ে গেছে টিনের চালের ফাঁকে। এখন আর চিৎ পাতলেই আকাশ দেখা যায় না, তারাদের ছোঁয়া যায় না, তারা এখন বড্ড অভিমানী , তাই সরে গিয়ে ভাব করেছে নদীর বালির সাথে। 


ও চাঁদ, ও নদী , ও প্রান্তর  সামলে রেখো জোছনাকে ।


Monday, March 22, 2021

অবান্তর ৫৫ বুঝতে চাইলে বুঝছে কে

 


   বুঝতে চাইলে বুঝছে কে



জানি 

ফিরতে হবে

সময় বয়ে যাচ্ছে

দীর্ঘ হচ্ছে ধূলিপথ

আস্তরন পড়ছে।



বুঝছি 

প্রস্তুত হও

ছায়ার সামনে দাঁড়াও

আয়না পেছনে রাখো

মুখের সামনে মুখ ধরো



শক্ত হও

বেলা বাড়ছে

কুয়াশারা কু- আশা ছেড়েছে আগেই

শুধু তুমি !



ছেড়ে

ফিরতে হবেই

কাঁকুরে বন্ধুর পথ

রক্তাক্ত হও অথবা হামাগুড়ি

ফেরার পথ খোঁজো ।




মনকে

বোঝাও, 

অবোধ , পোষ মানে না

বন্দী করে,

প্রয়োজনে, চাবুক

কেটে কেটে ঝরুক রক্তাক্ত হৃদয়।



যারা

বোঝে বেশি

তারাই বোকার দল

এবার মূর্খ হও

একটু বেশি।



দুঃখ 

হবে,  

বিদ্রোহের আর এক নাম 

দুঃখ 

পোষা বিড়ালের মত 

ওর পিঠে হাত বোলাও। 



এক হাত

শেষ হয়ে আসছে

তালি থামাও

ক্ষয় হাতে তালি 

হয় না

অজুহাত থামাও।



নিঃশ্বাস

নাও, শুধু জোরে

আরও জোরে

সব বায়ু

নিঃশ্বাসে ফুঁকে দাও।



শুধু

বোঝ, ফিরতে হবে

হবেই,

একেবারে নিঃস্ব হয়ে।








   বুঝতে চাইলে বুঝছে কে



জানি 

ফিরতে হবে

সময় বয়ে যাচ্ছে

দীর্ঘ হচ্ছে ধূলিপথ

আস্তরন পড়ছে।



বুঝছি 

প্রস্তুত হও

ছায়ার সামনে দাঁড়াও

আয়না পেছনে রাখো

মুখের সামনে মুখ ধরো



শক্ত হও

বেলা বাড়ছে

কুয়াশারা কু- আশা ছেড়েছে আগেই

শুধু তুমি !



ছেড়ে

ফিরতে হবেই

কাঁকুরে বন্ধুর পথ

রক্তাক্ত হও অথবা হামাগুড়ি

ফেরার পথ খোঁজো ।




মনকে

বোঝাও, 

অবোধ , পোষ মানে না

বন্দী করে,

প্রয়োজনে, চাবুক

কেটে কেটে ঝরুক রক্তাক্ত হৃদয়।



যারা

বোঝে বেশি

তারাই বোকার দল

এবার মূর্খ হও

একটু বেশি।



দুঃখ 

হবে, 

আন্দোলনের আর এক নাম 

দুঃখ 

পোষা বিড়ালের মত 

ওর পিঠে হাত বোলাও। 



এক হাত

শেষ হয়ে আসছে

তালি থামাও

ক্ষয় হাতে তালি 

হয় না

অজুহাত থামাও।



নিঃশ্বাস

নাও, শুধু জোরে

আরও জোরে

সব বায়ু

নিঃশ্বাসে ফুঁকে দাও।



শুধু

বোঝ, ফিরতে হবে

হবেই,

একেবারে নিঃস্ব হয়ে।
















Sunday, March 21, 2021

অবান্তর ৫৪

       বসন্ত গরল

 

তুমি কি দেখতে পাচ্ছো ?

আরও একবার পীতধড়া গলে তোমার শাল পলাশেরা মেতে উঠেছে,

বিছিয়ে দিয়েছে তাদের আঁচল ,

বুকের বসন খসিয়ে।



আবার ঘুম ভাঙ্গছে সেই নির্লজ্জ অজগরটার,

জানলা‌ পাশে এক পড়শী পলাশ রোজ ফুসমন্তর ডাকে,

বিছিয়ে দিয়েছে তার অনন্ত কামনা ঝরে পড়ার আগে।

অজগরটা আবার এগোচ্ছে--

তার অতীত ভুলে, তার গরল ভুলে,

এ যে নিশিডাক , কুহকিনী মায়া,

বন্ধ জানালার ফাঁকে কান ভরে যায় ,

ওরে আয়, ওরে আয় 

এ উচাটন, না বশীকরন?



জানে‌ সে বসন্তেই মরন,

প্রতি বসন্ত তাকে নতুন করে মারে ,

তারপর আবার একটু একটু করে সঞ্চিত করে জীবনের সঞ্চয়,

আগামী বসন্তে নিঃস্ব হওয়ার জন্য।


Wednesday, March 17, 2021

অবান্তর ৫৩

 

            সর্বদা প্রস্তুত থেকো

আমাদের কখনো অপ্রস্তুতে দেখা হয়নি।
যেমন, খুব শীতকালে লেপের তলায় কুকুর কুন্ডলী হয়ে,
অথবা গ্ৰীষ্মের দাবদাহে ঘামাচি ভর্তি গাল আর হলুদ ছোপা জ্যালজেলে শাড়িতে,
কিংবা ধর , আধখোলা গামছা জড়ানো গা আর হাতে মাজন।


আমাদের কখনো দেখা হয়নি হাঁড়ি কড়া সাজিয়ে পা ছড়িয়ে ক্লান্ত হাঁ খাওয়ার সময়।
সত্যিই কখনো দেখা হয়নি নাক ডাকার সময় অথবা নাক খোঁটার সময়।


তখন জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে গা,
আচ্ছন্ন লালারা নামছে কষ বেয়ে ,

তখনো তোমার পাশে থাকা হয়নি আমার।


এরকম বহু বহু প্রাগৈতিহাসিক সত্যের সঙ্গে ঘর করা হয়নি আমাদের।
গরমে ঘামাচিতে আঙ্গুল চালানো, কিংবা শীতে বিসদৃশ হাঁচি কোনোটাই পরিচয় করেনি আমাদের সাথে।


অথচ-
আমরা কেমন এক সুশীতল মনোহর শীতলপাটি বিছিয়ে চলেছি,
সুগন্ধে, পরিপাটিতে ,নির্দিষ্ট টেবিল চেয়ারে ,কাঁটা চামচের সজ্জায় ,দৈন্যতা গুলো একে একে  সাজিয়ে রেখেছি নিপুন হাতে।
আমরা আসলে কোনো আচম্বিতেই দেখা করিনি,
নির্দিষ্ট সময় ছাড়া কখনো দেখা হয়নি  আমাদের।
পরিপাটি সজ্জাতেই আমরা শোকের ঘরে শোক ভোলাতে গেছি।

অবান্তর ৫২

               প্রবঞ্চনা




চোখের কোনে  কালি সাজিয়ে কি যে সুখ পাও,

রাত কালি বলে যে অনেক কথা,

হৃদয়ে মরন নিয়ে ভালো থাকা যায় ?

জেগে থাকা? 

সেতো প্রবঞ্চনা।


স্বার্থপর,

 সুখ ভোলাতে, নিজেকে ভোলাও।

মুখে বল ভালো আছি,

সে তো বেঁচে থাকা,

কি যে সুখ পাও?

কেন দুঃখকে দুখীতে জড়াও,

কি যে সুখ পাও?


অবান্তর ৫১

           দর্শন ঊবাচ



আমি যখন তোমাকে ভাবি 

আসলে আমি তো নিজেকেই নিজে ভালোবাসি


আমি যখন তোমার বিরহে মরি

আসলে আমি তো নিজের সায়রে ডুবি।


আমি যখন মরি অভিমানে।

আমার আত্মা আমার জন্যই কাঁদে।


আমি যখন শোক উগরে দিই

আসলে তো নিজেকে নিজেই প্রলেপ লাগাই।


আমি যখন ঝগড়ুটে হই,

সে তো তোমার সঙ্গে ঝগড়া নয়,

নিজের সাথেই নিজের বাঁধন কাটি।


রাধা ভাব দ্যুতি সুবলিতম নৌমি কৃষ্ণ স্বরূপম।


Tuesday, March 16, 2021

অবান্তর ৫০

                   ইচ্ছে বাঁচা



কত যে কাজ বাকি অথচ দিন চলে যায়,

তোমাকে বাসবো ভালো  সময় কোথায় ?

ভাত চড়াতে ডাল ভুলে যায়, ডাল ভুলতে পড়া,

পড়া পড়ার খেলনাবাটি কেবল শিলনোড়া।

আজ পেয়েছি কাল পাইনি কালের ঘরে চাঁটি, 

চাঁটির ঘায়ে টলতে টলতে দিন হয়েছে মাটি।


আজ পেয়েছি কাল পাইনি জীবন হল ভোর,

হিসাবনিকাশ জলাঞ্জলী ,

 মাচায় সব  তোল।

জীবন ভোর হিসাব নিকাশ কালের ঘরে মাটি

চলো এবার নিজের মত ইচ্ছেতেই বাঁচি। 


Monday, March 15, 2021

অবান্তর ৪৯

       কি কথা যে বলি?



প্রতি রাতে এক একটা চাঁদ ক্ষয়ে যায় ,

প্রতিটা বসন্ত বলে সময় বড় কম,

তবু নিজের সাথে নিজের কথা ,

বলে চলি, বলেই চলি,

এ চলার  শেষ নেই

অজর, অমর, অক্ষয়, অন্তহীন।


সমস্ত কোলাহলে নির্বিবাক চেয়ে থাকি,

মুখে মিচকে হাসি

মনে মনে কথা বলতেই থাকি,

চলতেই থাকি দৈরথ সত্বায়।

কি জানি কখন ,মনে মনে কি ভাষা খুঁজি নিরলম্বতায়,

নিজের সাথে নিজে চলতে থাকি, চলতেই থাকি।


গল্পঅল্প ৩

 

       পরকীয়া ২


সকাল ১০টা,
স্থান - মানসিক বিভাগ, আর জি কর হাসপাতাল
ইতিমধ্যে উপচে পড়ছে ভিড়, বারে বারে তাদের ফাঁকা করা হচ্ছে কিন্তু রোগীর থেকে রোগীর বাড়ির লোকের উৎপাত বেশী। আমি সাইক্রিয়াটিক বিভাগের নুতন ট্রেনী, আমার কাজ ডাক্তারবাবু আসার আগে সমস্ত রোগীর বিস্তারিত বিবরন অর্থাৎ বায়োডাটা কালেক্ট করে রাখা।
একে একে কাজ সারছি, এমন সময় এক মাঝবয়সী মহিলা কে প্রায় জড়িয়ে নিয়ে এলেন আরেক মধ্যবয়সী উত্তীর্ন মহিলা,পিছনে  ৫৫ -৫৬র একটি লোক। মহিলাটিকে বসতে বলতেই সে নিমরাজি হল,এবং সন্ধিগ্ধ চিত্তে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল, তখন সঙ্গী লোকটি সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখি তার হাত ধরে শান্তশিষ্ট হয়ে বসে পড়ল। আমিও রুটিন মাফিক জিজ্ঞাসা করলাম,
নাম - অন্য মহিলাটি উত্তর দিল, প্রতিমা রূইদাস।
এবং একে একে রোগীর বিবরন নেওয়ার পর রোগীর সাথে আগত মহিলার রিলেশন জিজ্ঞাসা করলাম, মহিলাটি মাথা নামিয়ে বলল, তারা সম্পর্কে কেউ না।
একটু কেমন যেন কৌতুহল হল।ভদ্রলোকের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম তখনও প্রতিমা রুইদাস নিবিড় ভরসায় হাতটি জড়িয়ে রেখেছে আর লোকটি পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। লোকটিকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলাম , ওর স্বামী? উত্তর পেলাম - আমার স্বামী। ব্যাপারটা ঠিক মত না বুঝেই বলে ফেললাম, বুঝলাম না।
আগের মতই নিচু স্বরে মহিলাটি যা বললেন তার মর্মার্থ ‌করলে দাঁড়ায় -
শিবরাম বায়েন আর পুতুল বায়েনের দেওয়াল ঘেঁষা সোমথ্থ প্রতিমা রূইদাসের, একরাতের ঝড়ে দেওয়াল চাপা পড়ে যখন মা বাপ দুজনেই মারা গেল, বেঁচে যাওয়া নুড়ো খুঁটিটা ধরে দিন দুই প্রতিমা রুইদাস সেখানেই বসেছিল।তারপর কালের নিয়মে যদিবা সে উঠলো কিন্তু তার মাথা আর নির্দিষ্ট নিয়মে চললো না। যখন তখন উঠে এদিক ওদিক চলে যায়, একঘর নাতিনাতনি আর সারাদিনের পরিশ্রমের পর পুতুল বায়েনের আর এক কাজ বাড়ল , প্রতিমা কে  খুঁজে নিয়ে আসা।এদিক ওদিক তাবিজ, কবজ, তেলপড়ার পরও এক ঝোড়ো সন্ধ্যায় যখন সে নিখোঁজ হল তখন অগত্যা শিবরাম চললো প্রতিমাকে খুঁজে আনতে, আর যখন সে ফিরলো তখন একমাথা সিঁদুর সমেত ,গ্ৰামের শিবমন্দিরে ঐ অবস্থায় বসে ছিল সে। শিবরামকে পেয়ে পরম আনন্দে হাত ধরে আমার বর, আমার বর বলে হেলেদুলে বাড়ি ফিরেছিল।

সেইদিনই  সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর পুতুল বায়েন শিবরামকে এমন কিছু কথা বলেছিল যে শিবরাম , দুর হ হারামজাদী , বলে দুদিন ঘরে জলস্পর্শ করেনি। কিন্তু তারও নাম পুতুল বায়েন। ঠিক দিন গুনে গুনে ঠিক দিনে সন্ধেবেলা শিবরামকে প্রতিমার ঘরে ঢুকিয়ে শিকল তুলে দিয়ে এল। আর তারপরেই ঘটল ম্যাজিক, আস্তে আস্তে ওষুধ আর শিবরামের গুনে প্রতিমা সুস্থ হয়ে উঠতে লাগল। পুতুল বায়েন দেখে আর মিটিমিটি হাসে আর নাতিনাতনি দের গায়ে হাত বুলিয়ে ঘুমপাড়ানি গান গায়।

আমি অবাক হয়ে বললাম, তুমি নিজে হাতে এমন করতে পারলে! সে লাজুক হেসে উত্তর দিল মাসে তো চারটে দিন দিদিমনি, তাতে যদি কেউ প্রান পায় তাহলে আমি কে?
তখনও নির্বিকার প্রতিমা নিবিড় ভাবে শিবরামকে জড়িয়ে ধরে আছে , আর মিটিমিটি হাসছে।

Friday, March 12, 2021

অবান্তর ৪৮

        ভালোবেসে ফুরিয়ে যাও



অমন করে তাকিয়ো না চোখ নামাও,

ও চোখের দৃষ্টি আমার সহ্য হয় না,

আমি আবার ঝরে পড়তে পারি,

ও চোখে আগুন বয়।


দুটো ঝর্না না ঝরলে প্রপাত হয় না,

তাই বরফ হও,

বরফ শীতল।


দুটো বিন্দু না জুড়লে সেতু হয় না,

তাই ডাল জোড়ো পালা জোড়ো,

শাখাপ্রশাখার মত সেতুবন্ধনে এগিয়ে এসো,


অনেকদিন দেখা না হলে খুব ঝগড়া কোরো ,

জমে থাকা ভালোবাসারা ঝরে‌ পড়ুক, গলে পড়ুক পলাশতলির মত।


হাতের উপর হাত রাখা সহজ কথা নয়-


শুধু ,

যে স্বপ্ন নিয়ে ঘুম আসে,

সকালবেলা সেগুলোও তো সত্যি করতে পারো ?

অনেকদিন পর অনেকটা সময় তো দিতে পারো?



শুধু আমার জন্যই।






Saturday, March 6, 2021

অবান্তর ৪৭

 

অনেকদিন দেখা হয়নি আমাদের
ঠিক যদি নতুন করে আবার দেখা হত সমুদ্র নীড়ে,
অথবা আবার নতুন করে এক ঝরনা কান্নার ভিতরে।
সমর্পণের আশ্বাসে চোখ বন্ধ করে নিশ্চিন্তে দিতাম ডুব এক পাহাড় কোলে।
নচেৎ,
ধর  পাহাড় বাঁকে একপশলা মেঘের পরে আলো ফোটার মত এক পেয়ালায় বার্তা পেতাম।

এখন আলো যোজন তিনেক বাকি,
জঙ্গলেরাও উড়ছে মনের ডোরে
তাইতো এসো গাছ হয়েই থাকি
জানবো বুঝবো এক মাটিতে গেঁথে।

বসন্তেতে হলুদ পাতা হব,
শীতবিকেলে ঝরবো এ ওর গায়,
বর্ষাতে প্রেম বাঁধবো মনে মনে
জল ছিটোবো কর্দমাক্ত‌ পায়।

দেখবো তখন শিকড় কতদুর-
এ ওকে আঁকড়ে ধরতে চায়
মাটির নীচে বড্ড পরিপাটি
উপরতলায় মাথা টলে যায়।

যুগের পর যুগ পেরিয়ে যাবে,
পেরিয়ে যাবে বসত বসত ঘর
দাঁড়িয়ে থাকবো এক অপরে চেয়ে
মাটির উপর মেঠো যাযাবর ।


Friday, March 5, 2021

অবান্তর ৪৬

অ কবিতা


আমি তো নিজেকে কবি বলেই জানি,

তাই-
মাছ কাটি, ঝুল ঝাড়ি, আর খুন্তিতে তুলি কড়াইয়ের সুর,
বাসন মাজার ফাঁকে শুনি পাঁচফোড়নের বোল,
আর মনে মনে শব্দ নিয়ে শব্দ সাজাই এক্বা দোক্বা খেলার মত।
সময় খুঁজে শব্দ নিয়ে বাসর সাজাই,
ধাঁই ধপাধপ শব্দ গোছাই,
কারন-
তাদের তখন ভীষন তাড়া,
তবু ,তখন একটা সুস্বাদু কবিতা রান্না চায়,
মনে মনে তাই সদগুরু আওড়াই।
অথচ গৃহদেবতাও পিঁড়ি পেতে বসে আছেন উঠোনমুখো হয়ে বাইরের দাওয়ায়।

আসলে আমি তো নিজেকে কবি বলেই মানি,

তাই শব্দ সাজাই




Monday, March 1, 2021

অবান্তর ৪৫

 


            অন্য বসন্ত





যৌবনের জোয়ার লেগেছে সজনে আর আমমুকুলে,

আবার এক পলাশ ফাগুন আগুন লাগাতে আসছে,

মধু লোভী মৌটুসিরা নবীন ফুলের বুকে মধুতে ব্যস্ত।



আবার এক রঙমেলান্তি সময় এল,

জাপানী চেরী আর লাল মাটির পলাশ 

যৌবন সাজিয়েছে কিনারে কিনারে।



রঙ মাখতে আর চেয়ো না প্রিয়ে,

যতবারই ছুটে যাও ততবারই ফাগুনে আগুন পোড়ে,

রঙ মাখিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয় রাস্তার ধারে।

রঙ যে তোমায় জ্বালায়, পোড়ায়, সং সাজায়।



তাই,

পলাশে আগুন খোঁজো তুমি, ঝুমুরে বিষাদ বও,

প্রতীক্ষা কর আগত ফাগুনী অপমানের।



তারপর 

সমস্ত প্রগলভতাকে সুগন্ধি সাবানের মত জড়িয়ে ফেলো আষ্টেপৃষ্ঠে,

ঠিক যতক্ষন না রক্তক্ষরন বইতে থাকে, কইতেই থাকে।

এ তো রক্ত নয়, রক্তঝরা ফাগুন।


অবান্তর ৪৪

 

          ছাড় মোরী বৈয়া
         

অসংখ্য শিকড়ের মাঝে একলা শিকড়ের খোঁজ,
যেখানে রোমকূপেরা মাটি খোঁজে মাটি আগলাবার,
কেঁচোরা মাটি খুঁড়ে উর্বরা  জীবনজমিন ।
অথচ কীটদ্রষ্ট শিকড় হাতড়াতে থাকে হাতড়াতেই থাকে তার ঢালু জমি শিকড় চারাবার।

ফুল ফোটে, ফল হয়, গাছ পায় মাটি , জমিন ফসল পায় অতি পরিপাটি।
তারপর ?
শিকড় নরম পায় রোমকূপ পেলে,
মুলতানি রাগ ছেড়ে দরবারী ধরে ।

মুঝে যানে দো ছাড় মোরী বৈয়া ।
হা হা করত তোরী পইয়া পড়ত হুঁ

শিকড় আলগা হয়  শাখাপ্রশাখায়,
অনন্তের পথে তবু চক্ষু মেলে রয়।

দূরযানী সাবধানী আরোহে অবরোহে,
হাতে তার শ্বেতপত্র সন্ধি করবারে,
খোঁজা খোঁজ রোজরোজ দমবন্ধ হয়,
শিকড়ের পত্রপাখা মূলেতে শুকায়।

অবান্তর ৪৩

       নীরবতার প্রতিধ্বনি





চোখের উপর নীরব রেখে বহু মুহূর্ত এঁকে দিয়েছি।

চোখের থেকে চোখ নামিয়ে মুহুর্ত ধ্বনি শুনে নিয়েছি।


অনেক কথার শ্রুতির মাঝেও,

একটি কথাই শুনে ফেলেছি,


কোনো কথা হয়নি বলা,

অথচ,  কথা আর বাকি নেই।

হৃদয় থেকে মস্তিষ্ক দূরে নয়,

তবু কান টানলেই মাথা আসে না।


এত দু্রে যেও না প্রিয়, 

যেখানে শুধু ঝরন বাঁচে, মরন বাঁচে

শুধু হৃদয়ে বাঁচো, হৃদয়ে বাঁচো।