Sunday, November 14, 2021

গুড়মহল

 গুড় মহল


অর্পিতা চৌধুরী

কলেজ শিক্ষিকা

গৌরব গুঁইন মেমোরিয়াল কলেজ

চন্দ্রকোনা রোড, পশ্চিম মেদিনীপুর



শীতের সূচনা হচ্ছে, সকালে পাতলা সরের মত কুয়াশা ধীরে ধীরে ঘন হচ্ছে , গা শিরশিরানি ঠান্ডা বাতাস এবারে কালিপুজোর আগে থেকেই জানান দিচ্ছে শীত আসছে।  রাতভোরে কার্তিক মাসের হরিনাম সংকীর্তন কানে আসার আগে আগেই রহমত অস্থায়ী খেজুর পাতার ছাউনী ছেড়ে উঠে পড়ে,  শ্বশুর আর ফুফাতো ভাইকে ডেকে দেয়, তারপর উজু করে, ফজরের নামাজ পড়ে। আজ বাঁধের  পশ্চিম পাড়ের গাছ গুলো থেকে রস নামাতে হবে।


ঠিক এই চিত্রটাই এখন বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার প্রান্তরে প্রান্তরে। ভোর থেকে সাইকেলে প্রায় গোটা তিরিশ হাঁড়ি চাপিয়ে রস সংগ্ৰহের পরিচিত চিত্র শুরু হয়ে গেছে পশ্চিম বাঁকুড়ার খাতড়া, মুকুটমনিপুর, রানীবাঁধ, ঝিলিমিলি, সিমলাপাল, সারেঙ্গা, ঝাড়গ্ৰাম, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর অর্থাৎ পুরো জঙ্গলমহল জুড়ে। ভাদ্র মাসে চারদিকে মাঠে ঘাটে, নদীপাড়ে, ছড়িয়ে থাকা খেজুর গাছেদের চেঁছে  রাখা হয়। শীতের শুরুতেই খেজুর পাতার ছাউনী আর মাটির গাঁথনী দিয়ে অস্থায়ী ছাউনী বানিয়ে ফেলেন মহলদারেরা। তৈরী করে ফেলেন এক জাবদা মাটির উনুন আর সঙ্গে থাকে লোহার শিটের চারকোনা বড়সড় কড়াই। ভোর থেকে সকাল ৭টার মধ্যেই চলে সমস্ত রস সংগ্ৰহের কাজ, তারপর বড়সড় কড়াইতে সেই রস কাঠের আগুনে ফুটতে থাকে ঘন্টা তিনেক, পুরো সময় ধরে নাড়তে হয় সেই রস নাহলে পুড়ে বা ধরে যাওয়ার ভয় থাকে। পাটালীর গুড় তৈরি করতে তো আরো বেশীক্ষন ফোটাতে হয় তবেই সেই মোটা গুড় থেকে হয় পাটালী। তারপর সারাদিন সেই ফাঁকা প্রান্তর থেকে চলে প্রয়োজনীয় জ্বালানী সংগ্ৰহ। ভোর থেকে ঝোপেঝাড়ের মধ্যে থাকা গাছে উঠে রস সংগ্ৰহ খুব সহজ কথা নয়, তবু এই ভূমিপুত্ররা বংশ পরম্পরায় এই তিনমাস গুড় মহল তৈরি করেন। যা সারা  পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে স্বাদ আর গন্ধ নিয়ে। বেড়াতে আসা মানুষজন নিয়ে যান তাদের শহুরে আলয়ে, খেয়ে যান খেজুর রস। তবু  সময় প্রেক্ষিতে আর বর্তমান প্রজন্ম এই পরিশ্রমের কাজে আসতে চাইছেন না। হাড় হিম ঠান্ডা, পরিশ্রম, খোলা প্রান্তরে কখনো হাতির উপদ্রব ঐ অস্থায়ী খেজুর পাতার ছাউনী রোধ করতে অপারগ। মূলত পরিশ্রম সাধ্য কাজ বলেই হয়তো মুসলীম শ্রেনীভুক্ত মানুষজন গুড় বানানোর কাজে নিযুক্ত থাকেন।তবে মাটির হাঁড়ি ব্যবহৃত হলে রসের গুনমান ঠিক থাকে, কিন্তু মুখ বড় হওয়ার কারনে বাদুড়ে মুখ দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে যা থেকে নিপা ভাইরাস সংক্রমণের ভয় থেকে যায়। আর ভারী এবং বারে বারে ভেঙ্গে যাওয়ার ভয় থাকে বলেই বেশীরভাগ মহল দার সরু মুখ, হালকা, টেকসই  প্লাষ্টিকের হাঁড়ি বর্তমানে ব্যবহার করেন। গাছ প্রতি  দেড় কিলো করে গুড় গাছ বা জমির মালিক কে দিতে হয়, কেউ কেউ মূল্য নিয়ে নেন।


খেজুর গাছ রাঢ়বঙ্গে যত্রতত্র জন্মালেও কোনো কিছুই ফেলা যায় না। সে খেজুর পাতায় বোনা চাটাই হোক কিংবা ছোটো ছোটো গাছ কেটে কান্ডর মাঝখানের আঁতি বার করে খাওয়া, অথবা বর্ষার জল পেলেই থোকা থোকা ফুলের মত পাকা হলদে বর্নের খেজুরের বাহার আর শীতে সরষের তেলের মত টলটলে গুড়  পিঠে পায়েসের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়। 


প্রকৃতি আসলে শীত উপহার সাজিয়ে দেয় শীত প্রতিরোধের জন্য। খেজুর রস এনার্জি ড্রিঙ্ক হিসেবে কাজ করে , এর মধ্যেকার সোডিয়াম - পটাসিয়াম পেশীকে শক্তিশালী করে তোলে, কর্মক্ষমতা বাড়ায়, মেটাবলিজম রেট বৃদ্ধি করে, গুড়ে অবস্থিত আয়রন আ্যনিমিয়া বা রক্তাল্পতা কমায়, কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে, মেদ ঝরাতে সহায়ক এবং ঠান্ডা প্রতিরোধক । শ্রমজীবি গ্ৰামীন দরিদ্র ভূমিপুত্রদের প্রকৃতি দেবী তার উপহার সাজিয়ে দেন । সমস্ত গাছ গুলোকে দুই ভাগে ভাগ করে নিয়ে তিনদিন পর পর এক একটি ভাগ থেকে রস সংগ্ৰহ করা হয়। তিনদিন পর্যায়ক্রমে একভাগ থেকে রস সংগ্ৰহের পর, পরের তিনদিন অপর ভাগ থেকে রস সংগৃহিত হয়।  তিনদিন জিরান বা বিশ্রামের পর যে রস পাওয়া যায় তাকে বলা হয় ' জিরান কাঠের রস। তবে এই সুস্বাদু রস গ্লাস দুয়েকের বেশী না খাওয়ায় ভালো বা বেলা হয়ে গেলে তা গেঁজে গিয়ে নেশাজাত পানীয় হয়ে ওঠে। গাছের এক পিঠ এ বছর কামানো হলে পরের বছর অপর পিঠ কামানো হয়, এভাবেই গাছ লম্বা হয় আর এপিঠ ওপিঠ করে পরম যত্নে গাছ বাঁচিয়ে রেখে রস সংগ্ৰহ প্রক্রিয়া চলে প্রতি বছর। পৌষ সংক্রান্তির দিন থেকেই  প্রায় সমস্ত মহল ভেঙ্গে ফেলা হয়। আবার অপেক্ষা পরের শীতের, আবার অপেক্ষা মহলের পাশের রাস্তায় ধোঁয়া ওঠা সদ্য গুড়ের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার, রাঢ় বঙ্গের অন্যতম জীবিকা ও জীবনের । 







No comments:

Post a Comment