Wednesday, June 17, 2020

মধ্যযাম ৯

                    যা দেখি তা লিখি
                              ৯


এখন কেউ কারো বাড়ি দিনমানেও যায় না, তাই সবার আস্তানা এখন শান্ত ছায়াময়, শুধু ভিতরে ভিতরে গুমরায় গর্জনে মেঘের মত।

আজ সারাদিন ঝিপঝিপিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে, আধশুকনো বস্ত্রাদি কখনও নাইছে কখনও কাঁধে চড়ে বাড়ি ঢুকছে একছুটে। বলার মত কিছু নয় ,সাদামাটা গৃহস্থালি। এমনি সময় ,উপরতলা থেকে কানে এল অপরিচিত গলার ক্যাঁচরম্যাঁচর, কৌতূহলে তাকিয়ে দেখি উপর পাড়ার হলা বাউরী উবু হয়ে বসে আছে ঘরের উঠোনে। যে পিচটা আমার আস্তানার সামনে দিয়ে গিয়ে লাল মোরামে গিয়ে শেষ হয়েছে তার ঠিক উত্তর পূব কোনে  হলার সদ্য আধপাকা টিনছাউনির ঘর, সামনে পাকা নালা আবর্জনায় কাঁচা হোয়ে গিয়েছে, ওর বাপের নাম সনাতন বাউরী, ছিপছিপে কেলে বাঁশ পারা চেহারা ছিল তার, নিজে হাতে মনসা গড়ে পুজো করতো সারারাত, তারই ছেলে হলধর বাউরী । সংক্ষেপ গুনে হয়েছে হলা, তা মাঝেমাঝেই কচুটা, মোচাটা দিয়ে যায়, আজ এসেছে কতকগুলো শিঙ্গি মাছ নিয়ে , যার অধিকাংশই মৃত আর দুএকটা অল্পজীবিত তখনও।

তার ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া এক মাথা ঘাড় পর্যন্ত তাল ছিবড়ের মত কুচকুচে চুল থেকে টুপটুপ করে জল ঝরছে, আর আলপথের মত ফাঁকা চাঁদিটা আমার দিকে দন্তবিকশিত করে আছে। হলা আজ এসেছে পুরো ফুল টু হয়ে, মাথা পর্যন্ত ধেনোতে ডুবে।তবে তাতেও তার ব্যবসায়ী জ্ঞান প্রখর টনটনে। এখন সে উবু হয়ে বসে পুঁটুলির শিঙ্গি গুলোকে কাতুকুতু দিয়ে জাগানোর চেষ্টা করছে এবং তার ক্রেতাকে পটানোর চেষ্টায় সর্বতো ভাবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছে। এমনকি শিঙ্গি মাছের গুনাগুণ, কেমন ভাবে ধরেছে , আর কত কষ্ট করে এ বাড়ির জন্যই বয়ে এনেছে সবের বিবরন দিচ্ছে বিস্তৃতভাবে।

তবে ,এত কিছুর পরেও সেয়ানা ক্রেতা রাজি নয়, সে একে নিরামিষাশী তারপর প্রাতেই অন্য সদস্যদের জন্য বরাদ্দ মৎস্য এনেছে, ফলস্বরূপ সে একেবারেই নারাজ। গম্ভীর স্বরে হলাকে যেই জানালেন, তিনি নিরামিষাশী এবং সেদিনের মৎস্য এনেছেন, হলা তার সমস্ত গাম্ভীর্য খানখান করে মাথা ঝুঁকিয়ে তৎক্ষনাৎ বেমালুম বলে বসলো-  তুমি শালা বেদম 'বারাবেউধা' আছ, বলছো নিরামিষ, ইদিকে শালা মাছ লিয়ে বসে আছ।

সাৎ করে কথাটা কানে গিয়ে বাজলো, অর্বাচীনতার তো কালপরিধি ক্ষেত্রবোধ থাকে না, আর অশিক্ষিত , নিম্ন বর্গিও মাতালের তো আরোই দায় নেই কারো কাছে প্রমান দেওয়ার, কারো কাছে নিজেকে উপস্থাপিত করার। এ যেন ছিন্নমাদুরের দুই পিঠ, যার তল বাহির সমান । সমান ছেঁদা, সমান ফুটো যা সারাবার নয় তাই সারানোও  হয় না। তার নেশাতুর মস্তিষ্ক এই মূহুর্তে তাকে জানান দিচ্ছে সে বিক্রেতা হিসেবে আজ অপারগ, তার কুটকুটে হলুদ গেঞ্জি , ঝাঁকড়া চুল বিদ্রোহ করছে  , তার আরো একটু ধেনো খাওয়ার লোভ তাকে বিপাকে ফেলেছে। সে বুঝতে পারছে শিঙ্গি আজ বিকবে না, তবু তার নিখাদ চেষ্টায় জলসেচন মানতে সেও নারাজ।

তার নিজেকে প্রমানের দায় নেই, সৎ সাজার ছক নেই, সংসারের দেনাপাওনা নেই, দায়িত্বও নেই, ভালো সাজার প্রচেষ্টা নেই, জীবন যাপনের পংক্তি নেই শুধু নিজের ধন গচ্ছিত করে একটু ধেনোর জোগাড় করে জগৎ সংসার ভুলে থাকা। জীবনের একমাত্র প্রতিযোগিতায় বাধা হয়ে দাঁড়ালে ভদ্দরলোকেরা তো  'বারাবেউধা' হবেই।


এই যে নশ্বর জীবন, সেখানে মৃত্যু তো খুঁটায় বাঁধা ছাগলদড়ির মত। তার উল্লাসও নাই, উদযাপনও নাই, তাই উৎসবও বড়ই নির্বিবাদী। ইনিয়ে বিনিয়ে কিছুদিন কাঁদে তারপর যে যার স্রোতে বয়ে যায়, সকাল থেকে সর্বৈব ভুলে মূহুর্তের উপলক্ষে এগিয়ে যায়। কোনো প্রতিযোগিতায় না থেকেও মজা দেখে ঝুঁঝকো চুলে, লাল চোখে।
এখানে মৃত্যু কোনো উৎসব নয় মূহূর্তের উপলক্ষ্য মাত্র ঠিক ধেনোর মত।

                       অর্পিতা

No comments:

Post a Comment