যা দেখি তাই লিখি
৩
আজ বুদ্ধপূর্ণিমার থালা চাঁদটা তে মাঝে মাঝেই মেঘের খেলা চলছে, এ যেন - মেঘে মেঘে এ মুখ শুধুই ঢেকে যায়, কাল আবার রবিঠাকুরের জন্মদিন , লকডাউনেও তার ছাড় নেই, পথে ঘাটে , দুয়ারে ,মাঠে আমরা কড়া নাড়িয়েই যাবো, এখন তো অফুরান সময় ,সেই যেন - জল পড়ে পাতা নড়ে, পাগলা হাতি মাথা নাড়ে র মত আমরাও শিং দুলিয়ে, গাল ফুলিয়ে আড়ং বাঁশি বাজিয়েই যাবো। সবাই যেন প্যাড, গ্লাভস পরে 'waiting for goddo' অথবা সেই অচেনা 'গুরু'র অপেক্ষায় কম্পমান । ছাই চাপা জীবনের এককনা লাল-কমলা- সবুজ আলোচনাই একমাত্র দিনযাপনের ফুলকি ।
আজ আমার বাগানে বোশেখের বেলকুঁড়িতে গাছ ভরে গেছে, ছোটো ছোটো মুক্তোদানা আমাকে ডাকছে আর আমি গাইছি - 'এ মনিহার আমায় নাহি সাজে' । একগাছ ফুল আমাকে মনে করাচ্ছে এক অন্য আখ্যান পত্র।
সেই কোন ছোটো বেলায় রূপনারানের তীরে এক ভিতরখানি গ্ৰাম আম,জাম,জামরুল,সবেদায় পুষ্ট আর কালবোশেখীর এঁটেল কাদায় নিমজ্জিত পায়ে হাঁটা আমার মাতুলালয়, যেখানে রাত ভোর থেকে মানুষ জন ,গাই গরু উঠে পড়ে আর অর্ধচন্দ্রাকৃতি গোবর নাতায় , লাল মেঝের কোলে ভোর থেকে একটা ঝিম ধরা উনুনে কালো মাটির সরায় কালো বালি তে একমুঠ চাল দিলেই ঠিক একগাছ বেলকুঁড়ি মুড়ি হয়ে ফুটে উঠে। কতদিন সেই বেলফুল ফোটাবার শখ আমিও পুষেছি মনে মনে, আজ এই বেলকুঁড়িগুলি যেন সে দৃশ্যপটকেই বিস্তৃত করছে ।
আমি যেন আজো দেখতে পাই, সেই বিস্তৃত রূপনারানের ঘেসো তীর, ডিঙ্গি নৌকা, ভরসন্ধের দুর পারের লাইন দেওয়া আলো, মাঝে মাঝে দুএকটা গারা গাঁথনির সামনে বাঁশ কঞ্চির বেঞ্চি ,আর জোলো এঁশো বাতাস। ইঁটভাটা আর জোউরে ক্ষয়ে যাওয়া জমির ফাঁকে ফাঁকে এক একটা মেছো ডিঙ্গি রাত ভোরের প্রতীক্ষায় বাঁধা,রাত থেকে শুরু হবে তাদের কাজ ।পাইলেন আর বয়া গুলো ভাটির টানে ডুবছে আর উঠছে, ঠিক যেন কুগলুকানি খেলছে। ঘুম চোখে বাঁধানো পুকুর ঘাটে বসে দেখতে পাচ্ছি আমার নিরক্ষর দাদুর দুই হাতে দুই ইলিশ আর কাঁধ গামছায় চিংড়া, মুখে বিশ্বজয়ের হাসি।
দাওয়ায় তখন নারকেল কোরার শব্দ , আর ভিতর কোন থেকে নধর আলুভাজার গন্ধ গরম মুড়িকে রূপসী করছে।তাল গুড়ের গন্ধে ম ম করছে চারদিক।এ যেন কোন কালের কথা, যেখানে সময় ইচ্ছেমত এবাড়ি ও বাড়ি করে সময় কাটায়, এপুকুর ওপুকুর করে উথালপাতাল করে তারপর চোখ লাল করে লাল করকরে ভোলার ঝাল দিয়ে হুপুসহাপুস শব্দ তোলে।
ছোটো বেলাটা কেমন এক অদ্ভুত জীবন,গরমের ছুটি পড়লেই হয় দেশবাড়ি না হয় মামাবাড়ি, ন্যাড়ামাথায় ধানরোঁয়া চুল নিয়ে রেলের জানলায় নাক ঠেকিয়ে, রেল ক্যান্টিনের খোপ থালায় ভাত খেয়ে সে যেন এক সব পেয়েছির দেশ।
জানি, কালও ঘুম ভাঙ্গানোর টিকটিকি টা বিফল হবে, আর দেরীতে ওঠার মাশুল গুলো পঞ্চশর হয়ে ধাওয়া করবে। বেশ লাগে তখন, এই যে চমকানো ধমকানো উপদেশ , আছে বলেই তো মনে হয় শিকড়ে আছি, এই যে উৎকন্ঠা, এই যে বুড়ো বটগাছের মত আগলে রাখা,অহৈতুকি চিন্তা, কিচকিচ এগুলো আছে বলেই তো মনে হয় , ঘরে আছি, ছত্রছায়ায় আছি , বাইরে গাম্ভীর্য রেখে তাই ভিতরে ভিতরে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করি তাদের গজরানো। যেন সব বুঝি রসাতলে গেল এক্ষুনি । আমিও গুটিগুটি পায়ে ঘাড় নিচু করে শুনি, দিনটা ভালো হয়ে যায়।
এই প্রতীক্ষা, এই উৎকন্ঠা ,এই টান, এই তো ভালোবাসা, এই তো ঘর। মনে পড়ে যায় আমার বারেন্দায় বাসা করা টুনটুনি টাকে যে আজকাল একবাসাতেই চারবার ডিম পেড়ে পেড়ে বাসাটাকে 'নিশ্চিন্ত ঘর 'বানিয়ে ফেলেছে। সে যেন আমাকে ভরসা করে ছেড়ে যায় তার ঘরখানি , আর আমি আমার ভালোবাসার বারেন্দায় তার কিচকিচানির জন্য অনন্ত প্রতীক্ষা করি।
অর্পিতা চৌধুরী
৩
আজ বুদ্ধপূর্ণিমার থালা চাঁদটা তে মাঝে মাঝেই মেঘের খেলা চলছে, এ যেন - মেঘে মেঘে এ মুখ শুধুই ঢেকে যায়, কাল আবার রবিঠাকুরের জন্মদিন , লকডাউনেও তার ছাড় নেই, পথে ঘাটে , দুয়ারে ,মাঠে আমরা কড়া নাড়িয়েই যাবো, এখন তো অফুরান সময় ,সেই যেন - জল পড়ে পাতা নড়ে, পাগলা হাতি মাথা নাড়ে র মত আমরাও শিং দুলিয়ে, গাল ফুলিয়ে আড়ং বাঁশি বাজিয়েই যাবো। সবাই যেন প্যাড, গ্লাভস পরে 'waiting for goddo' অথবা সেই অচেনা 'গুরু'র অপেক্ষায় কম্পমান । ছাই চাপা জীবনের এককনা লাল-কমলা- সবুজ আলোচনাই একমাত্র দিনযাপনের ফুলকি ।
আজ আমার বাগানে বোশেখের বেলকুঁড়িতে গাছ ভরে গেছে, ছোটো ছোটো মুক্তোদানা আমাকে ডাকছে আর আমি গাইছি - 'এ মনিহার আমায় নাহি সাজে' । একগাছ ফুল আমাকে মনে করাচ্ছে এক অন্য আখ্যান পত্র।
সেই কোন ছোটো বেলায় রূপনারানের তীরে এক ভিতরখানি গ্ৰাম আম,জাম,জামরুল,সবেদায় পুষ্ট আর কালবোশেখীর এঁটেল কাদায় নিমজ্জিত পায়ে হাঁটা আমার মাতুলালয়, যেখানে রাত ভোর থেকে মানুষ জন ,গাই গরু উঠে পড়ে আর অর্ধচন্দ্রাকৃতি গোবর নাতায় , লাল মেঝের কোলে ভোর থেকে একটা ঝিম ধরা উনুনে কালো মাটির সরায় কালো বালি তে একমুঠ চাল দিলেই ঠিক একগাছ বেলকুঁড়ি মুড়ি হয়ে ফুটে উঠে। কতদিন সেই বেলফুল ফোটাবার শখ আমিও পুষেছি মনে মনে, আজ এই বেলকুঁড়িগুলি যেন সে দৃশ্যপটকেই বিস্তৃত করছে ।
আমি যেন আজো দেখতে পাই, সেই বিস্তৃত রূপনারানের ঘেসো তীর, ডিঙ্গি নৌকা, ভরসন্ধের দুর পারের লাইন দেওয়া আলো, মাঝে মাঝে দুএকটা গারা গাঁথনির সামনে বাঁশ কঞ্চির বেঞ্চি ,আর জোলো এঁশো বাতাস। ইঁটভাটা আর জোউরে ক্ষয়ে যাওয়া জমির ফাঁকে ফাঁকে এক একটা মেছো ডিঙ্গি রাত ভোরের প্রতীক্ষায় বাঁধা,রাত থেকে শুরু হবে তাদের কাজ ।পাইলেন আর বয়া গুলো ভাটির টানে ডুবছে আর উঠছে, ঠিক যেন কুগলুকানি খেলছে। ঘুম চোখে বাঁধানো পুকুর ঘাটে বসে দেখতে পাচ্ছি আমার নিরক্ষর দাদুর দুই হাতে দুই ইলিশ আর কাঁধ গামছায় চিংড়া, মুখে বিশ্বজয়ের হাসি।
দাওয়ায় তখন নারকেল কোরার শব্দ , আর ভিতর কোন থেকে নধর আলুভাজার গন্ধ গরম মুড়িকে রূপসী করছে।তাল গুড়ের গন্ধে ম ম করছে চারদিক।এ যেন কোন কালের কথা, যেখানে সময় ইচ্ছেমত এবাড়ি ও বাড়ি করে সময় কাটায়, এপুকুর ওপুকুর করে উথালপাতাল করে তারপর চোখ লাল করে লাল করকরে ভোলার ঝাল দিয়ে হুপুসহাপুস শব্দ তোলে।
ছোটো বেলাটা কেমন এক অদ্ভুত জীবন,গরমের ছুটি পড়লেই হয় দেশবাড়ি না হয় মামাবাড়ি, ন্যাড়ামাথায় ধানরোঁয়া চুল নিয়ে রেলের জানলায় নাক ঠেকিয়ে, রেল ক্যান্টিনের খোপ থালায় ভাত খেয়ে সে যেন এক সব পেয়েছির দেশ।
জানি, কালও ঘুম ভাঙ্গানোর টিকটিকি টা বিফল হবে, আর দেরীতে ওঠার মাশুল গুলো পঞ্চশর হয়ে ধাওয়া করবে। বেশ লাগে তখন, এই যে চমকানো ধমকানো উপদেশ , আছে বলেই তো মনে হয় শিকড়ে আছি, এই যে উৎকন্ঠা, এই যে বুড়ো বটগাছের মত আগলে রাখা,অহৈতুকি চিন্তা, কিচকিচ এগুলো আছে বলেই তো মনে হয় , ঘরে আছি, ছত্রছায়ায় আছি , বাইরে গাম্ভীর্য রেখে তাই ভিতরে ভিতরে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করি তাদের গজরানো। যেন সব বুঝি রসাতলে গেল এক্ষুনি । আমিও গুটিগুটি পায়ে ঘাড় নিচু করে শুনি, দিনটা ভালো হয়ে যায়।
এই প্রতীক্ষা, এই উৎকন্ঠা ,এই টান, এই তো ভালোবাসা, এই তো ঘর। মনে পড়ে যায় আমার বারেন্দায় বাসা করা টুনটুনি টাকে যে আজকাল একবাসাতেই চারবার ডিম পেড়ে পেড়ে বাসাটাকে 'নিশ্চিন্ত ঘর 'বানিয়ে ফেলেছে। সে যেন আমাকে ভরসা করে ছেড়ে যায় তার ঘরখানি , আর আমি আমার ভালোবাসার বারেন্দায় তার কিচকিচানির জন্য অনন্ত প্রতীক্ষা করি।
অর্পিতা চৌধুরী
দুর্দান্ত গতি। এ স্বাদু ধারা অবিচল রাখুন...
ReplyDelete