Thursday, June 4, 2020

মধ্যযাম ৬


                      যা দেখি তা লিখি
                                ৬
পড়ন্ত গোধূলি দুপুর, ফ্যাকাসে রোদ কার্ণিশ বেয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে এখনও, গ্ৰীলের ফাঁক দিয়ে  তার তীর্যক ছায়া  আলপনা এঁকেছে বারান্দার মেঝেতে বার লক্ষ্মীর সরার মত। পিঁপড়েরা মুখে করে সরাচ্ছে সাদা সাদা ডিম দ্রুততায়, বোধহয় জল আসবে। ঈশান কোনে ডিমের মত জেগে উঠেছে খন্ড কালো মেঘ , এখনও তার বুক ভারী হয়নি।  সঞ্চিত রাশি সিঞ্চিত হচ্ছে ধীরে ধীরে ,অদেখা প্রনয়ীর মত ঝরবে বলে।

চারদিক অন্ধকার করে করালবদনা অট্টহাস্য শুরু করেছে, সঙ্গে যোগ দিয়েছে নৃমুন্ডমালিকারা। জোকারের মত ফাটা ব্যাটের ডগায় নাচাচ্ছে ঝোড়ো হাওয়ারা, শুরু করেছে ট্রাপিজের খেলা।

মোমের নরম আলোয় স্নিগ্ধ হয়ে আছে গৃহকোন, এ যেন অযাচিত দীপাবলি।বাইরের ভীষনতায়  মৃদু কম্পমান হলেও ভয়ানক স্থির বর্তিকা টি । ঠিক যেমনটি দেখা যাচ্ছে কদম ফুল মাথা  লোকটিকে বারান্দার এক কোনে ছায়ার মত দেদীপ্যমান। মোমের মৃদু আলোয় তার দীর্ঘ ছায়া  দোদুল্যমান। না, তাকে আর চাষা বলা যায় না। বহুকাল আর সে চাষ করে না, কাদা মাটি ছানে না, বীজতলা রুয়ে না, হাঁক দেয় না ভোর‌ থেকে কামলা মুনিষদের । তবু সে মনেপ্রানে আজও চাষা- সারাক্ষণ বীজতলা খুঁজে ফেরে, বীজ আলুর গন্ধ পায়, ধান পাকার শব্দ শোনে তার আঁতুড়কোনে শুয়ে শুয়ে ।
এখন সে মনে মনে বড় অস্থির, ভাবে নুরের ঘরখানা ঝড়ে উড়ে গেল কিনা, অথবা রামি গয়লার গাভীনটা মাচা চাপা পড়লো কিনা, সেধোর ছিপ নৌকাটা যে বাধা থাকে ঘাটপারাপারের ঘাটে , কি জানি কি হল তার।ভিতরে যত ছটপটায় ততই বলে ধান তো গেলই, তিল শুঁটিও আর একটাও রইলনি মাঠে, সব ধুয়ে গেল। কিছু আর সোরানো গেলনি।

প্রাচীন বৃক্ষ যেমন মাটি আঁকড়াতে চায় চাষা লোকটিও আঁকড়ে ধরতে চায় তার চিরচেনা পৃথিবী। অব্যক্ত যন্ত্রনায়, অনাগত আশংকায় খোঁজ করে তারু, সেধো, নুরু, আলি, খলিলের। শিকড়ের মূলে শুনতে চায় 'ভালো আছি'র গান। উত্তাপে সেঁকতে চায় তার পরিচিত গার্হস্থ্য জীবন, যে জীবন তাকে হাঁকে ডাকে খোঁজ নেয়, তাকে ভালোবাসা দেয়, তার অস্তিত্বের উত্তাপ ছড়ায় ক্লোরোফিলের মত। রোমে রোমে অস্তিত্বের বার্তা ছড়িয়ে বলে 'আমি আছি, আমি এখনও আছি'।

জীবন প্রাসঙ্গিকতা খোজে, তাই খোঁজ করে প্রাচীন  গৃহমন্দিরের, অথবা অপাংক্তেয় উচ্ছে বা ঝিঙ্গে লতের মাচাগুলোর , তাদের ঠিক থাকার বার্তা যেন চলমানতার বার্তা আনবে স্থবির জীবনে।আপ্রাসঙ্গিক মানেই তো মৃত্যু, তাই খুঁজে খুঁজে খোঁজ চলে আনাচে কানাচে, ইতিউতি স্বজন পরিজনের। ভালো থাকার বার্তা শীতের রোদের মত ওম ফেলে প্রাজ্ঞ শরীরে।

এখন তার পাঠের সময়, সাদা ধুতির ফেত্তাটা গায়ে ফেলে তোড়জোড় করে, চন্দন ঘষার আওয়াজ আসে, বাতাসে তখন ধুনোর গন্ধ বইছে ।

                   অর্পিতা চৌধুরী

1 comment:

  1. দুদ্ধর্ষ বলন!এ শুদ্ধ আত্মকথনের ধারা চিরঝরমান থাক। অনেক শুভেচ্ছা।

    ReplyDelete