Friday, November 5, 2021

আলোচনা : কাঁদো নদী কাঁদো, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ

 প্রসঙ্গ : কাঁদো নদী কাঁদো

           সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ


            অর্পিতা চৌধুরী



সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বাংলাদেশের সাহিত্যে অন্যতম প্রথম সারির লেখক। বাংলা সাহিত্যে ‌অস্তিত্ববাদের পরিচায়ক এবং সাহিত্যের মাধ্যমে ধর্মীয় ও সামাজিক গোঁড়ামির দিকে আঙ্গুল তোলার অগ্ৰদূত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। বাইরে আপাদমস্তক সাহেবিআনা অথচ ভেতরে বাঙালীয়ানায় ভরপুর মানুষটির ইসলামী মূল্যবোধ ও মুসলিম শিষ্টাচারের সঙ্গে হিন্দু- মুসলমানের সমন্বয়ধর্মী খাঁটি বাঙালীয়ানার কোনো বিরোধ ছিল না। তাঁর সাহিত্যে মানবজীবনের আধ্যাত্মিক অযৌক্তিকতা বা Metaphysical Absurdity বা এর সাথে সামাজিক প্রতিচিত্রও উঠে এসেছে। এমনকি তার উপন্যাসে ব্যক্তি ও সমাজ একে অপরের পরিপূরক হয়ে চেতনাপ্রবাহমূলক রীতির ধারায় এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। তাঁর লেখাতে এসেছে ধর্মীয় গোঁড়ামির বেড়াজালে জড়ানো অধঃপতিত সামাজিক জীবন, এসেছে মানুষের জীবন জিজ্ঞাসা, এসেছে কঠিন সময়ের ঘূর্ণিপাকে হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক মানব জীবন ও মানবীয় আবেগের কথা।


সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহের রচনার প্রেরনা বা উৎস হিসেবে উত্তমর্ণ যে সব পূর্বসূরির উল্লেখ করা হয় তাদের মধ্যে আলজেরীয় জাত ফরাসী সাহিত্যিক আলবেয়ার কাম্যু অন্যতম। তাঁর ' কাঁদো নদী কাঁদো' উপন্যাসটিতে কাম্যুর 'The plague' গল্পটির প্রভাব আছে বলে মনে করা হয়। জীবনের কিমিতিবাদ স্বভাব ও আত্মহত্যার প্রসঙ্গ এই দুই লেখকের উপন্যাসেই লিপিবদ্ধ হয়েছে। ওয়ালীউল্লাহের 'কাঁদো নদী কাঁদো' উপন্যাসটিতে ধীরে ধীরে একটি জীবন্ত চলন্ত নদী মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আর নদীপাড় আশ্রিত মানুষগুলোও ধীরে ধীরে তাদের জীবনের চঞ্চলতা হারিয়ে শ্লথ ও গতিহীন হয়ে পড়ছে আর সমস্ত কিছু ছাপিয়ে নদী যেন নারী হয়ে উঠে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে। একটা মফস্বলীয় জীবন্ত গঞ্জ ধীরে ধীরে রিক্ত, শূন্য হতে শুরু করে। যে নদীকে নিয়েই ছিল চঞ্চলতা, ধারাবাহিকতা, বাইরের সঙ্গে মসৃন যোগাযোগ সেই বহির্বিশ্বের অস্তিত্ব ধীরে ধীরে লোপ পায় কুমুরডাঙ্গার কাছে।


এই  উপন্যাসটিতে সংলাপ অংশের পরিমাণ বেশ কম, কারন এই উপন্যাসের বাঁধুনি বা গঠন কৌশল নির্মান সম্বন্ধে লেখকের অন্যরকম অভিপ্রায় ছিল। একদিকে চাচাতো বোন খাদেজার আত্মহত্যার দায়ভাগ কল্পনার কারন হিসেবে এক অপরাধ মনস্ক মানসিকতায় দীর্ন ক্ষতবিক্ষত ব্যক্তির নিজস্ব কথোপকথন। অপরদিকে বহির্জগতের সঙ্গে সবচেয়ে সহজ মসৃন পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কাব্যাকুল মনস্তত্ব। সমগ্ৰ উপন্যাসটিতে দুজন কথকের সন্ধান পাওয়া যায় - 'আমি' বলে এক ব্যক্তি, যে মুহম্মদ মুস্তফার কথা বলে চলে,  সম্পর্কে মহম্মদ মুস্তফার চাচাতো ভাই। আর ঐ ষ্টীমারেরই যাত্রী তবারক ভুঁইয়া, যার মাধ্যমে কুমুরডাঙ্গা শহরের শারীরিক, মানসিক পরিবর্তনের গল্প শোনা যায়। এই 'আমি' নামক চরিত্রটি পর্যায়ক্রমে একবার তবারকের আচরন, কথাবার্তা, বিবরন বিশ্বস্ত ভাবে লিপিবদ্ধ করে অপরদিকে মহম্মদ মুস্তাফার স্মৃতি আখ্যান বিবৃত করতে থাকে।


উপন্যাসটির আখ্যানকাল মাত্র একদিনের ষ্টীমারযাত্রা, অথচ এই একদিন সময়কালকে লেখক ঘটনাক্রম পরম্পরায় ও দুজন কথকের অন্তরালে এমন ভাবে সাজিয়েছেন যে পাঠক যত গভীরে প্রবেশ করবে ততই যেন কুমুরডাঙ্গার জীবন, যাপন, চঞ্চলতা ধীরে ধীরে মৃত্যু পরিনতি নির্মম রূপ নেবে। একটি আস্ত জলজ্যান্ত নদীর ধীরে ধীরে মৃত্যুর মোহনায় দাঁড়িয়ে থাকা অথবা কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়ার মধ্যে অতিপ্রাকৃতের মর্মরধ্বনি যত না শুনতে পাই তার থেকেও এক ভয়ংকর নির্মম পরিনতির প্রহর যেন ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসছে তারই পদচারনা হতে থাকে সমগ্ৰ উপন্যাস জুড়ে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বাঁধুনির গুনে লেখক,পাঠক মনে একটা বিস্ময় জিজ্ঞাসা জাগিয়ে রাখতে সক্ষম হন।


ঘটনাক্রম শুরু হয় দ্বিপ্রহরে ষ্টিমারের ডেকের উপর থেকে। প্রথম পৃষ্ঠা থেকেই অনুমান ভিত্তিক তবারক ভুঁইয়ার নামহীন  পরিচয় লেখক দিতে থাকেন চেহারা বর্ণনায়। বয়স চল্লিশ বা কিছু বেশি, গায়ের ফর্সা রঙ পুড়ে মলিন, পরনে বহু পুরাতন, বহু ব্যবহৃত কিন্তু পরিস্কার পরিচ্ছন্ন জামাকাপড় , ক্ষয়াটে জুতো। এরপর ধীরে ধীরে  'আমি' নামক বক্তাটি এই তবরেজ মিঞার  হাতে গল্পের চাবিকাঠি তুলে দেন তবে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এই ব্যক্তির পরিচয় প্রসঙ্গে একটা সংশয় সূচক প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে রাখেন। ষ্টিমার ঘাটের টিকিট কেরানী তবরেজ ভুঁইয়ার  সাথে যে কুমুরডাঙ্গার হাকিম মুহম্মদ মুস্তফার ঘনিষ্টতা ছিল তা ধীরে ধীরে জানা যায়।


মানুষ যেমন তার পারিবারিক ভিত্তিভূমিকে অস্বীকার বা অতিক্রম করতে পারে না তেমনি মুহম্মদ মুস্তফাও তার পারিবারিক গন্ডী, পূর্ব জীবন, বাবা খেদমতুল্লার অতীত, মা আমেনা খাতুনের দুঃখ সমস্ত অতিক্রম করে এলেও তার শান্ত , গম্ভীর, নিরুত্তাপ, বহিরাঙ্গিক রূপটি যেন সেই ছেলেবেলাকার নির্মম ইতিহাসের সংগ্ৰামকে মনে পড়ায়। ছেলেবেলার অতীত জীবনকে অতিক্রম করার জন্যই যেন মুস্তফা তার চরিত্র কে খোলসের মধ্যে গুটিয়ে নিয়ে সম্পূর্ণ অন্য মানুষে রূপান্তরিত হয়।


কুমুরডাঙ্গার বাকাল নদীটি ধীরে ধীরে চড়া পড়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে, ষ্টীমার চলাচলের অনুপযোগী হয়ে ওঠে। ষ্টীমার চলাচল বন্ধ, ঘোষনার সাথে সাথে যেন এই প্রায় শহরটিরও মৃত্যুদন্ড ঘোষনা হয়ে যায়। হঠাৎ করেই যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে শহরটি। উকিল কাফিলউদ্দিনের ব্যর্থ চেষ্টা, ডাক্তার বোরহানউদ্দিনের মত অসংখ্য মানুষ প্রহর গোনে এক অজানা আশংকায়। আচমকাই এক মানসিক ব্যাধির উৎপত্তি হয়, যেদিন ঘাট থেকে পুরনো ষ্টিমারটি যেটি ভাসমান টিকিটঘর, বা বাসস্থান হিসেবে পরিচিত ছিল সেটি যখন  নিয়ে যাওয়া হয় তখন যেটুকু আশা ছিল ষ্টিমার চালু হওয়ার সেটুকুও অন্তর্হিত হয়।খতিব মিঞা তার ভাসমান ফ্ল্যাটের বাসস্থান ছেড়ে এই প্রথম ডাঙ্গায় ওঠার কথা চিন্তা করে, যেন জলজ ভাসমান জীবন ছেড়ে শিকড় গাড়ার চেষ্টা। এতদিন মাটির সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, কুমুরডাঙ্গায় থেকেও ননএনটিটি, তা ঘোচাতে উঠে পড়ে লাগতে হয়। আর এই ভাসমান ফ্ল্যাটটি অদৃশ্য হওয়ার সাথে একটা অদৃশ্য শিলমোহর বসিয়ে যায়, শুরু হয় এক অদৃশ্য রোগ। মোক্তার মোসলেহউদ্দিনের মেয়ে, মাষ্টারনি সাকিলা খাতুন হঠাৎ করেই এক বিচিত্র নারী কান্না শুনতে পায়, সেই শুরু, এরপর ধীরে ধীরে গন হিষ্টিরিয়ার মত প্রায় গোটা গ্ৰামের মানুষ এই কান্না শুনতে আরম্ভ করে, এক অজানা আশঙ্কায় নিজেদের মূল্যবান সম্পত্তি বাকাল নদীতে বিসর্জন দিতে শুরু করে আরো দরিদ্র হয়ে পড়ে। উকিল কাফিলউদ্দিনের গ্ৰাম ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে মৃত্যু, বিষয়টিকে আরো ঘনীভূত করে।


মুহম্মদ মুস্তফা, যে একদিন তার সমস্ত সৎচরিত্র দিয়ে পিতার দুশ্চরিত্র ঢাকতে গিয়েছিল, খোদেজার মৃত্যু তাকে ধীরে ধীরে প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে তার মধ্যে জন্মানো অপরাধবোধ মাথা চাড়া দিয়ে খোদেজার প্রতিমূর্তিতে সাকিনা বানু হয়ে সামনে দাঁড়ায়। অথচ সে জানতেও পারে না, খোদেজা তাকে নয় তার চাচাতো ভাইকে ভালোবেসেছিল, অথচ খোদেজার মৃত্যু মুস্তফার এতদিনের কষ্টার্জিত ভিত্তিপ্রস্তরকেই নড়বড়ে করে দেয়।নিঃসঙ্গ, ক্লান্ত আর ভীত করে তোলে মুহম্মদ মুস্তফাকে। তার মনের মধ্যে যে এক নিটোল সংসারের বুভুক্ষুতা ছিল তা তবরেজ ভুঁইয়ার সংসারে সে খুঁজে পায়। দরিদ্রের মত সে  আড়াল থেকে তাদের নিটোল সংসারের চলাফেরা আস্বাদন করতে থাকে এবং আরো নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।


বাকাল নদী ও মহম্মদ মুস্তফা দুজনেই যেন এক ক্লান্ত প্রান, ক্লান্ত শরীর, নিঃসঙ্গ হৃদয়। তারা একে অপরকে অপলকে দেখে আর ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। অবশেষে আত্মহত্যা করে জীবনের সব লেনদেন মিটিয়ে মুক্তির স্বাদ নেয় সে, তার পিতার দুস্কর্মের দেনা শোধ করে।


এদিকে ধীরে ধীরে স্থবির হয় কুমুরডাঙ্গার জীবন। নদী কাঁদে, যেন কুমুরডাঙ্গার দুঃখে কাঁদে, সেই কান্না অতি নির্মমভাবে লেখক গোটা কুমুরডাঙ্গার মধ্যে চারিত করে পরিনতির দিকে নিয়ে যান। চেতনা প্রবাহের বৈশিষ্ট্যের গত ভেঙ্গে শক্তিশালী লেখক ওয়ালীউল্লাহ প্রকৃতি ও জীবনকে অঙ্গাঙ্গী করে সমস্ত মিথকে বর্তমানে রূপান্তরিত করে এক আশ্চর্য ভাঙ্গাগড়া খেলার মনোসমীক্ষন দেখান খুব সাবলীল ভাবে। যেখানে বাকাল হয়ে ওঠে নারী আর কুমুরডাঙ্গা অবক্ষয়িত জনজীবন। যেখানে নদী কাঁদে মানুষের জন্য, মানুষ কাঁদে নদীর জন্য আর পাঠক অনুভব করেন শূন্যতা।



সহায়তা :

১.  সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ : জানা সাহিত্যিকের অজানা        জীবন জীবন , রুবায়েত আমীন, roar. media


২. ষ্টোরী অব সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ : শুভাশীষ 

     চক্রবর্তী, আনন্দবাজার, ১৫ই আগষ্ট ২০২১






1 comment: