এক আশ্চর্য ছাদের বামন হওয়ার গল্প
আমাদের ছোটো বেলায় গরমের ছুটি আর পুজোর ছুটিতে একটা গ্ৰামের বাড়ির গল্প ছিল, না, তখন ছুটি পড়লেই বাবা - মায়েরা অন্য কোথাও যাওয়ার প্ল্যান করতো না। ছুটি পড়লেই পরদিন ভোরে বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে ঘুম চোখে রওনা দিতাম এক মাসের জন্যগ্ৰামের বাড়ি অথবা খুব জোর তার মধ্যে তিন থেকে চার দিনের জন্য মামাবাড়ি। আমাদের ছিল জমকালো ছবি বিশ্বাসের মত পেল্লায় মোটা মোটা বিশ পঁচিশ ইঞ্চি দেয়ালের এক জাবদা চুন সুরকির খিলান দেওয়া গুরুগম্ভীর বাড়ি, গ্ৰামের শেষ প্রান্তে একটেরে সাদা খিলান দেওয়া বাড়িটা ঘাড় উঁচু করে ছবি বিশ্বাসের মতই আভিজাত্য নিয়ে বেশ কিছু গিজগিজে লোক নিয়ে গমগম করে দাঁড়িয়ে থাকতো, লোকে বলতো ' বাবুর বাড়ী'।
এই বাড়ির অন্দরমহল কিসসা অন্যদিন শোনাবো, তবে এই পেল্লায় বাড়ির এক পেল্লায় ছাদ ছিল , আজ সেই ছাদেরই গল্প বলবো -
ছাদটা প্রায় পনেরো ইঞ্চি মোটা দেওয়াল দিয়ে বেশ আঁটোসাঁটো করে প্রায় দেড় মানুষ উঁচু করে ঘেরা ছিল, আর এর গায়ে ছিল একটা করে ইটের মাপে কুলুঙ্গির মত ছোটো ছোটো খোপ। বেশ একটা পর্দানশিন ব্যাপার। মানে হল ঐ খোপ দিয়েই সামনের রাস্তাটা দেখা যেত অথচ ভালো করে খেয়াল না করলে বাইরের লোক দেখতে পেত না। বেশ একটা আদিকালের পূর্বরাগ পূর্বরাগ ব্যাপার।
তবে সবচেয়ে এর আকর্ষন ছিল, এর খোলামেলা বিস্তৃতি। যতটা না বড় তার থেকেও এর চারপাশ শুধু না বহু বহু দূর পর্যন্ত ধু ধু করে অনায়াসে দেখা যেত, যা নিমেষে ছোটো ছোটো মনগুলোকে অনায়াসে ভরিয়ে দিত। ছাদের দেড় মানুষ সমান উঁচু কার্ণিশ ধরে দাঁড়ালেই সামনের শান্ত শিলাবতী পার হয়ে কুমারীর সিঁথির মত আলপথ পার হয়ে ও পারের গ্ৰামগুলির বাড়ি, চাষাদের চাষ আর এ বাড়ির সেজ কর্তার গাঁয়ের পারের মাঠের মাঝের একলা সাদা স্কুলবাড়ীটি এক মনোহর চিত্রপটে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতো।পুবদিকে তাকালে নেড়া আমড়া গাছটার ডালে দুটো প্যাঁচা বসে বসে ঢুলতো,তাদের ছাড়িয়ে চন্দন গাছের মাথা ছুঁয়ে, আঁশ শ্যাওড়া আর নারকেল গাছের মাথা ছুঁয়ে খোপ কাটা এ বাড়ির সবজি বাগান আর ডোবা ছাড়িয়ে এ বাড়ির চাষের খেত অলস ভঙ্গিতে শুয়ে থাকতো। এ সব দেখতে দেখতে যদি দক্ষিনে যাও দেখতে পাবে বাজ পড়া তালগাছটার নীচে একটা মাছরাঙ্গা খিড়কি পুকুরের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বসে আছে, ও পাশের ছোটো পুকুর থেকে আজন্মকুমারী টুনি গা ধুয়ে আসছে এ বাড়ির বিষ্ণু মন্দিরে প্রদীপ সাঁজাবে বলে। একটু আগেই টুসির মা একরাশ শুকনো জামাকাপড় ঘাড়ে গর্দানে করে ছাদ শুন্য করে দিয়ে তুলে নিয়ে গেছে
এখন বড় শান্ত সময়, পৃথিবীতে গোধূলি নামছে, বিষ্ণু মন্দির থেকে ঝাঁঝ ঘন্টার আওয়াজ আসছে, শালগ্ৰাম শিলার শয়নের সময় হল, একটা দুটো করে তারা ফুটছে আকাশে। বড় মন কেমনের সময়, হাতের চেটোয় ভর দিয়ে যদি চিৎ হয়ে শুয়ে থাকো ছাতের বুকে তাহলে আস্তে আস্তে সমস্ত আকাশ চুপ করে তোমার বুকের পরে নেমে আসবে, বয়ঃসন্ধির মন উদাসের কালে নিজের অজান্তেই দু ফোঁটা আবেগ জল বিনা কারনেই টুপটুপ করে ঝরে পড়বে কোন বেয়ে , আর ঠিক এই মনকেমনের উদাস কালেই আসবে দূর্বাসার বানীর মত মাতৃদেবীদের সন্ধ্যাকালে পড়তে বসার আহ্বান। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অবজ্ঞা করার সাহস নেই বলেই হয়তো ফিরতে হবে নিম্নপানে পরের দিনের আবেগ অবশিষ্ট রেখে।
আজ বাড়ির সেদিনের কচিকাঁচা গুলো বড় হয়ে গেছে, বাড়ির কর্তারা বৃদ্ধ হয়েছে, আর প্রায় দেড়শত বছরের জীর্ণ বাড়িটার দেওয়ালে ছাদে ঝিরঝিরে চিড় ধরেছে। মাঝেমাঝেই তার শুশ্রুষা চলছে তবে এখন ছাদ বাঁচানোর লড়াই। তাই হাল ফ্যাশনের জাবদা একটা ঢাকনা ওর মাথায় পরিয়ে দেওয়া হয়েছে, দেখতে হয়েছে ঠিক যেন প্যাগোডা বাড়ি কিংবা টোপর পরা বর এর মত।এর আগেও বাড়িটার গাত্রমর্জন হয়েছে,চুন সুরকির সাবেক কালের খিলান গিয়েছে খসে, বদলে এসেছে ছিমছাম আধুনিক পলেস্তারা। তবে এর আগে এমন লজ্জা আর দুঃখ কখনো পায়নি বাড়িটা। তার মাথা রক্ষা হয়েছে, তার আয়ু বৃদ্ধি হয়েছে ঠিকই কিন্তু ছবি বিশ্বাসের সেই গাম্ভীর্য, সেই একআকাশ বিস্তৃতি হঠাৎ করে যেন কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। এখন আর দুরের গ্ৰাম সামনে মনে হয় না, আকাশ টা ঢেকে গিয়ে ছাতটাকে যেন বড্ড ছোটো করে দিয়েছে একলহলায়। সব বড় আপন ছিল, এক লহমায় সব পর হয়ে গেছে। চোখের ছোঁয়ায় যে মন ছোঁয়াছুঁয়ির খেলা ছিল তা হারিয়ে গেছে টিনের চালের ফাঁকে। এখন আর চিৎ পাতলেই আকাশ দেখা যায় না, তারাদের ছোঁয়া যায় না, তারা এখন বড্ড অভিমানী , তাই সরে গিয়ে ভাব করেছে নদীর বালির সাথে।
ও চাঁদ, ও নদী , ও প্রান্তর সামলে রেখো জোছনাকে ।
মনোহর অতীতের স্মতির সুখটান ...অমলিন সুধাময় থাক
ReplyDelete