Thursday, June 11, 2020

মধ্যযাম - ৮

                   যা দেখি তা লিখি
                                ৮


অন্তিম প্রহর , কৃষ্ণপক্ষের কাস্তে চাঁদও ঘুমের তোড়জোড় করছে। মিশকালো অন্ধকারে ক্ষয়াটে চাঁদের চারপাশের ক্লান্ত হলদে আলোও ক্ষীয়মান , রাতচরারা এখনও ইতিউতি অন্ধকার চিরে শিস দিচ্ছে ইতর প্রানীর সন্ধানে। বাতাসে শিরশিরে ভোরের গন্ধ। আর কিছুক্ষন বাদেই পৃথিবী ডানা মেলবে তাই এখনও পক্ষীবৎ চঞ্চু গুঁজে আছে নিজের পালকে। আরো একটা আলোর দিন শুরু হবার প্রস্তুতি শুরু হচ্ছে গোপনে গোপনে।


ঐ যে দেখা যাচ্ছে একটা বাতায়ন, যার  ফাঁক  দিয়ে  একটা আলোআঁধারী পৃষ্ঠদেশ দৃশ্যমান । সামনের আলো পিছনের আঁধারে ছায়া মন্ডলী রচনা করেছে। তার ঈষৎ প্রলম্বিত ছায়া পড়েছে নাতিলম্বিত রাতের কপালে।লোকটা এখনও জেগে, হামেশাই রাত জাগে। ছায়া রাত্রির কায়া হয়ে ঘুরঘুর করে আনাচেকানাচে। কখনও গার্হস্থ্য মর্জন করে, কখনও ভোরের দখিনার মত বাতাস বওয়ায় নিযুত কোনটিতে। এক আলো দিন থেকে এক রাত্রি অন্ধকার অযুত আগড়ে নিগড় বাঁধতে চায় পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে। থলে ভরে নিয়ে আসে সংসার ,তারপর প্রত্যেকটি কনা উপুড় করে, থলে উল্টে দিয়ে দেখে এতটুকু বাকি রয়ে গেল কিনা সংসারে  দেওয়ার।

বড় সামাজিক সে , তাই চাষ করে , বাস খোঁজে, শিকড় ছড়িয়ে দেয় মাটির পরতে পরতে, যেমনটা গাছেরা জানে খুঁজে নিতে রঙ মাটি ছেনে , জল ছেনে , তারপর ছড়িয়ে দেয় বাকলের খাঁজে খাঁজে মাটির সে রঙ, ধূসরের কোনে। লোকটিও খুঁজে ফেরে সঠিক রঙ, আনাচেকানাচে ধূলিধূসরিত জীবনে। আসলে সে কথা বলতে চায় ,তাই চুপ করে থাকে রাতের প্রতীক্ষায়।

              লোকটা ভালো নেই।

সারাদিন ঘুরে মরে  জীবনে, দ্বীপবিচ্ছিন্নের মত নির্জন, একাকি, মনে মনে। তেল ,নুন সরষের হিসাবের পরেও যে দ্বীপ পায় নাকো খুঁজে, খুঁজে মরে। ছুঁতে পারে হয়তো বা ,তবু মুখ দেখা যায় না কোনোমতেই। তার লুব্ধক হাত হাতছানি দেয় ধ্রুবতারার মত, তার ঠোঁট পৃথিবীর কারুবাসনায় মাখামাখি, অথচ মুখাবয়ব অধরা।

যেখানে মাটির পরে নরম ঘাসের রোমে ঢাকা হয়ে আছে মাটির শরীর সবুজ সবুজ, ঐ তবে ছুঁয়ে থাকা যায়। যেখানে মাটিতে এসে মিশেছে আকাশ, তার কাদাজলে নীলাকাশ মুখ তুলে চায় আয়নার মত। নীল রঙ চলে মাঠে  মাঠে পানসির মত, মন চলে তারও আগে। আকাশ সবুজ  হয় ,বদলের রঙে।
মাঝখানে গুঁড়ি আলপথ, পিচ্ছিল, কর্দমাক্ত, নীচে বহমান ফাঁ লোক। এখানে কোনো ছায়া নেই দুধারে সংকীর্ণ জল নিরন্ত করেছে পথ ।


ইচ্ছে করে মরালী গ্ৰীবায় তিষ্ঠায় ক্ষনকাল, অথবা আদিম কামনাময় নীল স্তনে  মাথা রাখি, জঙ্ঘারামে মুখ রেখে কাঁদি ক্ষনকাল কোলের শিশুর মত, অথবা পায়ের পাতা দুটি ভরি প্রেমজলে , তারপর ফিরে আসি ভাঁজপাঠ করা গানিতিক পৃথিবীতে পঙ্ক ধৌত হয়ে ,নতুন কোরকের মত সাজিয়ে নিতে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ , তবু মুখ তার অধরা।

লোকটি বড় সামাজিক  , তাই সে বড়ই গরীব। অবাঞ্চিত বেড়াকলমিদেরও স্থান দেয় সযতনে । ফনফনিয়ে ঘিরে ধরে তারা নতুন বর্ষায়। নিগড়ের আগড়ে বেঁধেছে নিজেকে ,যথাযথ গন্ডীতে। তবু সে সীতা হতে চায়, তারপর আস্পদ আক্রোশে রাত খুঁড়ে মরে রাতের বুকে, তবু মুখ দেখা যায় না, বুঝতে পারে না ,  কি চায় সে? অথবা কে তাকে চায়?

রাত বাড়ে । মলিন পৃথিবী পরে নির্ঘুম, ক্লান্ত পদ ফিরে যায় গার্হস্থ্য সভ্যতায়। পরিচিত কোন খোঁজে, নিরাপদ ঘুম, কখনও বা পরিচিত  গার্হস্থ্য ভাঁজে মুখ গোঁজে, সুখ খোঁজে অভ্যস্থতায়।

নতুন সকাল হয়, এক আলো দিন, থলেতে থলেতে সংসার সাজায়।তবু মুখ দেখা যায় না, এখনো অধরা সে।

                           অর্পিতা

2 comments:

  1. না-দেখাকে একান্ত কাছের করে দেখা একটা অনন্য কলাকৈবল্য। তবে যে ধারা অযুত ব্যষ্টির মাঝে ইতিমধ্যে প্রভূত খ্যাতিমান হয়েছে;যে ব্যক্তি অবলম্বন তালবৈকল্য ঘটাতে পারে।
    তবু অনন্ত দিগন্ত বিস্তারি করিয়া অতল মোহনীয় বটে।
    লেখিকাকে ধন্যবাদ।

    ReplyDelete