Tuesday, November 10, 2020

ছোটো গল্প

 


                পরকীয়া - ১

কুঁকড়া ডাকা ভোর থেকে এই পৌষের জাড়েও বুধা বাউরীর ঘরে আজ সবাই উঠে আছে। ঘরে তার বৌ, বিটি,লাতি - লাতিন, ছেলে- বৌমা অথচ সবাই একপ্রকার জুবুথুবু হয়ে যে যার মত বসে আছে। বাচ্ছাদুটা পঁটা পড়া নাকে ছড়ানো মুড়ি খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে সেইসঙ্গে ঘরের দু-পাঁচটা মুরগীও মুড়ি খুঁটছে আপনমনে উঠানে ।

এমনসময় বুধা বুড়ার বৌ তাবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো , মাগী মরে বাঁচল। সাঁঝ ভোরেই ভরত উপর পাড়া থেকে এসে খবর দিয়ে গেছে, এখন দাহকার্য বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত  হবে সেই বিষয়ে কেউ বুধা বাউরীকে শুধাতে সাহস পায় নাই। তাই দুই বৌমাও ইতস্তত করে আর তাদের গোলাঘরে বেরোতে পারে নাই। খবরটি পাওয়া ইস্তক বুধা বাউরী গুম হয়ে বসে আছে।

তাবির মনে পড়ে যাচ্ছে কতককালের কথা, সেই ১৩ বছরে এ ঘরে বৌ হয়ে আসা, বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পোয়াতি হওয়া, এদিকে কংসাবতী ড্যামের তখন হড়বড়াই কাজ চলছে আর ঘনঘন সাহেবদের আনাগোনা, জিপ ড্রাইভার বুধা বাউরীর তখন নাওয়া খাওয়ার সময় নাই, কখন আসে কখন যায় তাবি জানতেও পারে না, যখন আসে মদে চুর। এদিকে তাবির শরীর ভাঙ্গতে লাগলো, ডাক্তর দেখানো ওষুধ সবই অবশ্য বুধা করেছিল, তখন উয়ার হাতে অঢেল কাঁচা পয়সা, তো সেযাত্রায় তাবি উদ্ধার হলেও আর পুরনো গত্তি ফিরে আসে নাই ।তবু একে একে চারবার কিকরে যেন পোয়াতি হল তাবি আর উৎরে গিয়ে বেঁচেও রইলো, কিন্তু বুধার ঘর আসা ধীরে ধীরে কমতে লাগলো। প্রথম প্রথম তাবি কাজের  কথা ভাবলেও পরে পরে এদিক ওদিক থেকে দুএকটা খবর উড়ে আসতে লাগলো, আর যতদিনে ভালো করে উড়লো ততদিনে বুধন বাউরি উপর পাড়ার ভারির ঘরে গেড়ে বসেছে। তারপর কত বৃথা রাগ অভিমান কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ভারিকে মেনে ও মানিয়ে নিয়েই চলতে হয়েছে তাবিকে। নাঃ,  এঘরে তাকে এনে বুধা কোনোদিনই তুলে নাই কিন্তু আসাযাওয়া এমনকি ছেলেমেয়েদের  বিয়াতেও তার উপস্থিতি সবাই মেনে নিয়েছিল।

তবে বাঁজা ভারী বলেই সবাই তাকে ডাকতো, এমনকি বুধনের ছেলেমেয়েরাও, এতে কোথাও শান্তি ছিল কিনা জানা নেই, তবে কিছুটা অভ্যাস তো ছিলই।
সেই ভারীও শেষকালে এক মা-বাপ মরা ছেলেকে মানুষ করেছিল, নিজে গোলাঘরে খাটতো আর বুধন মাসকাবারি কিছু টাকা তাকে দিতো , এভাবেই তার শেষকালটা কেটে গেল।

যাইহোক , এখন সমস্যা দেখা দিয়েছে এই যে , তার দাহকার্য ও পালন কি হবে? বুধার কোন ছেলে মুখাগ্নি করবে, কতদিন পালন করবে কেউ কিছু বুঝতে পারছে না, অথচ বুধা সকাল থেকে চুপ, কেউ যে জিজ্ঞাসা করবে সে সাহসও নাই।

বড় ছেলে বিশা বৌয়ের ইশারাতে মায়ের শরনাপন্ন হল। তাবির মনে কিছুটা হলেও দুঃখ জমা হয়েছিল, ছেলের কথায় সেসব ঝেড়ে গলা খাঁকরে বলল - ইসব আমাকে কেনে শুধাচ্ছিস, বুড়াকে শুধা। অতএব খুকখুক করে কেশে ইতস্তত করে বিশা বাপকে শুধাল , বলি বেলা তো বাড়ছে, তা পালন তো ১৪ দিনেই হবেক, নাকি ? এবার তো যেতে হয় ?

এতক্ষনে বুধা ছেলের মুখ দিকে তাকাল , তারপর অবাক দৃষ্টিতে বললো , পালন ! কিসের পালন ?

 বিয়াই তো করি নাই ।

1 comment: