যা দেখি তা লিখি
(৪)
(৪)
পৃথিবী নির্মল হয়েছে তাই প্রতি পড়ন্ত বিকেলে কালবোশেখী নামে পড়শীদের বৈকালিক আলাপনের মত। ঝোড়ো হাওয়া এসে গুনগুন করে এগাছ ওগাছ , আকাশকোনের ঘন কালো মেঘ চিরে বিদ্যুতবল্লরীর মত ঝটিকাগতিতে একঝাঁক ত্রস্ত বক নীড়ে ফিরে যায় মধ্যবিত্তীয় রীতিতে । জানে তারা এমুহুর্তে কারো ছাঁচতলা মাড়ানো অপরাধ তাই ঘর খুঁজে ফেরে।
জল পড়ছে। অশ্বত্থ গাছটা আর কচি নাই, তরুন চিকন হয়েছে রোজ জল পেয়ে পেয়ে।
প্রায় এক যুগ ধরে এক সংসারী শালিক তার সংসার সাজিয়েছে ল্যাম্পপোস্টের মাথায় একটু একটু করে। ডালপালা , খড়কুটো, আর মানুষের দেখাদেখি এখান ওখান থেকে ছেঁড়া দড়ি ,কানি কাপড় ,পালক এমনকী নিজের বুড়ো পালক খসিয়ে খসিয়ে শৌখিন করে তুলেছে ঘরটাকে । এদিকে একরত্তি ল্যাম্পপোস্টের মাথাও ক্রমশ শৌখিনতায় ভারী হচ্ছে, ঠিক যেন ফ্ল্যাট বাড়ি। পাতকুয়োরা এখানে ঝামেলা করতে পারে না তাই নিশ্চিন্তে মা যায় কাজে, পোকা টোকা ধরতে । ফিরে এসে আদরে গোবরে কিচমিচ করে ভরিয়ে তোলে সংসার। এক যুগ ধরে সাজিয়েছে সে এ সংসার , ধুলো ঝেড়ে গুছিয়ে, বাগিয়ে ছানা মানুষ করে গড়ে তুলেছে তিলে তিলে।
সেদিনও ঝড় এসেছিল দুপুর থাকতেই , সঙ্গে টিপটিপে বৃষ্টি,আকাশকোনের কালো মেঘে শুরু হল ঝড়ের মাতন , মা শালিক টা তখনও ফিরতে পারেনি বোধহয় ,আজ একটু দুরে গিয়েছিল ঐ বদ্যিপাড়া পর্যন্ত । কোনো ছাঁচতলা পেয়েছে কি? কে জানে ? এদিকে ঝড়ের গুমগুমানি আর জলে ভিজে যাওয়া সংসারটা একমুহূর্তে উড়ে পড়লো নীচে একেবারে তলায় শুয়ে থাকা নেড়িদের কোলে, প্রথমে ভয়ে খ্যাঁক করে খেঁকিয়ে উঠলো নেড়ী, তারপর শুরু হল ভোজ।
তখনও অন্ধকার হয়নি, আকাশ এখনও অভিমানী প্রেমিকার মত মুখ গোমড়া করে আছে আর নওল কিশোরের মতন মেঘ ভাঙ্গা কমলা রোদ রাগ ভাঙ্গাবার তরে উঁকিঝুঁকি মারছে, জানে আজ অসম্ভব । ধান সিজা হাঁড়ির মত এখনও কালো হয়ে আছে আকাশের এক কোন , বেশ এক বিরহ বিরহ ভাব জমেছে মেঘকোনে।
মা ফিরল, শালিক মা । যেমনটা মানুষে ফেরে শাবক টানে সমস্ত অতিক্রম করে, তবু এক যুগ কাটিয়ে যাওয়া জমি চিনতে পারলো না, মনে মনে ভাবে এই তো এই ছিল , ন্যাড়া জমি হল কি করে, একযুগের সংসার, ঘোরে আর ওড়ে তারপর ন্যাড়া ল্যাম্পপোস্টের মাথায় বসতেই গন্ধ পায় তার নাড়ি ছেঁড়া শাবকদের গায়ের। অস্থির হয়ে উঠে উড়তে যেতেই কচি পালক এসে লাগে তার পায়ে , নীচে আরো কচি পালক তখন বিছানা মেলেছে। হাহাকার করতে গিয়েও গলা ফোটে না, চোখ ফাটে না, কেমন যেন নিস্পৃহ চোখে তাকিয়ে থাকে,যেন এ সব তার ঘটনা নয় তবু সে দর্শক। হঠাৎ সেই কালো মেঘকোনে তাকায় সে তারপর ডানা ঝাপটে উড়ে যায় সেইপানে, কোথায় ?কে জানে? তখন অন্তিম মেঘেরা আর এক পশলার তোড়জোড় করছে , নেড়ি গুলো উঠে শুয়েছে সামনের রোয়াকে।
অর্পিতা চৌধুরী
বড় স্বাদু, শোভন ও সমৃদ্ধ এ কথনের ধারা ; হে কথিকা এভাবে স্রোতশীলা থাকুন...
ReplyDeleteধন্যবাদ
ReplyDelete