স্বয়ংম্ভরা
অর্পিতা চৌধুরী
আষাঢ় মাসের বারো তারিখ আজ, সবে অম্বুবাচী গিয়েছে, ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে, ভোর পাঁচটা ।এঁটেল মাটি বৈশাখের ফাট ভরিয়ে আষাঢ়ের জলে মোলায়েম হয়ে উঠেছে, অতর্কিতে পা পড়লে আর রক্ষে নেই, একেবারে সড়াৎ,প্রপাত ধরনীতল। এর মধ্যেও কেউ সানাইয়ের রেকর্ড বাজিয়ে দিয়েছে, বেজে যাচ্ছে হিন্দোল, ভরা বর্ষায় বসন্তের প্রথম প্রহরের রাগ নিজের মনে বেজে চলেছে। এ নিয়ে অবশ্য কারো মাথাব্যাথা নেই। প্রতিবেশীদের বিয়েবাড়ি জানান দেওয়ার মত কিছু একটা বাজলেই হল সে ভৈরবী না হিন্দোল তা এই নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরে জানার কথা নয়। আজ আলোর বিয়ে, পুরো নাম আলোককণা রায়, খুব যত্ন করে নাম রেখেছিলেন বাবা ঘণশ্যামবাবু, বছরখানেক আগে তিনি গত হয়েছেন। সম্বৎসর ফুরোতে না ফুরোতেই নিজে থেকে যেচে সম্বন্ধ এলে মা রমাদেবী আর না করতে পারেননি। আলো একবার তার স্বর্গগত বাবার ও তার পড়াশোনা করে স্বাবলম্বী হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলেও
কলেজে ভর্তির বছরখানেকের মাথায় সে সব আপাতত তুলে আলো চললো এখন অন্যের ঘর আলো করতে।
বৃষ্টির মধ্যে কোনোরকমে ছাদনাতলা দাঁড় করানো হয়েছে, তুমুল বৃষ্টি মাথায় করে বরবশী তারাচরণ প্রবেশ করতেই সকলের মধ্যে একটা হুলুস্থুল বেঁধে গেল। বরণ করে মিষ্টি খাওয়াতে গিয়ে আলোর পিসিঠাকুমা ঢুকরে উঠে বললো ঘনা থাকলে এমন অনাসিষ্টি ঘটতে দিতনি বাপু। বাস্তবিক, তারাচরণকে দেখে ইস্তক সবারই মনের মধ্যে যে কথাটা আঁকুপাঁকু করছিল সেটাই যেন বামি পিসি ঠাকুমা বলে ফেললেন। আলো আর তারাচরণ যেন পূর্ণিমা আর অমাবস্যা তার উপর ঝকঝকে আকাশের মত চকচকে একখানা টাক তারাচরণের বয়সকে দ্বিগুন বাড়িয়েছে। একমাত্র আলোর এ বিষয়ে কোনো হেলদোল নেই, সে যথাসময়ে মন্ডপ আলো করে উপস্থিত হল, বিবাহ যখন সুসম্পন্ন হল তখনও বৃষ্টি ঝরছে।
তারাচরনেরা চারভাই, তারাচরণ ছোটো হলেও বেশ করিৎকর্মা আর হিসেবি। নিজে পঞ্চায়েত অফিসের কেরানী হওয়ার সুবাদে ডানের চেয়ে বাঁয়ের রোজগার সে ভালোই রপ্ত করেছে, তার উপর প্রচন্ড পরিশ্রমী হওয়ায় মাঠের ধান, পুকুরের মাছের অভাব নেই। আলোকে মধ্যবিত্ত স্বামীর মত সামনে বিশেষ আদর না দেখালেও কোনো জিনিসের অভাব সে রাখেনি, ফলে আলোর চেহারা দিনকে দিন আরো খোলতাই হয়েছে। অন্য জায়েদের কাছে তা হিংসের কারনও বটে। তারাচরণ এ নিয়ে মুখে কিছু বলে না । তবে যেদিন পোয়াতি আলোর বাসন ধুতে গিয়ে পুকুরঘাটে পা পিছলে প্রথম সন্তান নষ্ট হল, তার ছমাসের মধ্যেই পাশেই কিনে রাখা জমিতে দুকুঠরি ঘর তুলে আলোকে নিয়ে সংসার পাতলো তারাচরন । দিদিরা কিছুটা হিংসে করে বলে - তারা সবসময় তার চাঁদের চরণ ধরে বসে থাকে। এখন আলোর বেজায় সুখ। দুই সন্তানের মা সে, ফেটে পড়ছে রূপ, গোয়ালে পাঁচটা দুধেল গাই, ক্ষেতে সবজি, পুকুরে মাছ। তারাচরণ ভোরে উঠে গরুদের ছানি কেটে সংসারের যাবতীয় কাজ সেরে অফিস যাওয়ার তোড়জোড় করে। তারাচরণ অফিস বেরিয়ে গেলে দুধ দুইয়ে সেই দুধ আলো দিয়ে আসে ডেয়ারি অফিসে, এছাড়া খাঁটি বলে তার দুধের কদর প্রতিবেশীদের কাছেও সবসময়। আলো মজা করে বলে, গরুর সামনেটা তারার পেছনটা আমার। দুধের টাকায় তার অফুরন্ত শাড়ি আর একটু একটু করে গড়ানো গয়নার সম্ভার কম নয় এতদিনে। প্রায়দিন নিত্য নতুন শাড়ি আর গা ভর্তি গয়নায় শুতে যাওয়ার আগে আলো যখন ঘসে ঘসে বসন্তমালতি মাখে সেসময় উঠোনের লেবু গাছের মৌমাছিরাও চঞ্চল হয়। দিন যায় বছর ফুরোয় ছেলেরা একে একে বাইরে পড়তে যায়, চাকরিতে ঢোকে, তারাচরণ আরো হিসেবি হয় , অবসরগ্ৰহনের সময় হয়ে আসছে, কিন্তু সংসার খরচ কমছে না। ছেলের বিয়ে দেবে, আবার একটা নতুন মানুষের খরচ, এখন আর গরু বাছুর নেই, তারাচরণ আর সময় দিতে পারছিলো না বরং এখন হিসেব করে গরুর পিছনে যা খরচ হোত তার কিছুটা টাকা সে আলোর হাতে তুলে দিয়ে সংসারের শান্তি বজায় রাখে, এতে টাকা ও খাটনি দুটোই বেঁচেছে তার। যদিও টাকাপয়সা যেটুকু জমিয়েছে তাতে টান না পড়লেও অবসরের পর যে বাবুয়ানী চলবে না তা সে ভালোই জানে। এদিকে বড় ছেলের বিয়ে আর অবসর গ্ৰহনের সময় একই মাসে হওয়ায় চাপে আছে সে, চাপা স্বভাবের তারাপদ চুপচাপ খায় অফিস যায় ফিরে এসে কাজ করে। অবশেষে অবসরের দিন চলে আসে, সারাজীবনের কেজো পাট চুকিয়ে কিছু উপহার নিয়ে বাড়ি ফেরে সে, মনে মনে ভাবে গুষ্টির জিনিস না দিয়ে যদি টাকা দিয়ে দিতো বরং কাজে লাগতো তার। এদিকে প্রথম ছেলের বিয়ে আলোককণার বাজার করার কমতি নেই, কোনোকথাই মানতে সে নারাজ। এদিকে ছেলেও হয়েছে বাপের বেটা, পয়সা কড়ির ব্যাপারে বাবার এককাঠি দড়, তার উপর নতুন চাকরি। মুখ বুজে সব সহ্য করছে তারাচরণ।
অবশেষে বিয়ে শেষ, এবার একটু রয়েবসে চলতে হবে, ঘরে নতুন বৌমা সেও যাতে বেচাল না হয় তাও ভাবতে হবে, মাছভাজা দিয়ে মুড়ি খেতে খেতে এসবই ভাবছিলো তারাচরণ, দাওয়াতে সবজি কাটছে নতুন বৌ। এমনসময় আলোককনা অভ্যাসমত এসে বলে বসে আমার হাতখরচের টাকাখানি দাও দিকিনি বেশ কদিন হল বসন্তমালতি ফুরিয়ে গেছে। রে রে করে ওঠে তারাচরণ, চিৎকার করে বলে দুর হয়ে যা চোখের সামনে থেকে এখনো গতরের শখ যায়নি, বড় ছেলেও সঙ্গত দেয় বাবাকে, রোজগার তো করতে হয়না বুঝবে কি তার মর্ম? এখন তোমায় দেখে আমার বৌ টাও শিখুক আর কি? মূহুর্তে ঘটে যাওয়া ঘটনায় নতুন বৌ দ্রুত কুটনো ফেলে ঘরে ঢুকে যায়, আলোককনা উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকে স্থানুবৎ। তারাচরণ তখনো বলে চলেছে নিজের হাতখরচ এবার নিজেই রোজগার কর, বিনি মাগনায় আর খাওয়াতে মাখাতে পারবনি।
কেতুপুরের বাজার ছোট হলেও জমজমাট। সবাই সবাইকে চেনে, বাজারের ছলে ভালোমন্দ খবরাখবর সবাই সবাইকার পায়। তবে আজ সবাই একেবারে বাক্যহরা। বাজারের মাঝখানে এক বড় ছাতা মাথায়, গা ভর্তি গয়না আর চওড়া পেড়ে তাঁতের শাড়িতে ঝুড়ি ভর্তি সবজি আর একগাল হাসি নিয়ে বাজার আলো করে বসে আছে আলোককনা, গা থেকে যেন আত্মবিশ্বাস ঠিকরে বেরোচ্ছে।
This comment has been removed by the author.
ReplyDeleteকখনো কখনো চেনাশোনা চরিত্র মাপতে মাপতে গল্পপড়া একেবার মাটি হয়ে যায়। তবে এ গল্প,আলোর বিবর্তনের গল্প। উৎপাটিত তরুকন্যার অন্য মাটিতে প্রোথিত হয়ে ক্রমে আত্মবিশ্বাসী বিছোনো বটবৃক্ষ হওয়ার গল্প। ইতিবাচক তৃণ রাজ্যবিস্তারের গল্প; অনেকের আধার হয়ে আত্মস্থ আলো আবিষ্কার , আলোক-বিস্তারের অনন্য কাহিনী।
ReplyDelete